নিউজ ডেক্স : আগুন লাগার পর চর্তুথ দিনে এসেও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমদানি পণ্য সরবরাহ পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ প্রতিনিধিদের। সারাদিন ও সন্ধ্যা মিলিয়ে আসা দেড়শ টনের মত পণ্য সামাল দিতে বেগ পেতে দেখা গেছে এ কাজের সাথে সংশ্লিষ্টদের।
বিশেষ করে টিকা ও ওষুধের মত যেসব জরুরি পণ্য তাপনিয়ন্ত্রণের মধ্যে (কোল্ড চেইন ব্যবস্থা) রাখা দরকার সেগুলো পেতেও দেরি হওয়ার কথা বলছেন পণ্য খালাসের সঙ্গে জড়িত কর্মীরা।
এমন একটি ঘটনার দেখা মিলল মঙ্গলবার দুপুর ১টায়। শাহজালাল বিমানবন্দরের একেবারে উত্তর কোণায় ৯ নম্বর গেটের সামনে ভিড় করে আছেন বেশ কয়েকজন সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কর্মী। সকাল থেকে অপেক্ষায় আছেন কেউ কেউ, কিন্তু পণ্য পাচ্ছেন না।
এমন সময় আমদানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনের কর্মীরা একটি ট্রলিতে করে নিয়ে এলেন বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি সানোফির বেশ কিছু ওষুধ সামগ্রী। ফটকের বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুততার সঙ্গে সেগুলোকে তাপ নিয়ন্ত্রিত টিকা পরিবহনের বিশেষ ট্রাকে তুলে ফেললেন সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কর্মীরা।
সানোফির লোগো দেওয়া এ কার্টনগুলোতে সব টিকা থাকার তথ্য দিলেন এগুলো খালাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ফারকো সিন্ডিকেটের কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এখন যেভাবে পণ্য সরবরাহ করতেছে এভাবে করলে দেশে ব্যবসা থাকবে না, দেশের কিছু থাকবে না। এই মাল (টিকা) আসছে রাত ৩টায়। এখন বাজতেছে দুপুর সোয়া ১টা। এই টিকা রাখার কথা ছিল দুই থেকে আট ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে। কিন্তু এই মাল গত ১০ ঘণ্টা ধরে ৩২-৩৩ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যে পড়ে ছিল। সারাদিনের মধ্যে এই একটা পণ্য সরবরাহ হল।”
ভয়াবহ আগুনের চার দিন পরও বিকল্প ব্যবস্থায় চলছে আমদানি পণ্য সরবরাহ; সেটাও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এ কারণে আকাশপথে বাড়তি ব্যয় করেও যাদের জরুরিভিত্তিতে ও দ্রুত পণ্য সরবরাহ আনতে হয় সেসব খাতের ব্যবসায়ীরা রয়েছেন শঙ্কার মধ্যে। প্রধান দুই রপ্তানি পণ্য পোশাক ও ওষুধ খাতের উৎপাদকরা পড়েছেন বেশি বিপাকে।
শনিবার আগুন লাগার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত শাহজালালে কোনো পণ্যবাহী বা কার্গো উড়োজাহাজ বা ফ্রেইটার ফ্লাইট নামেনি। তবে যাত্রীবাহী ফ্লাইটের পেটে এসেছে বেশ কিছু পণ্য।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঢাকার কোনো কার্গো বুকিং নিচ্ছে না ফ্রেইটার এয়ারলাইনগুলো। কিছু ব্যবসায়ী মিলে চীন থেকে একটি উড়োজাহাজে কিছু পণ্য এনেছেন, যেটি মঙ্গলবার রাতে নেমেছে।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা বিমান বাংলাদেশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা এদিন সন্ধ্যায় ১০৭ টন পণ্য নিয়ে ক্যাথে প্যাসিফিক এয়ারলাইন্সের একটি ফ্রেইটার ফ্লাইট শাহজালালে নামার তথ্য দেন। আগুন লাগার পর এটিই প্রথম কার্গো ফ্লাইট। এর বাইরে যাত্রীবাহী ফ্লাইটে পণ্য এসেছে আরও ৪০ টনের মধ্যে। সব মিলিয়ে মঙ্গলবার ১৪৭ টন পণ্য এসেছে। কিন্তু ডিজিটাল পদ্ধতিতে পণ্য খালাস করতে না পারায় সময় লাগছে।
সব মিলিয়ে শাহজালাল দিয়ে আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫৪৭ টন আসা যাওয়া করে। সেখানে আগুনে কার্গো ভিলেজ পুড়ে যাওয়ায় আমদানি পণ্য ছাড়ের পুরো ব্যবস্থা অকেজো হয়ে গেছে। বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে আমদানি পণ্য ছাড় করার প্রক্রিয়ায়। যে কারণে সারাদিন ভর ও রাতের প্রথমভাগে আসা ১৪৭ টন সামাল দিতেই হযবরল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বেবিচক আগুন লাগার ঘটনার পর ‘একদিনের জন্যও কার্গো অপারেশন’ বন্ধ না থাকার দাবি করলেও পণ্য ছাড় করতে ব্যবসায়ীরা নিদারুণ বেগ পাওয়ার কথা বলছেন। পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে তা কেউ এখনও সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না।
বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং অপারেটর হিসেবে কাগজপত্র যাচাইবাছাই ও শুল্কায়ন শেষে মালামাল খালাসের দায়িত্ব বিমানের। এ বিষয়ে বিমানের পরিচালক (কার্গো) শাকিল মেরাজের সঙ্গে কথা বলার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এ বিষয়ে বিমানের জনসংযোগ বিভাগের বক্তব্য পাওয়াও যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কার্গো ভিলেজ মেরামত বা নতুন আরেকটি স্থাপন করতে অন্তত তিন মাস সময় লাগার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে কোল্ড চেইন ব্যবস্থায় আনা পণ্য সংরক্ষণের জন্য সেখানকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অংশ গড়ে তুলতে সময় লাগবে।
গত শনিবার দুপুরে শাহজালাল বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে লাগা আগুন ওইদিন রাত ৯টায় নিয়ন্ত্রণে আসে। পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয় ২৭ ঘণ্টা পর রোববার বিকালে। ওই অগ্নিকাণ্ডে ১২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশ-ইএবি। ওষুধ শিল্প সমিতি মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে চার হাজার কোটি টাকা ক্ষতির শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
পণ্য আমদানির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, পোশাক পণ্যগুলো খোলা আকাশের নিচে রাখা গেলেও ওষুধসহ অনেক পচনশীল পণ্য নির্ধারিত তাপমাত্রায় কোল্ডস্টোর বা ফ্রিজারে রাখতে হয়। এসব পণ্য এখন আনলে খালাসের আগেই নষ্ট হওয়ার শঙ্ক রয়েছে।
মঙ্গলবার বিমানবন্দরের ৯ নম্বর গেটে মালামাল বুঝে নেওয়ার জন্য সকালে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আরাবি ইন্টারন্যাশনালের সুমন হোসেন। তিনি বলেন, “আগুন লাগার আগে চারটি গেট দিয়ে পণ্য সরবরাহ হত। কখনো কখনো চাপে পড়ে ৮ নম্বর হ্যাঙ্গার গেট দিয়েও মাল দিছে। কিন্তু এখন একটা গেট রাখছে মাল দেওয়ার জন্য। স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু হলে একটি গেইট দিয়ে কুরিয়ারের মাল দিয়েই কূল পাবে না।
‘এভাবে চলতে পারে না- ক্ষোভ প্রকাশ করলেন সেখানে থাকা সিঅ্যান্ডএফ কর্মকর্তা সুমন। বলেন, “আমরা মূলত বিভিন্ন গার্মেন্টসের স্যাম্পলের কাজ করি। বায়াররা স্যাম্পলের জন্য অল্প কিছু পোশাক এখানকার বায়িং হাউজকে পাঠায়। আমরা সেগুলো খালাসের কাজ করে দিই।
“আগুন লাগার পর আমার কয়েকটা স্যাম্পল পুড়ছে, আমার এক ক্লায়েন্টের অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। এখন এই মালামাল ঠিকমতো না পেলে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারবে না।”
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পণ্য আমদানির কাজের সঙ্গে যুক্ত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট শামা এন্টারপ্রাইজের সিদ্দিকুরের দাবি, খালাসের অপেক্ষায় থাকা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রচুর সরঞ্জাম পুড়েছে।
“আমার তিনটা মাল আসছিল ১৫ অক্টোবর, আমরা ছাড়াইতে পারি নাই। ভেতর দুইটা ইকুইপমেন্ট পোড়া গেছে। আজকে একটা খালাস নিতে আসছি সেই সকালে। এখন মাল আসতেছে বলে জানাইছে, ওইজন্য খাড়ায়া আছি।”
আগে চারটা গেট দিয়ে মাল সরবরাহ দিয়েও কুলানো যাইতো না। পেরিশেবল গুডস, কফিন বা অন্য জরুরি মালগুলো ৮ নম্বর হ্যাঙ্গার গেইট দিয়ে দিতে হত। এখন আমাদের ৯ নম্বর গেইট দিয়েছে, যা বিমানবন্দরের এক কোণায়। পুরোপুরি সরবরাহ শুরু হলে তো এখানে লোকজনের ভিড়ে গাড়িই নড়তে পারবে না। আর এই সরবরাহ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক না হলে দেশের ব্যবসা স্বাভাবিক হবে না।”
এ দিকে ঢাকার কোনো কার্গো বুকিং নিচ্ছে না এয়ারলাইনগুলো। আজকে একটা ফ্লাইট নামছে, ব্যবসায়ীরা চীন থেকে মাল আনাচ্ছেন ওটাতে। এখন মাল খালাস ও সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কেউ তো এমনিতেই বুকিং নেবে না।”
টেম্পরারি সেড নির্মানের কথা বলছেন বেবিচক চেয়ারম্যান: এদিকে আগুন লাগার পর থেকে একদিনের জন্যও কার্গো অপারেশন বন্ধ না থাকার তথ্য দিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ারভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলছেন, “কার্গো অপারেশন আমরা একদিনের জন্যও বন্ধ করিনি। যেহেতু ইমপোর্ট কার্গো ভিলেজটা পুড়ে গেছে… এখন আপাতত নয় নম্বর গেট দিয়ে কার্গোগুলো ক্লিয়ার হচ্ছে। কিছু টেম্পোরারি শেড করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটা যতো দ্রুত করা যায় সেটা আমরা চালু রেখেছি।”
আমদানি ও রপ্তানির জন্য নতুন দুটো কার্গো কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়েছে। বছর খানেক আগেই সেগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ হলেও সেগুলো কেন ব্যবহার করা হচ্ছে না জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, “নতুন যে আমদানি ও রপ্তানি কার্গো কমপ্লেক্স টেকওভার করার জন্য অনেকগুলো মিটিং হয়েছে। বুঝে নেওয়ার জন্য (টেকওভার) করার জন্য টাকা-পয়সা সংক্রান্ত কিছু বিষয় এখনো ফয়সালা হয়নি। ওনাদের যে দাবি আর আমাদের যে হিসাব তার মধ্যে হাজার কোটি টাকার একটা গ্যাপ রয়ে গেছে।
“একটা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আমরা এই গ্যাপটা পূরণ করার চেষ্টা করছি। যেহেতু এটা সরকারি টাকা। এ সম্পর্কে একটা বোর্ডও গঠন করা হয়েছে দুই পক্ষের ভিত্তিতে। আমাদের ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এই গ্যাপ পূরণ হয়ে গেলে আমরা এটা টেকওভার করতে পারব।”
