জড়িত কাস্টমসের ৩ সিপাই গোয়েন্দা নজরদারিতে : শাহজালাল বিমানবন্দরে সক্রিয় পাচারকারি  চক্র: কুরিয়ারে ১৯ নিষিদ্ধ চক্র সক্রিয়

নিউজ ডেক্স : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে  একাধিক  পাচারকারি চক্র। এর সাথেবেবিচক, কাস্টমস, বিমান ও অন্যান্য এয়ার লাইন্স কর্মচারিরা জড়িত বলে গোয়েন্দা সংস্থা খতিয়ে দেখছে। কাস্টমসের ৩ সিপাই গোয়েন্দ নজরদারিতে। এদের তালিকা করে বিমানবন্দর থেকে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হলেও চক্র সদস্যরা এখনও বহাল। এদের মধ্যে চক্রের সদস্য  গোয়েন্দা সংস্থার এক সদস্য ধরা খেয়েছে।

এসব চক্র অভিনব কৌশলে সোনা, মোবাইলফোনসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্য পাচারের চেষ্টা করছে। কাস্টমসের নজরদারিতে ধরা পড়ছে একের পর এক চালান, তবুও থেমে নেই চোরাকারবারিরা।

লাগেজ বা শরীরে বেঁধে আনার প্রচলিত পন্থার বদলে এখন সোনা পাচার হচ্ছে ব্লেন্ডার, চার্জার লাইট, হুইলচেয়ার, জুতার তলা, পোশাক, এমনকি আন্ডারওয়্যারের মধ্যেও। কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, এসব কৌশল এতটাই অভিনব যে, অনেক সময় তারা নিজেরাও হতবাক হয়ে যাচ্ছেন। শুধু পাচারকারিরা নয়, চক্রগুলোর সঙ্গে জড়িত বিমানবন্দরের ভেতরে কর্মরত কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও উঠে আসছে তদন্তে। স্ক্যানিং, কেবিন ক্রু, ট্রলিম্যান ও ক্লিনার , এলআর—যারা ভিআইপিতে  ডিউটি করে থাকে, এলআর শাহিন এখনও  সক্রিয়।

সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ এপ্রিল বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে দুবাই থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন ৩৮ বছর বয়সী যাত্রী শাহজাহান। সন্দেহভাজন মনে হওয়ায় কাস্টমস কর্মকর্তারা তার পোশাক খুলে পরীক্ষা করেন। পোশাকের ওজন অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় পোশাকগুলো আগুনে পোড়ালে চারটি আন্ডারওয়্যার, একটি ফুলপ্যান্ট ও তিনটি টি-শার্ট থেকে ২ হাজার ৫৬০ গ্রাম স্বর্ণের পাউডার উদ্ধার করা হয়। পরে পরিশোধনের পর সেখান থেকে ২ কেজি ৪১৭ গ্রাম স্বর্ণ পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েত থেকে আসা জাজিরা এয়ারলাইন্সের যাত্রী সজিবের গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় তল্লাশি চালান কাস্টমস কর্মকর্তারা। শরীর ও লাগেজে কিছু না পেলেও তার আনা একটি চার্জার লাইটের ওজন বেশি মনে হওয়ায় সেটি খুলে দেখা হয়। ভেতরে পাওয়া যায় ২ কেজি ১০০ গ্রাম সোনা। এ রকম আরও নানা কৌশল অবলম্বন করছে নতুন চক্রগুলো।

নয়া কৌশল : চোরাকারবারিরা এখন সোনা পাচারে অর্ধশতাধিক কৌশল অবলম্বন করছে বলে জানিয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। জুতা, বেল্ট, কোমরবন্ধনি, শার্টের কলার, স্যান্ডেল, সাবান কেস, সাউন্ড বক্স, হুইলচেয়ার, ওষুধের কৌটা, খাবারের প্যাকেট, মানিব্যাগ, এমনকি স্বর্ণের গুড়া করে কাপড়ের সঙ্গে মিশিয়ে কিংবা মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের ভেতরেও পাচার করা হচ্ছে সোনা। এমনকি স্ক্যানার ও নিরাপত্তাকর্মীদের নজর এড়াতে সোনার ওপর কালো ও সিলভারের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ শাখার যুগ্ম কমিশনার মো. কামরুল ইসলাম বলেন, রোগী সেজে হুইলচেয়ারে করে, কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশে স্কচটেপে মুড়িয়ে স্বর্ণ পাচারের ঘটনা ঘটছে। এমনকি ওমরাফেরত হাজীদের মধ্যেও এমন পাচারকারী ধরা পড়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চারটি আন্তর্জাতিক চক্র এই সোনা পাচারে জড়িত। দুবাই ও চীনভিত্তিক দুটি চক্রে ১০ জন করে সদস্য রয়েছে, সিঙ্গাপুরভিত্তিক চক্রে সাতজন এবং মালয়েশিয়াভিত্তিক চক্রে ৯ জন সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রকে শাহজালাল বিমানবন্দরে সহায়তা করছে কাস্টমসের অন্তত তিনজন সিপাহী। তারা ‘গ্রিন চ্যানেল’ এলাকায় দাঁড়িয়ে চোরাই মালামাল পার করাতে সহায়তা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিমানবন্দরের বাইরেও মালামাল গাড়িতে তুলে দিতে আলাদা একটি ‘স্কটিং চক্র’ কাজ করছে।

ঢাকা কাস্টমস হাউসের কমিশনার মুহম্মদ জাকির হোসেন  গণমাধ্যমে  জানান, আমরা নজরদারি অনেক বাড়িয়েছি। অবৈধ পণ্য যেন কোনোভাবেই বের না হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি কর্মকর্তাকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রিভেন্টিভ টিম অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে, গোয়েন্দা সোর্সও বাড়ানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চোরাকারবারিরা যত অভিনব কৌশলই ব্যবহার করুক, আমাদের নজরদারিতে তারা ধরা পড়ে যাচ্ছে। কাস্টমস, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিমানবন্দরের অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে নজরদারি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কেউ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকলে, সে কাস্টমস কর্মী হোক বা অন্য কেউ, তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শুধু বিমানবন্দর নয়—কাস্টমসের আমদানি শাখার কুরিয়ার শুল্কায়ন গেট দিয়ে দেদারচ্ছে পণ্য পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পেরেছে। এখানে নিষিদ্ধ ১৯ কারবারি সক্রিয়। এরমধ্যে নাজিরের নাম সবার মুখে মুখে। ১নং ডেলিভারি গেট দিয়েও  মিথ্যা ডিক্লারেশনে, ওজন কারচুপিতে, নামকাওয়াস্ত ট্যাক্সে পণ্য খালাস হয়ে যাচ্ছে লে সূত্রে জানা যায়। এখানে গোয়েন্দা সংস্থার সই জাল করে পণ্য পাচারের ঘটনাও ঘটেছে, এ ব্যাপারে কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছিল, তারা জেল খেটে আবার সক্রিয়।