একুশে বার্তা রিপোর্ট : অবশেষে দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবং লুটপাটের মহোৎসবকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প মাত্র ৬শ’ ৫৮ কোটি টাকায় সম্পন্ন হওয়ায় পথে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ( বেবিচক ) কর্তৃক নিজস্ব অর্থায়নে চলমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক ম্যাল্টিমোড রাডার সিস্টেম সংস্থাপন প্রকল্পের কাজটি সম্পন্ন হবার এখন দিনক্ষণ অপেক্ষা করছে, অচিরেই তা শুভ উদ্ধোধন হবে।
জানা যায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে ব্যবহূত সার্ভিলেন্স সিস্টেমটি প্রাইমারী ও সেকেন্ডারি রাডার সমন্ধয়ে গঠিত- যা ১৯৮৪ এবং ১৯৮৬ সালে সংস্থাপন করা হয়। মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় এবং বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে বেশ কয়েকবার মেরামত করা হলেও বাংলাদেশে আধুনিক মাল্ডিমোড ( রাডার, এডিএস-বি ও এমল্যাট) রাডার সংস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয় ২০০৫ সালে।
২০১৩ সালে সেপ্টেম্বরে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্বে (পিপিপি) প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অনুমোদন দেয়। ২০১৬ সালে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২১০০ কোটি টাকার প্রস্তাবে সায় দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করিম এসোসিয়েটসকে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করে বেবিচক। কিন্ত সে সময় পত্রপত্রিকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনভিঙঘতা, ব্যাপক লুটপাটের অভিসন্ধি ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে এবং বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের তদন্তে অভিযোগের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় প্রকল্পটি সে সময় আর আলোরমুখ দেখেনি।
বেবিচকের একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, বর্তমানে মেয়াদ উত্তীর্ণ রাডার অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় দেশের বাণিজ্যিক আকামসীমা নিয়ন্ত্রণ করছে- যা দেশের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অথরীটির মানদন্ডে প্রথম শ্রেণীর বিমানবন্দরে উত্তীর্ণ হবার জন্য মাল্টিমোড রাডার স্থাপনের কোন বিকল্প নেই। সংগত কারণেই উন্নত বিশে^র বিভিন্ন দেশের সংগে বাংলাদেশের সরাসরি যাত্রীবাহি এবং কার্গো বিমান চলাচল করা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO) এর নির্দেশনা মোতাবেক এবং বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক্রমে পিপিপি পদ্ধতির পরিবর্তে নিজস্ব অর্থায়নে বেবিচক পুনরায় মাল্টিমোড রাডার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগে কাজ শুরু করে।
এরই ধারাবহিকতায় বেবিচকের আগ্রহের ভিত্তিতে বাংলাদেশস্থ ফ্রান্স দূতাবাস কর্তৃক ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখ আলোচ্য রাডার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কার্যক্রম ফ্রান্সের রাষ্টীয় সংস্থা “থ্যালেস লাস ফ্রান্স”-এর মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়।
উল্লেখ্য, থ্যালেস রাডার সিস্টেমের যন্ত্রপাতি উৎপাদন এবং সংস্থাপনে বিশে^র অন্যতম স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠান এবং ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশে সরবরাহকৃত রাডারটিও থ্যালেসের তৈরি ছিল।
পরবর্তীতে থালেস ফ্রান্সের নিকট হতে রাডার সিস্টেম এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য যন্ত্রপাতি পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬ এর ৬৮ ধারায়র আওতায় রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ এর বিধি ৭৬(২) এর বিধান অনুসারে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ক্রয়ের জন্য ৮ মে, ২০১৯ তারিখে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদন পাওয়া যায়। উক্ত অনুমোদনের প্রেক্ষিতে ৩ নভেম্বর ২০২০ তারিখে ফ্রান্সের সাথে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
পরে থ্যালেসের থেকে প্রাপ্ত পূর্ণাংগ কারিগরি প্রস্তাবটি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা এবং কমিটি কর্তৃক নীরিক্ষা এবং মূল্যায়নপূর্বক এর ওপর প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটি (ICAO) এবং Technical Cooperation Bureau (TCB) কর্তৃক মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হয় এবং টিসিবি কর্তৃক যাচাইয়ে থ্যালেসের কারিগরি প্রস্তাবটি সবুজ সংকেত পায়। পরবর্তীতে বেবিচকের অধিকতর অনুরোধের প্রেক্ষিতে থ্যালেস ফ্রান্স সম্পূর্ণ প্রকল্পের জন্য ( টেকনিক্যাল এবং সিভিল কাজ) ৭৫,৬৭২,৬৮৫.০০ ই্উরো প্রস্তাব করে- যা বেবিচক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার দীর্ঘ নেগোসিয়েশনের ধাপ পেরিয়ে ৬৩,৭০০,০০০.০০ ইউরোতে গিয়ে দাড়ায়, যা বাংলাদেশি টাকা ৬৫৮,৪০,৩২,০০০.০০ ( প্রস্তাবের দিন অর্থাৎ ২৪ ডিসেম্বর২০২০ তারিখে মুদ্রা বিনিময় হার ১ ইউরো =১০৩.৩৬ টাকা বিবেচনায়) ।
অবশেষে, Installation of RADAR including CNS-ATM (Communication Navigation and Surveillance – Air
Traffic Management) System at Hazrat Shahjalal International Airport নামীয় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২১ সালের ২১ অক্টোবর বেবিচক এবং থ্যালেস লাস ফ্রান্সের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বর্তমানে প্রকল্পটি অনেকাংশে দৃশ্যমান হয়েছে এবং প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নাসরিন সুলতানার ভাষ্যমতে প্রকল্পটির প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ এ বছরের শেষের দিকে সমাপ্ত হবে বলে তিনি আশাবাদি।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবার পর যে সব সুবিধা পাওয়া যাবে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দেশের বাণিজ্যিক আকাশসীমা পূর্ণাংগ সারভেইলেন্স এবং অটোমেশনের আওতায় আসা, যার ফলে বাংলাদেশের আকাশ হবে অধিকতর সুরক্ষিত। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর বিমানবন্দরের যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ, যার ফলস্বরূপ উন্নতবিশে^র সাথে সরাসরি যাত্রীবাহি এবং পণ্যবাহি বিমান চলাচল নিশ্চিত হবে। এছাড়া সুন্দরবন, পার্বত্য চট্রগ্রামের কিছু অন্ঞল ও বংগোপসাগরে নতুন নিয়ন্ত্রণে আসা আকাশসীমার ওপর নতুন মাল্টিমোড রাডার সিস্টেমের অটোমেশন নিশ্চিত হওয়ার মাধ্যমে অন্য দেশের উড়োজাহাজ বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করলে ”ফ্লাইং ওভার চার্জ” হিসেবে প্রতিবার আমাদের আকাশসীমা ব্যবহারের জন্য প্রায় ৫০০ ডলার করে উপার্জন করবে বাংলাদেশ।
Share this:
- Click to share on Facebook (Opens in new window)
- Click to share on Twitter (Opens in new window)
- Click to share on LinkedIn (Opens in new window)
- Click to share on Tumblr (Opens in new window)
- Click to share on Pinterest (Opens in new window)
- Click to share on Pocket (Opens in new window)
- Click to share on Reddit (Opens in new window)
- Click to share on Telegram (Opens in new window)
- Click to share on WhatsApp (Opens in new window)
- Click to print (Opens in new window)
