একুশে বার্তা রিপোর্ট : বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মনজুর কবীর ভুইয়া বলেছেন, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে বেবিচককে ঢেলে সাজানো হচ্ছে, ইতিমধ্যেই কয়েকজনকে বদলি করা হয়েছে, বদলির প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।
এদিকে সদস্য পরি. পরি, সদস্য এফএসআর, ডিডি সাধন কুমার মোহন্ত, ডিডি রাশিদা সুলতানা, পরিচালক এইচআর নুরুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে। কিন্ত ডিডি রাশিদা মেডিকেল সনদ ছাড়া বদলিকৃত স্থানে যোগদান করেননি, চেয়ারম্যান তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিলেও তা প্রশাসন আমলে নিচ্ছে না। সদস্য প্রশাসনের দপ্তরে তা মুখথুবড়ে পড়ে আছে।
গত ১৫ দিনেও বদলিকৃত দুই মেম্বার-মেম্বার অপস, মেম্বার এফএসআর বেবিচক ছাড়েননি।
নূরুল ইসলামের বদলি হলো, শাস্তি হলো না : সব নজির ভেঙে একই স্থানে প্রায় দেড়যুগ খুঁটি গেড়েছিলেন পরিচালক নূরুল ইসলাম। তিনি ২০১০ সালে সহকারী পরিচালক হিসেবে বেবিচকের প্রশাসন শাখায় যোগ দিয়েছিলেন। তার দুর্নীতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও তাকে দুই দফায় পদোন্নতি দিয়ে পরিচালক করা হলেও এতদিন একই স্থানে থেকেছেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের কয়েক কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয় আশীর্বাদ ও খুঁটির জোরে নুরুল ইসলাম এভাবে একই স্থানে দেড় দশক থাকতে পেরেছেন। তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা রিপোর্ট আমলে নেয়া হয়নি।অডিট আপত্তি ওঠার পরও তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে-যা তদন্ত করলে বের হয়ে আসতে পারে, ডিডি (হিসাব) আনোয়ার হোসেন এ ব্যাপারে কলকাঠি নেড়েছেন।ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত গাইড হয়ে এই নূরুল ইসলাম হজ্বও করে এসেছেন, সরকারি ১৫ লাখ টাকাও অনুদান পেয়েছেন বলে জানা যায়।
তার কথিত ভাগিনা হাকিম দুই দুইবার সোনা পাচার করতে গিয়ে ধরা খেলেও এখনও মামার খুটির জোরে চাকরিতে বহাল।এই নূরুল ইসলাম চেয়ারম্যান মফিদুর রহমানের আমলে বেবিচককে ‘কুমিল্লা সমিতি’ বানিয়ে ফেলেছিলেন।এবার এই কুমিল্লা সমিতির লোকজন তার বদলি ঠেকানোর জন্য চেয়ারম্যানের দপ্তরে সাউটিং করেছে। পরিচালক মানব সম্পদ নূরুল ইসলাম গত সরকারের আমলে নিয়োগ বাণিজ্য করে শত কোটি মালিক হয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।নিয়োগে তিনি মধ্যস্থতা হিসেবে কাজ করতেন। অনেকে বলে বেড়াচ্ছেন নূরুল ইসলামের বদলি হলো কিন্ত শাস্তি হলো না।
আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপির আশীর্বাদপুষ্ট দুই ডজনের বেশি কর্মকর্তা বেবিচক ও জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনও দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এর মধ্যে কিছু কর্মকর্তা ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে বসে আছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।বিমানের পরিচালক মমিনুল ইসলামকে আবারও প্রাইজ পোস্টিং দেয়া হয়েছে। কেমিস্ট্রির ছাত্রকে হিসাব বিভাগের প্রধান করা হয়েছে।
তাদের কারণে বৈষম্যের শিকার শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ ছাড়া ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জনবল নিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগে বেবিচকের উপপরিচালক সাধন কুমার মোহন্ত ও রাশিদা সুলতানাকে নিজ দপ্তরে অবরুদ্ধ করে নাজেহাল করেছেন বেবিচক কর্মচারিরা।
তাদের বিরুদ্ধে দোকানপাট, লাউঞ্জ, পার্কিং, বিলবোর্ডসহ বিভিন্ন সেক্টরে বরাদ্দ দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তুলে বেবিচকের উপপরিচালক সাধন কুমার মহন্তকে মেম্বার অপসের রুমে অবরুদ্ধ করে তাঁর অপসারণ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে উপপরিচালক রাশিদার বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ১৫ আগস্ট শোক দিবস পালনে কর্মচারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি বেবিচক ও বিমানের প্রধান দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে অপসারণ করা হয়েছে। তারা হলেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার কমডোর সাদিকুর রহমান চৌধুরী ও বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিইও জাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের আশীর্বাদপুষ্ট তারা।
সূত্র জানায়, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন বিমানের সিইও জাহিদুল ইসলাম। অন্যদিকে বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমানের সমর্থনপুষ্ট ছিলেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার কমডোর সাদিকুর রহমান চৌধুরী। সম্প্রতি তাদের অপসারণ করা হয়েছে। আর সাদিকুর রহমান চৌধুরি ছিলেন ‘এয়ার কমোডর’- কিন্ত বেবিচকে ‘এয়ার ভাইস মার্শাল’ পদবির কর্মকর্তাদের দ্বারা চেয়ারম্যানের পদটি পূরণ করা হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে একজন জুনিয়র কর্মকর্তাকে বেবিচকের চেয়ারম্যান করা হয় তার সমর্থনপুষ্ট সাবেক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমানের তদবিরে। এ নিয়ে একুশে বার্তার অনলাইনে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়।
গত ১৫ বছরে তাদের দাপটের কাছে অসহায় ছিলেন সাধারণ কর্মীরা। পদোন্নতি, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার বেবিচক ও বিমান- এই দুটি সংস্থার শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। ওই আশীর্বাদপুষ্টরা এখন নিজেদের পদ ঠেকাতে সুর পাল্টে সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে কর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আওয়ামী দোসর বেবিচকের সদস্য (অর্থ) এসএম লাবলু রহমান, আওয়ামীলগের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মতিউর রহমানের আপন ভাগিনা নির্বাহী পরিচালক (সেমসু) রেজাউল করিম এখনও সেমসুতে বসে আছেন, তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের কথা বাতাসে ভেসে বেড়ায়, সেমসুর কর্মকর্তা-কর্মচারিরা তার রূঢ আচরণে ক্ষুব্ধ।
পরিচালক (সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) ইসরাত জাহান পান্না, সিনিয়র সম্পত্তি কর্মকর্তা সুব্রত চন্দ্র দে এখনও বেবিচকে বহাল ।
এটিএম বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান , এই মিজানুর রহমান ডিডি সাধন কুমার মোহন্তের দোসর, সম্পত্তি বিভাগ দেখভাল করেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে বিভিন্ন দোকানপাট , লাউন্ঞ, বিঙাপনি সংস্থা বরাদ্দ-নবায়ন টেন্ডার বাণিজ্য- ইত্যাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ডিডি সাধন কুমার মোহন্তর সাথে মিলেমিশে শাহজালালে আওয়ামী দোসর শমী কায়সার, নায়ক মাহফুজের লাউন্ঞ ধানসিড়ি-নকসিকাথা নবায়ন করেছে গত ১৪ আগস্ট। কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবসায়ীরা ডিডি সাধনকে লান্ঞিতকরন, তাকে চট্রগামে বদলি করা হলেও এই মিজানুর রহমান ও আলামিন এখনও বহাল।
শাহজালাল বিমানবন্দরের আরেক সিনিয়র কর্মকর্তা সেলিম মিয়ার চেয়ার এখনও অটুট। যে সেলিমকে কর্তৃপক্ষ ডবল দায়িত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করে, যার বিরুদ্ধে মায়ের জমি লিখে নেয়ার অভিযোগ ওঠেছে। একযুগ ধরেও শাহজালাল বিমানবন্দরে কর্মরত এই সেলিম, তার বিরুদ্ধে ট্রলিম্যান ও ভিআিইপি লাউন্ঞে এটেন্টডেন্টদের রোস্টার বাণিজ্য করার অভিযোগ ওঠেছে। এলআর শাহিনকে আগলে রেখেছে এই সেলিম। এলআর শাহিনকে মানব পাচারসহ বিভিন্ন পাচারে সহযোগিতা করছে এই সেলিম। সেলিম আবার বিমানবন্দর সৌদি মসজিদ খ্যাত মসজিদের ক্যাশিয়ার, সাবেক ইমাম চেইনম্যান আখতারুজ্জামানের দানবাক্স ফেলে চাদা আদায়ের টাকাও নাকি সেলিমের পকেটে যায়।
এ ছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান কার্যালয় বলাকা ভবন ও শাহজালাল বিমানবন্দরসহ দেশ-বিদেশে বিমানের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে আছে সাবেক সিটি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ কয়েকজন মন্ত্রী-এমপির আশীর্বাদপুষ্টরা। তাপসের ঘনিষ্ট মশিকুর রহমান এখনও দেশের বাইরের একটি স্টেশনের ম্যানেজার।
এ ব্যাপারে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া একটি গণমাধ্যমে বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে বেবিচককে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এরই মধ্যে বেবিচকের বেশ কয়েকটি পদে রদবদল করা হয়েছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী রাজনৈতিক আশীর্বাদে বেবিচকের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
