শমীর ধানসিড়ি : ৮০ লক্ষ টাকা বকেয়ার পরও নবায়ন : দুদকের চিঠি হাওয়া: ঘর ভেঙেছে এক বেবিচক কর্মকর্তার: শমীর ম্যানেজার মৃনাল লাপাত্তা : বলিরপাঠা ডিডি সাধন কুমার মোহন্ত : ১৫ বছরে শত কোটি টাকা লুটে নেয়ার সিন্ডিকেট সদস্যরা বহাল : ডিজিসিএ অনুষ্ঠানে ২ কোটি টাকা খরচ না হলেও বেবিচক বিল দেয় ১৫ কোটি টাকা! আওয়ামী দোসর আওরংগ শাহজালালে রিপ্যাকিং ব্যবসা করছে

একুশে বার্তা রিপোর্ট : বেবিচকে ৮০ লক্ষ টাকা বকেয়ার পরও শমী কায়সারের ধানসিড়ি প্রতিষ্ঠানটি নবায়ন করেছে বেবিচক কর্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে ডিডি সাধন কুমার মোহন্তকে বলিরপাঠা বানানো হয়েছে। দুদক বিমান মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে তদন্ত রিপোর্ট চাইলেও বেবিচকে এসে তা হাওয়া হয়ে গেছে, তদন্ত রিপোর্ট আলোরমুখ দেখেনি। শমীর ম্যানেজার মৃনাল লাপাত্তা। এক বেবিচক কর্মকর্তার সাথে শমীর সম্পর্ক থাকায় ঘর ভেঙেছে ওই কর্মকর্তার। আওয়ামী দোসর ফ্যাসিস্ট হাসিনার ঘনিষ্ট শমী গত ১৫ বছরে বেবিচকে বিভিন্ন বিমানবন্দরে লাউনন্ঞ বরাদ্দ নিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। কিন্ত এরপরও বেবিচক তাকে আগলে রেখেছে। শমী আওয়ামী আমলে চেয়ারম্যানের রুমে বসে দাপটের সাথে ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনা দিতো, বিভিন্ন বিমানবন্দরে লাউন্ঞ বরাদ্দ নিতো। দুদক তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিমান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিলেও বেবিচক থেকে তা হাওয়া হয়ে গেছে বলে চাউড় হয়েছে। শমীর লাউন্ঞ ব্যবসা,নবায়ন নিয়ে ‘একুশে বার্তায়’ একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও বেবিচক কর্তৃপক্ষ কম্ভুকর্ন।


এ দিকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর আত্মীয় আওরংগ শাহজালালে রিপ্যাকিং ব্যবসা করছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা ফজলে রাব্বি ‘মোহাম্মদী এন্টারপ্রাইজের’ নামে বিলবোর্ড ব্যবসা করছে। এসব প্রতিষ্ঠান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নবায়ন করা হচ্ছে।
এর সাথে সম্পত্তি শাখার ডিডি আনোয়ার, এডি মশিউর এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান এবং কেরানি আলামিনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানা যায়।
এ দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ইশতিয়াক মাহমুদ নামে এক আন্দোলনকারীকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানায় দায়ের হওয়া মামলায় গত মঙ্গলবার রাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ই-ক্যাবের সাবেক সভাপতি ও অভিনেত্রী শমী কায়সার। গত ৬ অক্টোবর বুধবার তাকে তিন দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নেওয়াসহ তদবির বাণিজ্যের বিষয়ে পুলিশের কাছে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন।

জানা গেছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বিভিন্ন দপ্তরে শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন শমী কায়সার ও তার ব্যবসায়িক পার্টনার আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মৃণাল কান্তি রায়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা বিমানবন্দরের লাউঞ্জ ও দোকান বরাদ্দ, পণ্য সরবরাহ, বিনা টেন্ডারে ডিজিটাল ব্যানার ব্যবসা, ক্রেস্ট বাণিজ্যসহ বেবিচকের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শমী কায়সারের প্রতিষ্ঠান ‘ধানসিঁড়ি কমিউনিকেশন’ ও মৃণালের ‘এক্সিকিউশন’ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের নামে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ দুর্র্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগও জমা পড়েছে। হয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটি। কিন্তু শমী-মৃণাল সিন্ডিকেটের ক্ষমতার দাপটে কোনো তদন্তই আলোর মুখ দেখেনি। সেসব অভিযোগের বিষয়ে বেবিচক ও বেসামরিক বিমান পরিবহন এবং পর্যটন মন্ত্রণালয় ফের তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।
গত ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর শমী-মৃণাল সিন্ডিকেটের সদস্যরা গাঢাকা
দিলেও সম্প্রতি তারা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর মধ্যেই শমী কায়সারের গ্রেপ্তারের খবরে অনেকটাই বেকায়দায় পড়েছেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা। শমী কায়সারকে গ্রেপ্তারের পর তার দুর্নীতির দোসর মৃণাল কান্তিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির মধ্যে রয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, শমী কায়সারের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান ‘ধানসিঁড়ি’ ও মৃণাল কান্তির ‘এক্সিকিউশন’-এর মাধ্যমে শাহজালাল বিমানবন্দরে গত ১৫ বছর প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়েছেন তারা। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য ২০২২ সালে বিমান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় দুদক। রহস্যজনক কারণে সেই তদন্ত বেশি দূর এগোয়নি। বহাল তবিয়তে কাজ করে গেছেন তারা। বরং বারবার তাদের ইজারা চুক্তি নবায়ন করে কোটি কোটি টাকা কামানোর সুযোগ করে দিয়েছেন বেবিচকেরই এক শীর্ষ কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে প্রভাব খাটিয়ে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের প্রায় সব কাজই বাগিয়ে নিত শমীর প্রতিষ্ঠান।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমানের আমলে ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর রাজধানীতে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর অংশগ্রহণে ইকাও-এর ৫৮তম ডিজিসিএ সম্মেলন শুরু হয়। প্যান প্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁওয়ে এর উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী। সম্মেলনে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩৬ দেশ ও ১১টি আন্তর্জাতিক সংগঠনের মহাপরিচালক ও চেয়ারম্যান এবং তাদের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। এই অনুষ্ঠানের ইভেন ম্যানেজমেন্টের কাজ যৌথভাবে সম্পন্ন করে শমী ও মৃণালের প্রতিষ্ঠান। পুরো অনুষ্ঠানে দুই কোটি টাকা খরচ না হলেও তারা বিল তুলে নেন ১৫ কোটি টাকা। ১৩ কোটি টাকাই লুটপাট করা হয় বলে অভিযোগ ওঠেছে।
জানা গেছে, শমী কায়সার ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সভাপতি ছিলেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ১৪ আগস্ট শমীকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আর মৃণাল কান্তি গত ৫ আগস্ট থেকে পলাতক রয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তাদের আশীর্বাদপুষ্টদেরই বিমানবন্দরের বিজ্ঞাপনের জন্য বিলবোর্ড, লাউঞ্জ ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ দেওয়া হতো।
গত ১৫ বছর ধরে শাহজালাল বিমানবন্দরে ধানসিঁড়ি নামে দুই কোটি ৬২ লাখ ২ হাজার ৪৫৬ টাকা মূল্যের দুটি লাউঞ্জ নামমাত্র মূল্যে (৮৯ লাখ ১৫ হাজার ৬৬২ টাকা) ইজারা নিয়ে জবরদখল করে আছে শমী কায়সারের প্রতিষ্ঠান। এতে সরকার দেড় কোটি টাকার বেশি রাজস্ব বঞ্চিত হয়। আর ধানসিঁড়ি লাউঞ্জ শমী নিজে পরিচালনা না করে সিটি ব্যাংককে ভাড়া দিয়ে প্রতিমাসে হাতিয়ে নেন ২ কোটি টাকা। তাদের সিন্ডিকেট এতই শক্তিশালী যে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরও তার ইজারা চুক্তি নবায়ন করা হয়।এ ক্ষেত্রে কলকাঠি নাড়েন বেবিচকের সেকেন্ড-ইন কমান্ড এক কর্মকর্তা, যিনি আবার পাপনের আত্মীয়ও বটে।
শমীর পার্টনার মৃণাল কান্তি গত চার বছর ধরে শাহজালালে সব ধরনের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ করতেন। করোনাকালে দূরত্ব বজায় রাখার জন্য শাহজালালে চৌকোনা ছক এঁকেই বাগিয়ে নেন দুই কোটি টাকা। সিভিল অ্যাভিয়েশনের বড় বড় অনুষ্ঠানে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের কাজ মৃণাল কান্তি ছাড়া কাউকে দেওয়া হতো না। কাজ বাগিয়ে নিতে বেবিচকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দামি দামি উপহার দিতেন তাদের সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
দুদক কর্তৃক বিমান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, করোনকালীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইজারা মূল্য পরিশোধ না করায় তাদের ইজারা বাতিল করে উচ্ছেদ করা হয়। এখানে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম শমী কায়সারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ধানসিঁড়ি। শমী পরিচালিত ২৩৫২.৯১ বর্গফুট লাউঞ্জের (সিটি এমেক্স) ইজারা মূল্য কখনই পূর্ণাঙ্গভাবে দেওয়া হয়নি। ৮০ লাখ ১৭ হাজার ৪৫০ টাকা অনাদায়ী বকেয়া পরিশোধের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে চূড়ান্ত পত্র (সংযুক্তি) প্রদানপূর্বক সময় দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি (ধানসিঁড়ি) বকেয়া পরিশোধ করেনি। বর্তমানে প্রায় ৮০ লাখ টাকা বকেয়া প্রদান না করে প্রতষ্ঠিানটি বহাল তবিয়তে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে। দুদকের কাছ থেকে এই চিঠি পাওয়ার পর বিমান মন্ত্রণালয় বেবিচককে তদন্ত করে ব্যবস্থা এবং প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু অদ্যাবধি সেই প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। উপরন্তু বারবার শমী কায়সারের ইজারা নবায়ন করা হয়েছে।
অনুসন্ধ্যানে জানা যায়, এক শমী নয় আরো বহু আওয়ামী দোসর বেবিচকে লাউন্ঞ বানিজ্য- দোকান বানিজ্য, রিপ্যাকিং বাণিজ্য করছে। যদিও এক অভিনেতা তার রাজনৈতিক প্রভাব, শশ্বরের নাম ভাংগিয়ে চলার কথা অস্বীকার করেছেন। তার প্রতিষ্ঠানটি নকশিকাথা, একজন বেবিচক কর্মকর্তার তার পার্টনার বলেও জানা যায়।
আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা, শেখ পরিবারের অন্যতম সদস্য আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর আত্মীয় আওরংগ শাহজালালে রিপ্যাকিং ( যাত্রী ল্যাগেজ প্যাকিংকরণ) কাজ করার নামে যাত্রী হয়রানি করছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। আর এর সুবাধে এর সাথে সংশ্লিষ্টরা শাহজালাল বিমানবন্দরে বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছে বলে গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা ফজলে রাব্বির ‘মোহাম্মদী এন্টারপ্রাইজ’ বিলবোর্ড বার বার নবায়ন করা হচ্ছে। এর আগে সব আওয়ামী দোসরদের প্রতিষ্ঠান শাহজালালে নবায়ন করা হয়েছে, লক্ষ লক্ষ টাকার বিল বকেয়া থাকার পরও এ সব প্রতিষ্ঠান নবায়করণ কার স্বার্থে?
এ ব্যাপারে সম্পত্তি শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, সব মেম্বার স্যার জানেন, আপনি ডিডি-এডির সাথে কথা বলুন।