২০১৩-২০২৫ এক যুগ পর আবারও শাহজালালের আমদানি কার্গোতে একই স্থান থেকে আগুনের সূত্রপাত : ৩৩৬ দিন আগে বেবিচককে ‘কুরিয়ারে বৈদ্যুতিক ত্রুটির অভিযোগাকারে চিঠি দেয় আইইএবি: আমলে নেয়নি বেবিচক. ইএম বিভাগ কমভুকর্ণ : বেবিচক-বিমান- আইইএবি-মন্ত্রণালয় যার যার অবস্থানে, দায় নিচ্ছে না কেউ!তদন্ত সংস্থা বলছে ‘এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়-অব্যবস্থাপনা,ত্রুটিপূর্ন বৈদ্যুতিক সংযোগ

একুশে বার্তা ডেক্স : শাহজালালের কার্গো হাউজের কুরিয়ারে আগুন লাগার ৩৩৬ দিন আগে বৈদ্যুতিক সংযোগ ত্রুটিসহ বিভিন্ন অভিযোগ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে—(বেবিচক) অভিযোগ আকারে দাপ্তরিক চিঠি দিলেও তা আমলে নেয়নি বেবিচক, বেবিচকের ইএম বিভাগ ছিল কম্ভুকর্ণ। বেবিচক বলছে দায়িত্ব ইজারাদারের। কিন্ত আইইএবি বলছে ২০১৩ সালেও এই কুরিয়ারে বড় ধরনের আগুন লাগে। ৬ কোটি ব্যয় করে আমরা কুরিয়ার সংস্কার করে তুলি। বেবিচক ওই ৬ কোটি টাকা আমাদের পরিশোধ করেনি।
২০১৩ সালে আগুনের ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতকে দোষারূপ করা হয়। এবার একযুগ পর ২০২৫ সালে এক সংস্থা আরেক সংস্থাকে দোষারূপ করছে।
গতবার শুধু কুরিয়ার ইউনিটে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এবার পুরো কার্গো ইউনিট আগুনে পুড়ে গেছে। গতবার কুরিয়ার ইউনিট সংস্কারে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ১ বছর সময় লাগলেও এবার পুরো কার্গো ইউনিট সংস্কার করে আমদানি উপযোগি করে তুলতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লাগতে পারে, সময় লাগতে পারে ১ বছরের বেশি সময় , যদিও বুয়েট এতোমধ্যেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এর নকশা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, বেবিচক টেন্ডার প্রক্রিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে জানা যায়।
এ দিকে তদন্ত সংস্থাও কুরিয়ারে বৈদ্যুতিক সংযোগ ত্রুটি খুজে পেয়েছে। বিদেশি তদন্ত সংস্থা ভস্মীভুত ছাই থেকে পুড়ে যাওয়া পারফিউমের বোতল ও তার জব্দ করেছে আলামত হিসেবে। তদন্ত সংস্থা মনে করছে এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়-অব্যবস্থাপনার ফসল। এখানকার রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়বদ্ধতা কেউ নিচচ্ছ না।
বেবিচক-বিমান- মন্ত্রণালয়-আইইএবি- চার সংস্থা একেক সংস্থা অপর সংস্থার দিকে দায়বদ্ধতার দোষারূপ করছে। কেউ দায়দায়িত্ব নিচ্ছে না।
বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, কার্গো হাউজের কুরিয়ার ইউনিট আমাদের প্রশাসনিক এখতিয়ারের বাইরে, এটা বেবিচক ইজারা দিয়েছে আইইএবিকে। আইইএবি বলছে, বেবিচককে অভিযোগ করার পরও বৈদ্যুতিক সংযোগ মেরামত করেনি গত একবছরে।
অন্যদিকে বেবিচক বলছে কুরিয়ারের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব আইইএবি’র।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হাউসে আগুন লাগার পক্ষকাল পরও ধোয়াসা কাটেনি। ২৭ ঘন্টা পর আগুন নেভার পরও থেমে নেই উত্তাপ। পুড়ে যাওয়া পণ্যের ধোঁয়া মিলিয়ে গেলেও কিন্তু ধোঁয়াশা রয়ে গেছে ‘দায় কার’—এই প্রশ্নে। একই ঘটনার তিন পক্ষ, তিন রকমের বক্তব্য—দায় এড়ানোতেই যেন সবাই একমত।
ঘটনার পর পরই সব সংস্থা আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করলেও বেবিচক এর বাইরে।
আসলে কোন সংস্থায়ই আগুনের দায় এড়াতে পারে না, সব সংস্থার দায় স্বীকার করে সমাধান করা উচিত বলে অনেকে মনে করেন।
বিমান আগুনের সূত্রপাত যেখান থেকে -সেই কুরিয়ার ইউনিটকে তাদের প্রশাসনিক এখতিয়ারের বাইরে বলে দায় এড়িয়ে যেতে পার পেয়ে যাবে- এমন বক্তব্য দেয়া হচ্ছে জনসংযোগ বিভগে থেকে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইইএবি)—এই তিন প্রতিষ্ঠান এখন একে অপরের দিকে দোষের আঙুল তুলছে। কার্গো কমপ্লেক্সের এই অগ্নিকাণ্ড যেন তাদের ব্যবস্থাপনার গলদ, তদারকির শৈথিল্য ও জবাবদিহির অভাবের নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ অক্টোবর দুপুর আড়াইটার দিকে কার্গো হাউসের উত্তর পাশের কুরিয়ার ইউনিটে আগুনের সূত্রপাত হয়। কর্মীরা প্রথমে ধোঁয়া দেখতে পান, এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ইউনিটজুড়ে। ২৭ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ইলেকট্রনিকস, পোশাক, ওষুধ, ফার্মাসিউটিক্যালসসহ কোটি টাকার পণ্য ভস্মীভূত হয়।

দুর্ঘটনার তদন্তে বিমান মন্ত্রণালয়, বেবিচক, ফায়ার সার্ভিস ও বিমান বাংলাদেশ—এই চারটি সংস্থা কাজ শুরু করেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয়েছে দোষ চাপানোর রাজনীতি।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার বোশরা ইসলাম বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন এখনো সম্পন্ন হয়নি। আগুনের সূত্রপাত কোন অংশে হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি দাবি করেন, কুরিয়ার ইউনিট বিমান বাংলাদেশের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়ে না।

বিমানের নথি অনুযায়ী, তাদের ‘কার্গো অপারেশন ম্যানুয়াল’-এ কুরিয়ার ইউনিটের নিরাপত্তা বা রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে কোনো বিধান নেই। কার্গো কমপ্লেক্সের কুরিয়ার অংশটি বেবিচক ইজারা দিয়েছে কুরিয়ার কোম্পানিগুলোকে—ফলে দায়ও বেবিচকের, এমনটাই তাদের যুক্তি।

অন্যদিকে বেবিচক বলছে, ইজারা চুক্তি অনুযায়ী দায়ভার কুরিয়ার সংস্থাগুলোর। বেবিচকের এক কর্মকর্তা বলেন, “২০১৩ সালে বড় আগুন লাগার পর আমরা কার্গো হাউসের ব্যবস্থাপনা নিজেরা হাতে নিয়েছিলাম। পরে কুরিয়ার অংশ লিজ দেওয়া হয় আইইএবিকে। চুক্তি অনুযায়ী ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার দায় তাদেরই।”

কিন্তু কুরিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য একেবারেই উল্টো। তাদের দাবি—দুই বছর আগে বেবিচক নিজেই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। আইইএবির ট্রেজারার মো. জাকির হোসেন রিপন বলেন, “আমরা ২০১৩ সালের অগ্নিকাণ্ডের পরে আমরা আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করে লিজ নিয়েছিলাম। নির্মানে আমাদের প্রায় ৬ কোটি টাকা খরচ হয়। কিন্তু ২০২৩ সালে বেবিচক আমাদের সাথে লিজের চুক্তি নবায়ন না করে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। তারা আমাদেরকে জানায়, ভবনের ভেতরের মেরামত ও বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত কাজ তারা নিজেরা করবে। এরপর থেকে আমরা কেবল ভাড়াটিয়া। রক্ষণাবেক্ষণ বা নিরাপত্তা আমাদের দায় নয়।”

২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর আইইএবির সভাপতি কবির আহমেদ বেবিচককে লিখিতভাবে কার্গো হাউসের বৈদ্যুতিক ত্রুটি, নোংরা পরিবেশ ও অব্যবস্থাপনার কথা জানিয়েছিলেন। অভিযোগে উল্লেখ ছিল—ওয়্যারহাউজে তারের জট, অকার্যকর অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, নষ্ট ওয়াশরুম এবং ময়লায় ভরা পরিবেশ। তবু কোনো উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ।।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, আগুনের দিন দুপুর ১টা ৩৪ মিনিটে বিমান ও কাস্টমসের দুই কর্মচারী কুরিয়ার গেট সিল করে বেরিয়ে যান। ৪০ মিনিট পরই ধোঁয়া দেখা যায়। ফুটেজে দেখা যায়, ইউনিটের তার এলোমেলো, লাইট-ফ্যান সবসময় চালু, এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল ত্রুটিপূর্ণ। বিদেশি তদন্ত দল ঘটনাস্থল থেকে পুড়ে যাওয়া পারফিউম বোতল ও বৈদ্যুতিক তার সংগ্রহ করেছে।

একজন তদন্ত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমে বলেন, “এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, অব্যবস্থাপনার ফল। এখানে রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়বদ্ধতা কেউই নিচ্ছে না।”

বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক অবশ্য বলেন, “আইকাও প্রোটোকল অনুযায়ী শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ইজারা চুক্তি অনুযায়ী দায় ইজারাদারেরই। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আগুনের সূত্রপাত কুরিয়ার সার্ভিস থেকে।”

অন্যদিকে এক কুরিয়ার অপারেটর বলেন, “বেবিচক কয়েক মাস ধরে আমাদের চিঠির জবাব দেয়নি। শুধু ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ পাঠিয়েছে। বিদ্যুৎ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পুরোটাই তাদের হাতে ছিল।”

এখন প্রশ্ন একটাই—যে স্থানে প্রতিদিন কোটি টাকার মালামাল ওঠানামা করে, সেখানে রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত পক্ষ নেই কেন?

এই অগ্নিকাণ্ডে কার্গো হাউসের শুধু পণ্য নয়, পুড়ে গেছে দায়বদ্ধতার ধারণাও। তিন প্রতিষ্ঠানের ঠেলাঠেলিতে স্পষ্ট হয়েছে, শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্স কার্যত এক ‘অভিভাবকহীন এলাকা’, যেখানে প্রশাসনিক অবহেলা, বৈদ্যুতিক ত্রুটি ও ব্যবস্থাপনাগত বিশৃঙ্খলতাই আগুনের আগুনে ঘি ঢেলেছে। আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে সব শেষ করে দিয়েছে।ক্ষতি হয়েছে ২০০ কোটি টাকার ওপরে। যে কুরিয়ার ইউনিট দিয়ে প্রতিদিন ২ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হতো—তা আজ বন্ধ। গত ১৫ দিনে শুধু কুরিয়ার ইউনিট থেকেই সরকার হারাচ্ছে ৩০ কোটি টাকার রাজস্ব।