উত্তরখানে সোহাগ হত্যা : ২ আসামি ৪ দিনের রিমান্ডে : কিশোর গ্যাংয়ের দেড় শতাধিক সদস্যকে খুঁজছে পুলিশ : প্রত্যেকের নামে ৬ থেকে ১২টি করে মামলা

ডেক্স রিপোর্ট : রাজাধানীর উত্তরখানে কলেজছাত্র সোহাগ হত্যায় গ্রেফতার আল রাফী (২০) ও নাজমুল হুদা ওরফে নাদিম (২১) ৪ দিনের রিমান্ডে রয়েছে।

রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার তারা সোহাগ হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপকর্মে তাদের জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছে। আর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে ডিবি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য পেয়েছে।

এসব তথ্যের সূত্র ধরে এরই মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। তারা হল- বাহাউদ্দিন হাসান শাওন ওরফে গ্রীল শাওন (২১), শাকিল হোসেন ওরফে ড্যান্সার শাকিল (২২) এবং আক্তারুজ্জামান ছোটন (২২)।

এছাড়া বিগ বস, সেভেন স্টার এবং ভেঞ্চারসহ কিশোর গ্যাংয়ের বিভিন্ন গ্রুপের দেড় শতাধিক সদস্যকে খুঁজছে ডিবি। যাদের প্রত্যেকের নামে ৬ থেকে ১২টি করে মামলা আছে।

ডিবি সূত্র জানায়, ২৭ আগস্ট সকালে উত্তরখানের খ্রিস্টানপাড়া ডাক্তার বাড়ি মোড় এলাকায় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার চাকা থেকে কাদামিশ্রিত পানির ছিটা লাগে হৃদয় নামের এক কিশোরের গায়ে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রিকশাচালককে মারধর করে হৃদয়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কলেজছাত্র সোহাগ মারধরের কারণ হৃদয়ের কাছে জানতে চায়।

এনিয়ে দু’জনের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে হৃদয়কে চড় মারে সোহাগ। পরে হৃদয় তার বন্ধুদের বিষয়টি জানালে তারা এসে সোহাগের কাছে মারধরের কারণ জানতে চায়। একপর্যায়ে হৃদয়ের বন্ধু মাহবুবুল ইসলাম ওরফে রাসেল ওরফে কাটার উপর্যুপরি সোহাগের পেটে ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় সোহাগকে উত্তরার একটি হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সূত্র জানায়, শুধু এক বা দুটি ঘটনাই নয়- কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপকর্মে। তুচ্ছ ঘটনায় তারা খুনের ঘটনা ঘটাতেও পিছপা হচ্ছে না। ফেব্রুয়ারির শুরুতে প্রেমিকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে হাতিরঝিলে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ছুরি মেরে শিপন হাসান নামের একজনকে হত্যা করে। ওই ঘটনায় মানিক নামের অপর কিশোর আহত হয়।

৩০ আগস্ট পবিত্র আশুরার দিন সকালে ১ বছর আগের ঘটনার প্রতিশোধ নিতে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে মুন্না নামে এক কিশোরকে খুন করা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় ১৩ কিশোরসহ ১৭ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. কায়সার রিজভী কোরায়েশী বলেন, রাজধানীর উত্তরখান থানা এলাকার সোহাগ হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।

রিমান্ডে থাকা আসামিদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, রিকশার চাকা থেকে পানি ছিটানোকে কেন্দ্র করে মারধর-পাল্টা মারধরের জের ধরে খুনের ঘটনা ঘটে। মূলত ওই এলাকায় এ ধরনের কিশোর সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে। মামলা থাকলেও ওরা দাপটের সঙ্গে চলাফেরা করে।

তিনি জানান, রাজধানীর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। শিগগিরই তালিকা ধরে বড় ধরনের অভিযান চালানো হবে। তিনি বলেন, প্রতিটি গ্যাংয়ে ১৫ থেকে ২০ কিশোর সক্রিয় রয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর উত্তরা এলাকাতেই বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের দেড় শতাধিক সদস্য রয়েছে। তারা চুরি, ছিনতাই, মারামারি, আধিপত্য নিয়ে ছুরিকাঘাত, মাদক ব্যবসা, অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়সহ নানা অপরাধে জড়িত। খুন করতেও তারা পিছপা হয় না।

সূত্রমতে, উত্তরার পাকুরিয়া এলাকার নাইন স্টার গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে তালা-চাবি রাজু। একই এলাকার ৭ নম্বর সেক্টরের সেভেন স্টার গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে জয় ও শাকিল। ১৪ নম্বর সেক্টরের ডিসকো বয়েজের নেতা সেতু। আবদুল্লহাপুর আইচি মেডিকেল এলাকায় শিকদার গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে মৃদুল ও একন। বড়বাগ এলাকা পিকে গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ করে কাওছার।

আজমপুর কাঁচাবাজার এলাকায় চাপাতি সুমন গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে সুমন ও শুভ। আবদুল্লাহপুর কোটবাড়ি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে শামিম ও সিফাত। আজমেরি বালুর মাঠ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে আলতাফ। উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে মামুন-শিরির গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে এ গ্রুপটি। উত্তরখান মাজার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে পরাগ ও সাকিব।

এদের মধ্যে ২০১৮ সালে উত্তরায় চাঞ্চল্যকর কিশোর আদনান হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে ডিসকো বয়েজ এবং নাইন স্টার গ্রুপ। ওই সময় উত্তরা এলাকা থেকে কিশোর গ্যাংয়ের ২০ জনের বেশি সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়। তাদের বেশিরভাগ জামিন পেয়ে গেছে।

সূত্র আরও জানায়, দক্ষিণখানের একটি কিশোর গ্রুপের নেতা মো. নাজমুল হুদা ওরফে নাদিম। তার নামে প্রথম মামলা হয় ২০১৯ সালে। দক্ষিণখান থানায় ১ বছরের ব্যবধানে তার নামে এখন মামলার সংখ্যা ৬টি। এর মধ্যে খুনের মামলাও রয়েছে।

গোয়ালঘাট শাপলা মার্কেট এলাকার ২২ বছর বয়সী কিশোর গ্যাং লিডার শাকিল ওরফে ড্যান্সার শাকিল। তার নামে এ পর্যন্ত ৮টি মামলার কথা জানা গেছে। ২০১৬ সালে তার নামে প্রথম মামলা হয়। তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর।

উত্তরখানের বড়বাগ মহিলা মার্কেট এলাকার গ্যাং চালায় ২১ বছর বয়সী মো. বাহাউদ্দিন হাসান শাওন ওরফে গ্রীল শাওন। তার নামে ৮টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। তার নামে প্রথম মামলা হয় ২০১৬ সালে। তখন তার বয়স ছিল ১৫ বছর।

বোর্ড বাজার এলাকার মো. আক্তারুজ্জামান ছোটনের বয়স ২০ বছর। ১৬ বছর বয়সে তার অপরাধে হাতেখড়ি। তার নামে উত্তরা এলাকার বিভিন্ন থানায় ১২টি মামলা রয়েছে। সে এখন একটি কিশোর গ্যাংয়ের লিডার।