বুধবার, ১৭ Jul ২০২৪, ১০:১৩ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ:
উপহার পেতে আলটিমেটাম!

ডেক্স রিপোর্ট:বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক (ট্রেনিং ও সার্টিফিকেশন) রাশিদা সুলতানার বিরুদ্ধে অধীনস্ত কর্মচারীদের কাছ থেকে নিয়মিত উপহার নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত ৮ আগস্ট সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক ও সহকারী পরিচালক (এটিএম) সুপ্লব কুমার ঘোষ বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন।

রাশিদা সুলতানার বিরুদ্ধে সুপ্লবের অভিযোগে উপহার পেতে আলটিমেটামও দেন তিনি। সময়মতো উপহার দিতে না পারলে অপদস্থ করেন কাউকে কাউকে। চাকরি থেকে বরখাস্ত করার পাশাপাশি বদলি করারও হুমকি দেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এসব কর্মকা- করছেন। টেলিফোনে নানা কথাবার্তার রেকর্ডের পাশাপাশি হুমকি দেওয়ার অডিও রেকর্ড জমা দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগের পর এ নিয়ে বেবিচকে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কঠোর পদক্ষেপ নিতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছেন।

তবে দীর্ঘদিন ধরে হযরত শাহজালালসহ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন সেকশনে দায়িত্ব পালন করা রাশিদা সুলতানা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এদিকে বিভিন্ন সময়ে নানা বিষয়ে রাশিদা সুলতানার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছে বেবিচক। গত ১২ জুন সংস্থার সদস্য (নিরাপত্তা) আবু সালেহ মাহমুদ মান্নাফি স্বাক্ষরিত একটি তদন্ত প্রতিবেদন সংস্থাটির চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিদা বেশির ভাগ সময় অফিসে অনুপস্থিত থাকেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। অনেকের বিরুদ্ধে তিনি আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এমনকি কাওলায় তিনি বেবিচকের দুটি বাসা দখলে রেখেছেন। তাছাড়া আরও বেশ কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াসহ কম গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বদলি করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (প্রশাসন) মাহবুব আলম তালুকদার গত মঙ্গলবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাশিদা সুলতানার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক। তার অভিযোগ, রাশিদা অনৈতিক আবদার করেছেন তার কাছে। তিনি ব্যবস্থাপকসহ অন্যদের কাছেও উপহার সামগ্রী দাবি করেন। অভিযোগের বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি।’

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘রাশিদা সুলতানার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠেছে। ওইসব অভিযোগ তদন্ত করে তার সত্যতা পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেকোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রাশিদা সুলতানার বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি ট্রেনিং ও সার্টিফিকেশন সেকশনে যোগ দিয়ে কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করেন। অন্যদের দিয়ে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক ও সহকারী পরিচালক (এটিএম) সুপ্লব কুমার ঘোষকে ‘ঘায়েল করার’ চেষ্টা করছেন। তিনিসহ অন্যান্য কর্মচারীর কাছ থেকে আম, লিচুসহ মৌসুমি ফল, উৎকৃষ্টমানের চাল, মসলাসহ মূল্যবান উপঢৌকন দাবি করেন। এসব সামগ্রী পাঠাতে অপারগতা প্রকাশ করলে রাশিদা সুলতানা নানা রকম কূটকৌশলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত করার হুমকি দিয়ে আসছেন। তিনি (রাশিদা) মনে করেন বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক অনেক টাকা উপার্জন করেন। এবং সেই টাকার তিনিও একজন ‘হকদার’। চাহিদার সামান্যতম কমবেশি হলে তিনি ফোনে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। এবং অন্যত্র বদলি করার হুমকি দেন। মাঝেমধ্যে তিনি এটাও বলেন, ‘আমি চেয়ারম্যানকে বলে তোমাকে এখানে বদলি করিয়েছি। এবং চেয়ারম্যান সারের মাধ্যমে তোমাকে এখনো এখানে টিকিয়ে রেখেছি। আজ আমি মন্ত্রী মহোদয়ের বাসায় যাব। আমাকে ১০০০ চায়না-থ্রি লিচু পাঠিয়ে দাও।’

সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক সুপ্লব কুমার ঘোষ অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লিখিত অভিযোগে যা বলা হয়েছে তাই আমার বক্তব্য।’

এর আগে অভ্যন্তরীণ যে তদন্ত হয়েছে তার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘২০২০ সালের ২২ জুন থেকে রাশিদা উপপরিচালক (ট্রেনিং ও সার্টিফিকেশন) পদে কর্মরত আছেন। এখানে যোগদানের পর থেকে তার দাপ্তরিক আচার-আচরণ, কর্মকান্ড ও পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সময়ানুবর্তিতা, সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীদের সঙ্গে আচরণ, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা, পেশাগত দায়িত্ব ও দক্ষতা, দাপ্তরিক কর্মসম্পাদনের সক্ষমতা, বিচার ও মাত্রাজ্ঞান, দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা, শারীরিক ক্ষমতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবস্থান অতিমাত্রায় অসন্তোষজনক। যোগদানের পর থেকে অদ্যাবধি তিনি আচরণগত ঘাটতি, শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ করেছেন।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অফিসে অনুপস্থিত থাকলেও তিনি ছুটির আবেদন করেন না। বেশিরভাগ সময় তিনি কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকেন। বারবার তাকে সতর্ক করা হলেও তিনি শোধরাননি। তার কর্মকা-ের উন্নতি না হলে রাশিদাকে শোকজ করা হয়। কিন্তু শোকজের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। গত ১৮ মাসে তিনি যখন কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকেন তখন তিনি অফিসের কাউকে কাউকে মোবাইলে এসএমএম করে নিজেকে অসুস্থ আছেন বলে জানান। তখন কর্তৃপক্ষ ডাক্তারি সার্টিফিকেট জমা দিতে বললেও তা তিনি করেননি। রাশিদা প্রায়ই অভিযোগ করেন তাকে কেন দায়িত্ব দেওয়া হয় না। তিনি নিজের অবস্থান মূল্যায়ন না করে অন্যকে দোষারোপ করেন। তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেন। মিলন নামের তার এক নিকটাত্মীয়কে বেবিচকে চাকরি না দেওয়ায় তার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সদস্যকে (নিরাপত্তা) মেসেজ দিয়ে আজেবাজে কথা বলেন। একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে মিলনের মোবাইল নম্বর শনাক্ত করা হয়। মিলন রাশিদার নির্দেশে এসব করেছেন বলে স্বীকার করেন। মিলনের বিষয়ে রাশিদাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তার আত্মীয় বলে অস্বীকার করেন। এই নিয়ে তিনি সদস্য নিরাপত্তার সঙ্গে খারাপ ভাষায় কথা বলেন। এবং তার কেউ কিছু করতে পারবে না বলে জানিয়ে দেন।

এছাড়া এভসেক বিভাগে রাশিদা সুলতানা তার কনিষ্ঠ সহকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন। তাদের মধ্যে সহকারী পরিচালক (সিনিয়র এভসেক ইন্সপেক্টর) মোহাম্মদ আলমগীর, সিনিয়র কনসালটেন্ট গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) মোহাম্মদ আলমগীর, সহকারী পরিচালক (অ্যাডমিন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন) ইফতেকার জাহান হোসেন, সহকারী পরিচালক (ট্রেনিং) শারমিন খানম, সহকারী পরিচালক (সার্টিফিকেশন) নাসিমা আখতার, সিনিয়র কনসালটেন্ট উইং কমান্ডার (অব.) এম সাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন। তারা বিএনপি মতাদর্শের কর্মকর্তা বলে তিনি প্রকাশ্যে অভিযোগ করে আসছেন। এবং সদস্য নিরাপত্তাকে বলেন, ‘আপনি বিএনপির লোকদের নিয়ে চলেন’। তার এই মন্তব্য অত্যন্ত অপেশাদার, বাস্তবতা বিবর্জিত ও অমর্যাদাকর। তাছাড়া গাড়ির চালকদের সঙ্গেও তিনি খারাপ আচরণ করেন। ইতিমধ্যে একজন চালক তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন। যে বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন সেখানেই তিনি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেননি। শাহজালালেও তিনি ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা দেওয়া একটি সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। এমনকি প্রভাব খাটিয়ে রাশিদা কাওলায় আবাসিক এলাকায় সি-২/১ ও সি-২/৩ বাসা নিজের দখলে রেখেছেন। বারবার নোটিস দিয়ে বাসাগুলো অন্যদের দেওয়া যায়নি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে রাশিদা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৈয়দপুর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক একজন দুর্নীতিবাজ। সেখানে তিনি দোকানপাটসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। বেবিচকের একটি চক্র তাকে ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। কোনো ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত না।’

উপহার বিষয়ক অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপককে ৩শ লিচু পাঠানোর জন্য ১৫শ টাকা দিয়েছিলাম। অথচ এখন তিনি বলছেন আমি উপহার চেয়েছি। আমি কারোর কাছে কোনো উপহার সামগ্রী চাইনি। এসব প্রপাগান্ডা। আমি কারোর কাছ থেকে এককাপ চা পর্যন্ত খাই না। আর উপহার নেব! এসব হাস্যকর।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে রাশিদা সুলতানা বলেন, ‘আমি নিয়মিত অফিস করছি। কাজে কখনো ফাঁকি দিইনি। একটি গ্রুপ আমার পেছনে লেগেছে।’

 

এই ওয়েবসাইটের যে কোনো লেখা বা ছবি পুনঃপ্রকাশের ক্ষেত্রে ঋন স্বীকার বাঞ্চনীয় ।