নিউজ ডেক্স : এভিয়েশনের কর্মচারী ওসমান সিকদারকে হত্যায় তারই দুই সহকর্মী ইব্রাহিম খলিল ও বাদল মজুমদার সরাসরি জড়িত। হত্যাকান্ডের অনুসন্ধানে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। চট্টগ্রামে এ ঘটনা খুবই আলোচিত। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইব্রাহিম খলিল এবং বিমানবন্দরেই কর্মরত তার দুই ভাই ইউনুছ ও ইউছুপ মিলে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। আরেক ভাই হাসান সোনা পাচার করে ধরা খায়। তার সহযোগি ইএম-এর ইনজিন ড্রাইভার কামরুল পালিয়ে বেচে যায়।কামরূল এখন শাহজালালে , তবে কামরুল সোনা পাচারে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
হাসানকে সোনা পাচার ঘটনার পর চট্রগ্রাম বিমানবন্দরে বদলি করা হয়। ওরা ৪ ভাই এখন চট্রগ্রাম বিমানবন্দরে, আরেক ভাই ইউসুফ বেবিচকের ইএম-এর ঠিকাদার, থাকেন কাওলার এলাকায়। চট্রগ্রাম বিমানবন্দরে ইএম গোডাউন চুরির ঘটনায় বেবিচক ডেকে নিয়ে ৩ ভাইকে শাসিয়ে দেয়।
ওসমান সিকদারকে খুনের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ইব্রাহিম খলিল কারাবন্দি। ইউনুছ ও ইউছুপ ধরাছোয়ার বাইরে তারা প্রভাব বিস্তার করছে। আইনশৃংখলা বাহিনী এই ২ ভাইকে আইনের আওতায় আনতে গড়িমসি করছে বলে অভিযোগ। তাদের ভয়ে তদন্ত কমিটির কাছে মুখ খোলেনি কেউ। উল্টো তদন্ত কমিটিকে দেখে নেবেন বলে হুমকি দিয়েছে ইব্রাহিম খলিলের ভাই ইউনুছ।
ওসমান শিকদার আত্মসাৎকৃত ৯ লাখ টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়ে স্ট্যাম্পে চুক্তি করলেও তাকে বাঁচতে দেয়নি ঘাতকরা। হত্যাকান্ডের আগের দিন ওসমান সিকদারের গ্রামের বাড়িতে ১০-১৫ জন লোক নিয়ে হামলা চালিয়েছিল চোরাকারবারি রাসেল।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালকের দপ্তর থেকে উল্লিখিত তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেছে রাজধানী ঢাকার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। গত বছরের ১১ ডিসেম্বর রাত আড়াইটার দিকে শাহ আমানত বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশনের ‘চৈতালি’ নামের সরকারি কোয়ার্টারের প্রধান ফটক (জাপানি গেইট) দিয়ে গাড়ি নিয়ে ঢুকে চোরাকারবারি রাসেলসহ চারজন। ওসমানের কক্ষে ঢুকে তাকে মারধরের এক পর্যায়ে মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন করা হয়। পরে ওসমানের লাশ ফেলে দেওয়া হয় বিমানবন্দরের কাছেই লেকের ধারে।
ওই ঘটনায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর সহকারী পরিচালক (ফায়ার) আবু মো. ওমর শরীফকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করে দেন। সম্প্রতি ওই কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে এবং বেবিচকের ঢাকার সদর দপ্তর সেটি গ্রহণ করেছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ৭টি পর্যবেক্ষণ ও ১১টি সুপারিশ উল্লেখ করেছে।
ওসমান হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ইব্রাহিম খলিল ও আরিফ অতি সম্প্রতি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন বলে বাদী এমরান সিকদারের আইনজীবী নিশ্চিত করেছেন। এমরান সিকদার জানান, আসামি ইব্রাহিম খলিলকে দেওয়া হাইকোর্টের জামিন আদেশ স্থগিত করেছেন চেম্বার জজ আদালত। তবে ওই আদেশ এখনো বিচারিক আদালতে এসে পৌঁছায়নি।
মামলার তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি। এমরান সিকদার বলেন, ‘যে গাড়িতে করে এসে আমার ভাইকে হত্যা করেছে খুনিরা, হত্যার সাড়ে তিন মাস পরেও সেই গাড়িটি জব্দ করতে পারলেন না মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরের পতেঙ্গা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ফরিদুল আলম। মামলাটি পিবিআইকে দেওয়ার আবেদন করেছিলাম আদালতে। কিন্তু আবেদন গ্রহণ করা হয়নি।’
মামলার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করলে পরিদর্শক ফরিদুল আলম বলেন, ‘তদন্ত চলমান আছে। নতুন করে কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।’ অভিযোগ উঠেছে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মূল আসামি পলাতক ফটিকছড়ির রাসেলকে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও তার ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে ‘গোপন’ যোগাযোগ রাখছেন।
ওসমান সিকদারের হত্যাকান্ড নিয়ে তদন্ত কমিটি সাতটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। এগুলো হলো এক. ওসমান সিকদার হত্যাকান্ডে ইব্রাহিম খলিল সরাসরি জড়িত; বাদল মজুমদার ও তার স্ত্রীও জড়িত; দুই. ২০২৪ সালের ৭ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত জবানবন্দি দেন ইব্রাহিম খলিলের ভাই শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত মো. ইউনুছ। তিনি ইব্রাহিম খলিল ও ওসমান সিকদারের মধ্যে (হত্যাকান্ডের আগে) বিবাদ থাকার কথা স্বীকার করলেও ৮ দিন পর ১৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটির কাছে উপস্থিত হয়ে তার আগের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন; তিন. ওসমান সিকদারের বড়ভাই এমরান সিকদারের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, ওসমান টাকা পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাসেল নামের এক ব্যক্তির টাকা পাচার করাকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত হয়; চার. ওসমানের খুনে সিভিল এভিয়েশন কর্মচারী ইব্রাহিম খলিল এবং বাদল মজুমদার জড়িত বলে প্রতীয়মান হলেও পুলিশের হাতে তারা গ্রেপ্তার হওয়ায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি; পাঁচ. হত্যাকান্ড- সংঘটিত হওয়ার আগে আত্মসাৎ করা টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের মীমাংসা করেন আসামি ইব্রাহিম খলিলের ভাই সিভিল এভিয়েশনের ইলেকট্রিশিয়ান মো. ইউনুছ, ওই ঘটনা কর্তৃপক্ষকে জানাননি তিনি; ছয়. ইব্রাহিম খলিল ও মো. ইউনুছ শাহ আমানত বিমানবন্দরের একই শাখার (ই/এম) কর্মচারী। তাদের আরেক ভাই মো. ইউছুপ ই/এম শাখার প্রভাবশালী ঠিকাদার। বিমানবন্দরের ওই শাখায় তিন ভাই শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। ওসমান সিকদার হত্যা মামলায় আসামি হয়ে ইব্রাহিম খলিল কারাবন্দি থাকলেও তার দুই ভাইয়ের ভয়ে তদন্ত কমিটির কাছে মুখ খোলেননি কেউ। উপরন্তু ইব্রাহিম খলিলকে ‘ভালো’ বলে কিছু সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। তা না হলে আত্মস্বীকৃত খুনিকে ভালো বলার কারণ নেই;
সাত. ওসমান হত্যাকান্ডের আগেও ই/এম শাখার মালামাল চুরি যাওয়ার সন্দেহ ছিল ইব্রাহিম খলিলের ওপর। সাবেক কিছু পরিচালক তাকে দপ্তরে ডেকে নিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সামনে সতর্ক করেছিলেন। চুরির দায়ে তাকে মৌখিকভাবে অভিযুক্ত করায় বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন ইব্রাহিম ও তার ভাই মো. ইউনুছ।
সাত নম্বর পর্যবেক্ষণে কমিটি আরও বলেছে ৭ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটির কাছে সব প্রশ্নের উত্তর দেন ইব্রাহিমের ভাই মো. ইউনুছ। ইউনুছ জবানবন্দি দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন পরিচালক (এভসেক পলিসি অ্যান্ড সার্টিফিকেশন) ইফতেখার জাহান হোসেন। পরে ইউনুছকে লিখিত জবানবন্দি দিতে বললে তিনি সব অস্বীকার করেন এবং বিভিন্ন স্থানে বলেছেন, ‘আমাদের কেউ ক্ষতি করলে আমরাও দেখে নেব’।
এ বিষয়টি তদন্ত কমিটির কাছে দেওয়া শাহ আমানত বিমানবন্দরের নিরাপত্তা অধিক্ষক এনামুল ইসলামের জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি ১১টি সুপারিশও করে। এগুলো হলো হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত থাকায় ইব্রাহিম খলিল এবং মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থপাচারে সরাসরি জড়িত বাদল মজুমদারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; ওসমান সিকদার (খুনের শিকার), ইব্রাহিম খলিল ও বাদল মজুমদার অর্থপাচারে জড়িত ছিলেন। অর্থপাচার নিয়ে খলিল ও ওসমানের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয়টি জানার পরেও গোপন রেখে অপরাধ করেছেন মো. ইউনুছ। ওসমানকে খুনের সঠিক বিচারের স্বার্থে ইউনুছকে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে বদলি করা যেতে পারে। এছাড়া তদন্ত কমিটিকে হুমকি দেওয়ায় ইউনুছের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ; নিরাপত্তার স্বার্থে আবাসিক এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা বাড়ানো; আবাসিক এলাকার প্রবেশ পথগুলোতে আনসারের পাশাপাশি সিভিল এভিয়েশনের নিজস্ব লোকবল মোতায়েন; আবাসিক এলাকায় স্টাফদের আত্মীয়, বন্ধুবান্ধবদের প্রবেশের ক্ষেত্রে রেজিস্টারে সংশ্লিষ্টদের নাম-ঠিকানা, গাড়ি ও মোবাইল এন্ট্রি করা;
নিহত ওসমান সিকদার, ইব্রাহিম খলিল ও বাদল মজুমদার মাদকাসক্ত ছিলেন, তাই আবাসিক এলাকা থেকে মাদকাসক্তদের বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা; রাত্রিকালীন টহল টিম গঠন; বিমানবন্দরে কর্মরত থেকে যারা সিন্ডিকেট করে অপকর্ম করছে তাদের বদলির ব্যবস্থা করা এবং আবাসিক এলাকায় নিরাপত্তা পাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
