নিউজ ডেক্স : শাহজালালসহ দেশের বিমানবন্দরগুলোতে পাখি মারার কার্যকর শ্যুটারগান নেই, শ্যুটারম্যান নেই, শ্যুটারম্যান নিয়োগে পত্রিকায় বিঙপ্তি দেয়া হয়েছ। মান্দাতার আমলের এয়ারগান আর প্রশিক্ষণবিহীন ৩ জন বার্ড শ্যুটারম্যান দিয়ে জোড়াতালি চলছে দীর্ঘদিন। বিমান বাহিনীর ২ সদস্য সকাল-বিকাল পাখি শ্যুটে মহড়া দিচ্ছে। ভিভিআইপি মুভমেন্টে রানওয়ের ভিতর অস্ত্র নিয়ে ডিউটি করা বারণ থাকায় ওই মুভমেন্টে পাখিরা জেকে আসছে। যে কোন সময় ভয়াবহ প্লেন দুর্ঘটনার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে জীবনহানির আশংকাও রয়েছে। পাখি তাড়ানোর আধুনিক যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে, মেরামতের জন্য বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় এ সংক্রান্ত মিটিংয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিক রিপোর্ট আসলেও বেবিচক কর্তৃপক্ষ কম্ভুকর্ন ।
প্রস্তুতি সম্পন্ন করেই ২০ মে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আকাশে উড়াল দেয় টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট। প্রায় সাত হাজার ফুট উপরে ওঠার পর পাইলট দেখতে পান ইঞ্জিনে আগুন। রানওয়ে থেকে উপরে ওঠার মুহূর্তে একটি পাখির উড়োজাহাজের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার দৃশ্য দেখেও কিছু করার ছিল না পাইলটের। শেষ পর্যন্ত কন্ট্রোল টাওয়ারকে বিষয়টি জানালে তাকে অবতরণ করার অনুমতি দেওয়া হয়।
ফ্লাইটটি অবতরণ করলে প্রাণে বেঁচে যায় ২৯০ যাত্রী। এর আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে। পাখির সঙ্গে ধাক্কা লেগে ক্ষতি হচ্ছে উড়োজাহাজের। এত ঘটনার পরও পাখি মারার উন্নত যন্ত্র নেই কোনো বিমানবন্দরে। শাহজালাল বিমানবন্দরে পাখি তাড়ানোর জন্য বার্ড মনিটরিং সিস্টেমের আওতায় স্থাপিত কোটি টাকার বেশি মূল্যের মেশিনটি অকার্যকর। মেশিনের সঙ্গে সংযুক্ত আছে পাঁচটি ক্যামেরা। একটি ক্যামেরা অকেজো। মেশিনটি নষ্ট হয়ে আছে অযত্নের কারণে। মেরামতের জন্য এটিকে ইতালিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বটে; কিন্তু এখন পাখিদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে তা নিয়ে দুশ্চিতায় পড়েছে কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে বেবিচকের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি জরুরি বৈঠক হয়েছে।বৈঠকে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া জানান, ‘পাখিরা আকাশে উড়বেই। বাধা দিয়েও ওদের রোখা যাবে না। তবে ফ্লাইটের উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। রানওয়ে বা আশপাশে পাখি বা অন্য কিছু থাকলে দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা চেষ্টা করছি যেন দুর্ঘটনা না ঘটে। তা ছাড়া বিমানবন্দরে যেসব সমস্যা দ্রুত সেসবের সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানায়, বিমানের উড্ডয়ন ও অবতরণ কালে পাখির আঘাতে দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকে। দেশের অন্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতেও পাখি তাড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেই। দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে আছে উড়োজাহাজগুলো। বলা যায়, কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও নজরদারির অভাবে বিমান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণই। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাখির আঘাতের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশ্বের প্রতি এক হাজার ফ্লাইটে পাখির আঘাতের ঝুঁকি শূন্য দশমিক ৫, আর বাংলাদেশে ১ দশমিক ৭৩। বিমানবন্দরের আশপাশের জলাশয়ে মাছ ও পোকামাকড় এবং রানওয়ের পাশের সবুজ ঘাসে পড়ে থাকা খাবারের বর্জ্য পাখিদের আকর্ষণ করে, তাই পাখিদের উপস্থিতি বেশি। পাখি ও শেয়াল মারার অস্ত্রই নেই কোনো বিমানবন্দরে। জনবল সংকটও আছে। আতঙ্কে থাকে সরকারি-বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলো।
তারা বলেন, বিমানের উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় পাখির আঘাতের ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। ৩৭ বছরের পুরনো এয়ারগান আছে, তবে সব সচল নয়। দেশি-বিদেশি ৪০টির বেশি বিমান সংস্থা বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ৪৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বিমান চলাচল চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের পাশাপাশি বেসরকারি কয়েকটি এয়ারওয়েজ যাত্রীবাহী বিমান এবং কার্গো বিমান ও হেলিকপ্টার পরিচালনা করছে। প্রতিদিন ৪০-৫০ হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করেন।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা জানান, ‘বিমানবন্দরে নিরাপত্তার ঘাটতি আছে। এটা স্বীকার করে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার লক্ষ্যে বেবিচক চিঠি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। আগেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নতুন চিঠিতে আগ্নেয়াস্ত্রসহ নিরাপত্তা-সরঞ্জাম বাড়ানোর অনুরোধ করা হয়েছে। বিমানবন্দরে পাখি, বাদুড়, বেজি ও শেয়ালের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ চিন্তিত। কোনো বিমানবন্দরেই পাখি মারার অস্ত্র নেই। এজন্য শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অভিযোগ ওঠার পর নড়েচড়ে বসেছে বেবিচক। দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তার বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। ইডিএস, ডুয়েল ভিউ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন, আন্ডার ভেহিকল স্ক্যানিং মেশিন, এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেক্টর (ইটিডি), লিকুইড এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম, ডাবল ক্যাব পিকআপ, ইটিভি কনজুম্যাবলস ফর এক্সপ্লোসিভ ট্রান্স ডিটেক্টর মেশিন কেনার কথা বলা হয়েছে। চিঠিতে বিমানবন্দরগুলোতে পরিত্যক্ত ডোবা-নালা ও আবর্জনা থাকার কথা বলা হয়েছে; শেয়ালের বিচরণ-উপযোগী ঝোপঝাড় থাকার কথা বলা হয়েছে। পাখিদের হুটহাট চলে আসার কারণ থাকার কথাও বলা হয়েছে। যারা এয়ারগানগুলো চালাবেন তাদের প্রশিক্ষণ নেই। শাহজালালে যে-কটি অস্ত্র আছে সেগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। নতুন অস্ত্র কেনার সিদ্ধান্তও পাওয়া যায়নি। পুরনো চারটি বন্দুক দিয়ে চলছে পাখি ও শেয়াল তাড়ানোর কাজ। মাঝেমধ্যে এগুলোও ঠিকমত কাজ করে না। বিমানবন্দরগুলোতে শেয়াল ও পাখির আতঙ্কে থাকেন পাইলটরা। বিমান অবতরণ করার সময় মাঝেমধ্যেই ঝামেলায় পড়তে হয় কর্তৃপক্ষকে।’
সূত্র জানায়, সম্প্রতি বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবীর ভুঁইয়ার নেতৃত্বে পাখি তাড়ানোর বিষয়ে জরুরি সভা হয়েছে। সভায় বলা হয়েছে, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ২০২২ সালে বার্ড মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়। সিস্টেমটির পাঁচটি ক্যামেরা রয়েছে। ক্যামেরাগুলো রানওয়ের বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে। একটি ক্যামেরা পুরোপুরি নষ্ট। মেশিনটিও নষ্ট হয়ে আছে। এটির দাম কোটি টাকার উপরে। বাকি চারটি ক্যামেরার অবস্থাও ভালো নয় বলে বৈঠকে জানানো হয়। অযতেœর কারণে মেশিনটি নষ্ট হয়ে গেছে। এটি মেরামত করতে হলে ইতালিতে পাঠাতে হবে। মেশিনের সাহায্যে ক্যামেরাগুলো দিয়ে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে পাখির উপস্থিতি মনিটর করা হয়। পাখি দেখা গেলে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে বার্ড শুটারকে জানালে তারা ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু সেখানেও জনবল কম। অন্তত ২০টি শুটারগান থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র একটি। জরুরিভিত্তিতে শুটারগান কিনতে হবে বলেও বৈঠকে জানানো হয়।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক কর্মকর্তা জানান, ‘ক্যামেরা নষ্ট ও শুটারগান না থাকায় ক্ষোভ জানানো হয়। জরুরিভিত্তিতে এ সবের সমাধান করতে বলা হয়েছে। বার্ড কন্ট্রোল মনিটরিং সিস্টেমের অন্য মডিউলটি হচ্ছে বার্ড ডিটারেন্ট সিস্টেম। এতে পাঁচটি গ্যাস ক্যানন, একটি বার্ড স্কোয়ারিং সিস্টেম, দুটি লেজার ও দুটি এমপ্লিফায়ার মাইক রয়েছে। পাখি তাড়ানোর জন্য ১০ মিনিট পরপর গ্যাস ক্যানন দিয়ে শব্দ বের হয়। বার্ড স্কোয়ারিং সিস্টেমটি গাড়িতে সংযোজিত থাকে। রানওয়ের ওপর অথবা বিমানের টেকঅব বা এপ্রোচ পথে পাখির উপস্থিতি থাকলে তা এ মেশিনের মাধ্যমে তাড়ানো হয়। লেজার লাইট দিনের বেলায় কার্যকর থাকে না। এখন রাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে না লেজার লাইট।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে শাহজালালে মাত্র তিনজন বার্ড শুটার আছেন এবং বার্ড শুটিং পরিচালনার জন্য কার্যকর বন্দুক নেই। ফলে বিমানবাহিনী থেকে সকাল ও বিকেলের পালায় দুজন করে বার্ড শুটার দুটি গানসহ নিয়োজিত থাকেন। তারা শুক্রবারে সাপ্তাহিক ছুটিতে থাকেন এবং ভিভিআইপি মুভমেন্টের সময় বন্দুক জমা রাখতে হয়। সভায় দ্রুত অকার্যকর সিস্টেমটি চালু করে সকাল ও বিকেলে দুজন করে বেবিচকের চার কর্মীকে ওয়াকিটকিসহ রানওয়ের পাশে পাখি তাড়ানোর কাজে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত এক কর্মকর্তা জানান, ‘ঢাকা বিমানবন্দরের আশপাশের ৮০-৮২ শতাংশ পাখি কালো ডানার চিল। আমরা পাখি নিয়ন্ত্রণের জন্য সক্রিয় ও পরোক্ষ উভয় ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছি। সক্রিয় ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বার্ড শুটার; পরোক্ষ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে, লেজার বন্দুক ও শব্দতরঙ্গের ব্যবহার প্রভৃতি। শীতকালে পাখির আঘাতের ঝুঁকি বাড়ে। পাখির ওজন এবং বিমানের গতির কারণে সংঘর্ষের সময় যে শক্তি উৎপন্ন হয়, তা মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। যেমন, একটি এক কেজি ওজনের পাখি যদি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার গতির বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধায় তাহলে বড় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। কিছু সময় একসঙ্গে অনেক পাখি বিমানের সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। এতে বিমানের একাধিক অংশে ক্ষতি হতে পারে। বিমানের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষ ঠেকানো জরুরি।’
