জনগণ এখন বুঝতে পেরেছে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসা মানেই দেশ আবার অন্ধকারের দিকে ধাবিত হওয়া। এই সুযোগ বাংলার জনগণ আর কোনোদিনই বিএনপি জোটকে দেবে না। আর বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের উচিত নির্বাচনে জনমতকে শ্রদ্ধা করা। নির্বাচনের যে কোনো রায়কে মেনে নেয়া। মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি থেকে সরে আসা। অহেতুক নির্বাচন বর্জনের হুমকি কিংবা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সুস্থ রাজনীতির পরিচয় বহন করে না।
অপকৌশল অবলম্বনের প্রক্রিয়ায় বিএনপি যে এতই দক্ষ তা বলে শেষ করা যাবে না। বিএনপি ভালো করেই জানে যে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার উন্নয়নের সর্বক্ষেত্রে দেশ ও জাতিকে এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন যে আগামী নির্বাচনে জনগণ শেখ হাসিনার নৌকায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন এবং বিএনপিকে এক শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে হবে। প্রথম থেকেই বিএনপির নেতারা অনুমান করতে পেরে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ খুঁজে আসছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে দেশের জনগণ এখন নির্বাচনমুখী, সব কয়টি দল অংশগ্রহণ করার লক্ষ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ইতোপূর্বে সংশ্লিষ্ট হয়েছে।
বিএনপি বুঝতে পেরেছে ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন বয়কট করে কোনো লাভ হবে না। তাই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে তারা সংশ্লিষ্ট হয়েছে। এখন তাদের লক্ষ্য নির্বাচনে যখন পরাজয় অনিবার্য, তখন নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। এ জন্য এমন কোনো টালবাহানা নেই, যার আশ্রয় তারা নিচ্ছে না। প্রথমেই তাদের দাবি ছিল শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচন না করা। নির্বাচন কমিশন বাতিল করা। পুলিশ ও প্রশাসনে তাদের ইচ্ছামতো লোক বসানো। ইভিএম ভোট পদ্ধতি চালু না করা, মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়া, সংসদ বাতিল করা ইত্যাদি ইত্যাদি। আওয়ামী লীগ থেকে শুধু একটা কথা হয়েছে সংবিধানবহির্ভূত কোনো দাবি তারা মানতে রাজি নন, বাস্তবে আওয়ামী লীগের দাবি কার্যকর হয়েছে। বিএনপির ও ঐক্যফ্রন্টের দাবি মেনে না নিলেও তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে, বাছাই শেষ হয়েছে। রিটার্নিং অফিসারের কাছে মনোনয়ন জমা দিয়েছে। অনিয়ম ও অযোগ্যতার কারণে বেশ কিছু প্রার্থী নির্বাচনের মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
এরূপ যখন বাস্তবতা তখন ঐক্যফ্রন্ট প্রধান ড. কামাল হোসেনকে দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের প্রস্তাব দিয়েছে। তফসিল ঘোষণা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণের দাবি কতটা অযৌক্তিক ও বেআইনি প্রস্তাব ড. কামাল বুঝতে সক্ষম হলেন না, তাহলে কি নির্বাচনে ষড়যন্ত্রে এখনো তারা লিপ্ত। একেক সময় একেক প্রশ্ন তুলে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে বিএনপি। মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় বিএনপি দল হিসেবে এমন এক সংকটে নিপতিত হয়েছে যে, দলের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুষ্ঠু নেতৃত্বের অভাবে দলকে গুছিয়ে নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি। এখন দলের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক তারেক জিয়া লন্ডনে বসে ফেরারি হয়ে তার পছন্দমতো মনোনয়ন দিয়েছে। যা তাদের দলের অনেকের ভেতর অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে তার জন্য তারেক জিয়াই দায়ী। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি লন্ডনে বসে আগামী সংসদ নির্বাচনে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন তা বিস্ময়ের ব্যাপার। হয়তো তারই পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এরমধ্যে দেশে বেশ কিছু সহিংস ঘটনা ঘটে গেল।
এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যাতে জনজীবন অস্থির হয়ে পড়ে। নির্বাচনের জন্য যখন সমগ্র জাতি প্রস্তুত, তখন বিভিন্ন স্থানে খুনখারাবির মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কিনা কে জানে। প্রকৃত সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বেশ কিছুদিন বন্ধ আছে। অনেকেই ভাবছেন এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সফলতা।
আবার এমনটাও হতে পারে যে নির্বাচনকালীন একযোগে দেশব্যাপী প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে সন্ত্রাসী হামলার। আমাদের প্রশাসন দক্ষতার সঙ্গে সন্ত্রাস মোকাবেলা করেছে। কিন্তু নির্বাচনকে ঘিরে তারা এতই ব্যস্ত হয়ে উঠবে যে দেশব্যাপী সন্ত্রাস দমন কিছুটা শিথিল হতে পারে। সেই সুযোগে তারা তাদের সহিংসতা চালিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনকে বানচাল করার অপচেষ্টা চালাবে। এতদিন দেখলাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেন-দরবার বিএনপি নেতারাই করেছেন। এমনকি বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করা হয়েছে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বলেই দিয়েছে নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু হওয়ায় তাদের পর্যবেক্ষক পাঠানোর প্রয়োজন মনে করেন না। যুক্তরাষ্ট্রের মতামত প্রায় একই ধরনের। যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা যে হাউস অব কমন্সের বক্তব্য নয়, তা আর জানতে বাকি নেই। ভারত তো জানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দেশটি কোনো হস্তক্ষেপ করে না।
অপরদিকে দেশের মানুষ সামগ্রিকভাবে নির্বাচনমুখী। এরূপ অবস্থায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর যতই চেষ্টা করুক না কেন, সরে দাঁড়ালে কী অবস্থা হবে, তা বিএনপি নেতারা ভালো করেই জানে। ড. কামাল হোসেন আমেরিকান বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউটের (এনডিআই) সঙ্গে যে দেন-দরবার করেছেন তা বিএনপির অনুরূপ। বিদেশিরা তো এসে বিএনপিকে বিজয়ী করতে পারেন না। বিরূপ মন্তব্য হয়তো বিদেশিরা করতে পারেন। তাতে নির্বাচন কোনো বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নির্বাচন কমিশনকে যে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপপ্রয়াস চলছে, তা নির্বাচনকালীন সময়ে তা অব্যাহত থাকবে। খালেদা জিয়াসহ বিএনপি কোনো নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেননি। তারা তাদের প্রতিপক্ষ ও নির্বাচন কমিশনকেই দায়ী করেছেন। এবারেও হয়তো তাই করতে পারেন।
এবার জনগণ ভোট দেবে দেশের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। দৃশ্যমান বাস্তবায়িত উন্নয়ন দেখে। দেশে অভূতপূর্ব উন্নয়নের যে ছোঁয়া তারা পেয়েছে, তার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ নৌকায় ভোট দেবে। বিএনপি যতই অস্বীকার করুক না কেন, ড. কামাল হোসেন যত ভালোভাবে কথাবার্তায় শেখ হাসিনা সরকারের সমালোচনা করুক না কেন, মানুষ এটা বিবেচনায় নিয়ে ভোট দেবে যে শেখ হাসিনা তাদের জন্য কী করেছেন। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, সড়ক ও সেতু নির্মাণ, আইনশৃঙ্খলা প্রভৃতি এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যে শেখ হাসিনার সরকার সফলতা অর্জন করেনি। জনগণ ভালো করেই জানেন নৌকায় ভোট দিয়ে তারা বিফল হয়নি।
১৯৫৪ ও ১৯৭০-এর নির্বাচনে তা প্রমাণিত হয়েছে। নৌকায় ভোট দিলে যে দেশ একধাপ এগিয়ে যায় তা বুঝতে আর বাকি নেই। উন্নয়নের মহাসড়কে এখন বাংলাদেশ। তাই জনগণ নৌকায় ভোট না দিয়ে, শেখ হাসিনার বিজয় প্রতিহত করে দেশকে আবার বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে যাবে কেন? বরং এই উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে এবং সুখী, সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে শেখ হাসিনার সরকারকে আবারো বিজয়ী করে তাদের ভাগ্যের দ্বার আরো উন্মুক্ত করবে।
স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আর কোনোদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসুক এ দেশের গণতন্ত্রকামী সচেতন মানুষ তা চায় না। জনগণ এখন বুঝতে পেরেছে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসা মানেই দেশ আবার অন্ধকারের দিকে ধাবিত হওয়া। এই সুযোগ বাংলার জনগণ আর কোনোদিনই বিএনপি জোটকে দেবে না। আর বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের উচিত নির্বাচনে জনমতকে শ্রদ্ধা করা। নির্বাচনের যে কোনো রায়কে মেনে নেয়া। মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি থেকে সরে আসা। অহেতুক নির্বাচন বর্জনের হুমকি কিংবা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সুস্থ রাজনীতির পরিচয় বহন করে না।
ডা. এস এ মালেক : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।
