একুশে বার্তা ডেক্স : বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। এজন্য দফায় দফায় ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকেও বসেছে দলটি। কিন্তু তারা বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করে শেখ হাসিনা সরকারকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায় না। এজন্যই ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র সেক্রেটারি রাম মাধবের সঙ্গে ব্যাংককে বৈঠকে বসার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ভারত তা এড়িয়ে গেছে। ভারতের জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সঙ্গো আলাপচারিতায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেছেন। এ বিষয়ে পত্রিকাটি লিখেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গত ফেব্রুয়ারি থেকে জেলে রয়েছেন। তার ছেলে ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী তারেক রহমান লন্ডনে স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছেন। এমন অবস্থায় দলের হাল ধরেছেন ৭০ বছরের মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
জিয়া পরিবারের অনুপস্থিতিতে তিনিই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সম্প্রতি বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মুখোমুখি হন তিনি। এ সময় দেশীয় রাজনীতি ও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন মির্জা ফখরুল। নির্বাচনী প্রচারণার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো নির্বাচনী প্রচারণাই নেই। সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।’ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিএনপির নেতৃত্বদানকারী বিচক্ষণ এই নেতার প্রথম অভিযোগই ছিল সরকারি দলের দ্বারা কীভাবে পুলিশ বাহিনী ব্যবহৃত হচ্ছে তা নিয়ে। এই পরিস্থিতিকে মির্জা ফখরুল ‘ভয়াবহ অবস্থা’ আখ্যা দেন। সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় স্ত্রী ও ৩২ বছর বয়সী শিক্ষিকা মেয়েকে নিয়ে পুলিশি বাঁধার মুখে পড়েছিলেন তিনি। এ বিষয়ে ফখরুল বলেন, ‘এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে ভাবতেও পারিনি’।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে পুরাতন ঢাকায় ১৯ শতকের একটি পরিত্যক্ত কারাগারে রাখা হয়েছে। তিনি বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন। কারাগারে তার সঙ্গে একজন অ্যাটেন্ডেন্ট দেয়া হয়েছে। ১৫ দিনে একবার তাকে দলীয় নেতৃবৃন্দ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়া হয়। বোন সেলিনা ইসলাম, ভাই শামীম এস্কান্দর ও ভাবি কানিজ কারাগারে চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করার সময় তাকে কয়েক সেট নতুন কাপড় দিয়ে এসেছেন। আর মহাসচিব মির্জা ফখরুল গত ফেব্রুয়ারি থেকে মাত্র ৩ বার দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন। ফখরুল বলেন, নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার আগে আমরা তার অনুমতি নিয়েছি। সুরক্ষিত অ্যাপসের মাধ্যমে তারেক রহমানের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন তিনি। এছাড়া সম্প্রতি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে লন্ডন থেকে স্কাইপে কথা বলেছেন তারেক রহমান।
যা হোক, জিয়া পরিবারের অনুপস্থিতিতে মির্জা ফখরুলই বিএনপির প্রধান। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করি। বিএনপি একটি উদার গণতান্ত্রিক দল। আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। ১৯৯১ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর বিএনপিই বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেছিল বলেও জানান বিএনপি মহাসচিব।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের আমলে সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ভারত-বিরোধী তৎপরতাও চালানো হয়েছে। ঢাকাস্থ ভারতীয় কূটনীতিকরা মনে করেন, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিএনপি যা করেছে, তার জন্য দলটিকে আরো মাশুল দিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল বাস্তববাদী নেতা। তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছি। এজন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১২ সালে ভারত সফরেও গেছেন। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর আমরা ভেবেছিলাম, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার ভালো আলোচনাও হয়েছিল। কিন্তু এর পর আর কিছুই ঘটেনি। এতে আমরা হতাশ। এ বছরের আগস্টে আমরা বিজেপির সেক্রেটারি জেনারেল রাম মাধবের সঙ্গে ব্যাংককে বৈঠকে বসার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ভারতীয় পক্ষ তা এড়িয়ে গেছে।’
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘যখন আমাদের জামায়াতের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়, আমি বলব, দেখুন বিএনপি জামায়াত না। বিএনপি ইসলামী আইনে বিশ্বাস করে না, মৌলবাদে বিশ্বাস করে না। জামায়াতের প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই।’ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনভুক্ত না হলেও দলটির ২২ নেতা বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করছে।
এ বিষয়ে ফখরুল বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কৌশলগত। তাদের সঙ্গে জোট করার ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ৫০টি আসনে সুবিধা পাওয়া যাবে।’ তবে ঐক্যফ্রন্ট জিতলে জামায়াত তাদের সরকারের অংশ হবে কিনা এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি বিজেপি’র প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বিজেপি একটি ডানপন্থি রাজনৈতিক দল। তাদের সঙ্গে আরএসএসও রয়েছে। আমাদেরও তাদের (জামায়াত) সঙ্গে জোট করতে কোনো সমস্যা নেই।’ তবে এক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল সরাসরি কোনো তুলনা করেননি। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি বুঝি না যে, ভারত কেন গুম-নির্যাতনসহ আওয়ামী লীগ সরকারের অপকর্মগুলো উপেক্ষা করে।
এজন্য ভারতকেই দোষারোপ করছে সাধারণ মানুষ। তারা মনে করে, ভারত আওয়ামী লীগ সরকারকে সহায়তা করছে। আওয়ামী লীগ এখন ঘৃণীত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র ভারতের সমর্থনের কারণে তারা টিকে রয়েছে। ভারতই আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করছে। অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় হাই-কমিশনের সঙ্গে বাংলাদেশি পুলিশ ও আমলাদের ভালো যোগাযোগ আছে।’ সমসাময়িক পরিস্থিতির বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, তার প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষের ভোটাধিকার ও মুক্তভাবে বেঁচে থাকা নিশ্চিত করা। যেন পুলিশ কাউকে তুলে নিয়ে যেতে না পারে।
প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। ছাত্রজীবনে বামপন্থি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ছাত্র সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফখরুল বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ভারতে পাড়ি জমান। সেখানে প্রশিক্ষণ নিতে আসা বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেন। স্বাধীনতার পর তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ১৮ বছর কলেজে অর্থনীতি পড়ানোর পর তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। এখন তিনিই বিএনপির কান্ডারির ভূমিকা পালন করছেন। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ বলেন, জিয়া পরিবার ছাড়া বিএনপিকে কল্পনা করা অসম্ভব। খালেদা জিয়াকে ‘ক্যারিশম্যাটিক লিডার’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রথম কাজই হবে তাকে জেল থেকে মুক্ত করা। তখন শেখ হাসিনার পরিবারের সঙ্গে এর প্রতিশোধ নেয়া হবে কিনা জিজ্ঞাসা করা হলে ফখরুল বলেন, দেশে কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি থাকবে না।
বিএনপির এই নেতা অবসরে সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন। বিশেষ করে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের সিনেমা। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা তার বেশি পছন্দের। ‘অপুর সংসার’ তার সবচেয়ে বেশি পছন্দের সিনেমা।
