ইউএস বাংলা বিমানে নোজ হুইলে ক্রুটি : পাইলটের দক্ষতায় রক্ষা পেলেন ১৬৪ যাত্রী : ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত

একুশে বার্তা প্রতিবেদন :  হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কক্সবাজারগামী ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইটের নোজ হুইল না নামায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরী অবতরণ করেছে। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে যাত্রীরা। সিভিল এভিয়েশনের দাবি, পাইলটের অসাধারণ দক্ষতায় ৭৩৭ মডেলের বোয়িং উড়োজাহাজটি ক্র্যাশ ল্যান্ডিং থেকে বেঁচে গেছে। রক্ষা পেয়েছেন ফ্লাইটে থাকা ১১ শিশুসহ ১৬৪ যাত্রী ও সাত ক্রু। এ ঘটনায় চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সিভিল এভিয়েশন। ইউএস বাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন  জানান, দুর্ঘটনা কবলিত উড়োজাহাজটিকে বিমানবন্দরের টারমার্কে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত

নোজ হুইলটিও খুলে নিয়ে আসা হয়েছে। এতে উড়োজাহাজ ও যাত্রীর কারোরই কোন ধরনের ক্ষতি হয়নি। কেন এ নোজ হুইলটি এমন ত্রুটি দেখা দিয়েছে তা জানতে চেয়ে বুধবারই বোয়িং কোম্পানির কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে।

জানা গেছে, ইউএস-বাংলার ৭৩৭ মডেলের বোয়িং উড়োজাহাজটির সামনের নোজ হুইল নিচে না নামায় পেছনের চাকাগুলোর ওপর ভর করে শাহ আমানতে অবতরণ করে। অবতরণের সময় এর সামনের অংশে সামান্য আগুন জ্বলতে দেখা যায়। সেখানে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনেন। এমন পরিস্থিতিতেও যাত্রীরা সব অক্ষত অবস্থায় বিমান থেকে নেমে আসতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় ৫ ঘণ্টা ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ ছিল। এতে ৩টি আন্তর্জাতিক ও ৩টি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। সব উদ্ধারের পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়।

ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটিতে ১৭১ জন যাত্রী ছিল। কোন ধরনের ত্রুটি বা সমস্যা ছাড়াই কক্সবাজার পর্যন্ত যেতে সক্ষম হয় এটি। কিন্তু কক্সবাজার বিমানবন্দরের কাছাকাছি যেতেই পাইলট যখন সামনের নোজ হুইল কাজ না করায় চেষ্টা করেন-তখনই তাতে বিপত্তি ঘটে। কিছুতেই নোজ হুইল নামছিল না। এতে পাইলট বিমানটি কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণে ব্যর্থ হন। বাধ্য হয়েই তিনি কক্সবাজারের পরিবর্তে চট্টগ্রামের শাহ আমানতে নামার জন্য এগিয়ে যান। এখানে এসেও কিছু সময় আকাশে চক্কর দিতে থাকেন। তখন যাত্রীদের অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, বিমানটি ক্র্যাশ ল্যান্ডিং করবে।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের নিয়ে অবতরণকালে ফ্লাইটটি প্রচ- ঝাঁকুনি দেয়। ফ্লাইটটির সামনের চাকা দেবে গেলেও বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে সকল যাত্রী রক্ষা পায়। তবে অবতরণ শেষে উদ্ধারের পর ১০ যাত্রীকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সকল যাত্রীর মাঝে সৃষ্ট অজানা শঙ্কার অবসান ঘটেছে। ইউএস বাংলা ফ্লাইট কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, সব যাত্রী নিয়েই তাদের ফ্লাইট নিরাপদ অবতরণ ঘটেছে। যাত্রীদের সকলেই সুস্থ রয়েছেন। অপরদিকে, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে এ ঘটনার অন্যান্য সংস্থার সকল অপারেশন বন্ধ রাখা হয় চার ঘণ্টা। বিকেল সাড়ে ৪টায় রানওয়ে স্বাভাবিক হয়। সিভিল এভিয়েশন ও ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষীয় সূত্রে জানানো হয়, এ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বহরের বোয়িং-৭৩৮ জাহাজটি (ফ্লাইট নং-বিএস-১৪১) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পাইলট, ক্রুসহ ১৭১ যাত্রী নিয়ে ঢাকা শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে উড়াল দেয় কক্সবাজারের উদ্দেশে। সময় তখন দুপুর প্রায় সাড়ে ১২টা। কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণের জন্য পাইলট প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেন। কিন্তু হঠাৎ ‘ব্যাড’ একটি ইন্ডিকেশন। সোজা কথা একটি বিপদ সঙ্কেত। ফলে পাইলট দক্ষতার সঙ্গে বিমানটিকে অবতরণমুখী থেকে পুনঃআকাশমুখী করে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ফ্লাইট কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফিরে আসেন চট্টগ্রামে। দুপুর তখন ১টা ১০ মিনিট। কন্ট্রোল টাওয়ারের ক্লিয়ারেন্স পেয়ে ইউএস বাংলার ফ্লাইটটি যখন গ্রাউন্ড স্পর্শ করে তখন প্রচ- ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয়। রানওয়েতে চক্কর দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছার আগেই ফ্লাইটটির সামনের চাকা দেবে গিয়ে আটকে পড়ে। এ সময় যাত্রীদের মাঝে ব্যাপক উদ্বেগ উৎকণ্ঠা সৃষ্টির পাশাপাশি হুড়মুড় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। যাত্রীদের অনেকেই ছোটখাটো চোট পান। তবে কেউ বড় ধরনের বিপদে পড়েননি।

এ ধরনের সংবাদ পেয়ে জরুরী অবতরণের সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে থাকে শাহআমানত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ইউএস বাংলার ফ্লাইটটির জরুরী অবরতণকে কেন্দ্র করে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ফায়ার সার্ভিসসহ যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। নগরীর ইপিজেড, বন্দর, আগ্রাবাদ ফায়ার ইউনিটের ৬টি গাড়ি ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়। এরপর অবতরণ শেষে যাত্রীদের দ্রুত একে একে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। একে একে সকলেই এয়ারক্রাফট থেকে বেরিয়ে আসেন। এ ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিমান বন্দরের সিনিয়র এয়ারক্রাফট ট্রাফিক অফিসার হাসান জহির জানিয়েছেন, কক্সবাজারে অবতরণকালে একটি দুর্ঘটনার সঙ্কেত পেয়েই পাইলট এটিকে চট্টগ্রামে অবতরণের অনুমতি চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রদান করা হয়। ফলে এটি নিরাপদেই অবতরণ করতে সক্ষম হয়। যদিও এয়ারক্রাফটির সামনের চাকায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি রানওয়েতেই আটকে যায়।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম-পিআর) কামরুল ইসলাম বলেন, ফ্লাইটে ১১ শিশুসহ (ইনফ্যান্ট) ১৬৪ যাত্রী ও সাত ক্রু ছিল। তাদের সবাই নিরাপদে আছেন। ফ্লাইটটি পরিচালনা করছিলেন ক্যাপ্টেন জাকারিয়া। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করান।

ইউএস বাংলার ব্যাখ্যা ॥ কক্সবাজারগামী বিএস-১৪১ ফ্লাইটটি ‘টেকনিক্যাল’ কারণে চট্টগ্রামে অবতরণ করেছে বলে জানিয়েছে ইউএস-বাংলা। দুপুরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইউএস-বাংলা জানায়, ‘কক্সবাজার এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পূর্বমুহূর্তে পাইলট টেকনিক্যাল কারণে জরুরী অবতরণের প্রয়োজন অনুভব করেন। কিন্তু কক্সবাজার এয়ারপোর্টে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় চট্টগ্রামে হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার ফ্লাইটটি অবতরণ করে। ফ্লাইটের সব যাত্রী, কেবিন ক্রু ও পাইলট নিরাপদে এয়ারক্রাফট থেকে বের হয়ে আসেন। যাত্রী ও ক্রুসহ বিমানের কোন ক্ষয়-ক্ষতি হয়নি।

চার সদস্যের তদন্ত কমিটি : ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের দুর্ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এয়ারক্রাফট এ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন গ্রুপ অব বাংলাদেশের প্রধান ক্যাপ্টেন সালাহ্উদ্দিন এম রহমতুল্লাহর নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন বেবিচকের জনসংযোগ কর্মকর্তা রেজাউল করিম।

আমি চেষ্টা করেছি যাত্রীদের রক্ষা করতে ॥ অত্যান্ত দক্ষতা ও কৌশলে নিরাপদে ল্যান্ডিং করার পর গণমাধ্যম কর্মীদের ক্যাপ্টেন জাকারিয়া বলেছেন, এটা একটা ইমার্জেন্সি সময় ছিল। ইমার্জেন্সি পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের সবচেয়ে বেশি ট্রেইনড করানো হয়। যেভাবে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই এ্যাকশনটা নিয়েছি। প্রশিক্ষণ থাকলেও জরুরি অবস্থা মোকাবেলায় অবশ্যই পাইলটের কিছু কৌশল থাকে। আমি চেষ্টা করেছি, যতখানি নিরাপদ থাকা সম্ভব এবং কোন ধরনের ক্ষতি যাতে না হয়। সবার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই ল্যান্ডিংয়ের চেষ্টা করেছি।

জাকারিয়া বলেন, ‘ল্যান্ডিং করতে না পারলে কৌশল হচ্ছে ফুয়েল (তেল) কমাতে হবে। এ সময় ফুয়েল যত কমানো যায় ততই সেফ। ল্যান্ডিংয়ের সময় যদি আগুন লাগে, ফুয়েল না পেলে আগুনের তীব্রতা থাকবে না। এছাড়া এয়ারক্রাফট যত হালকা থাকবে ঘর্ষণও কম হবে। তাই তেল কমানোর চেষ্টা করেছিলাম।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পাইলট জাকারিয়া বলেন, আমার প্রধান দায়িত্ব ছিল, যাত্রীদের কীভাবে সুস্থ ও নিরাপদে নিচে নামানো যায়। সেটাই করেছি। মাথায় যদি অন্য কিছু আনি তাহলে এদিকে মনোযোগ দিতে পারতাম না। আমি সবসময়ই কেবিনের ভেতরের সঙ্গে ইন্টারকানেক্টেড থাকি। ভেতরের অবস্থা জেনেছি। তবে নিরাপদে ল্যান্ড করার পর যাত্রীরা যাওয়ার সময় আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তারা অনেক খুশি