একুশে বার্তা রিপোর্ট : লাখ লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে আল্লাহপাকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, মুসলিম উম্মাহর শান্তি, ঐক্য, দেশ-জাতির সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় লাখ লাখ মুসল্লির আমিন আমিন ধ্বনিতে মুখরিত আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে টঙ্গীর তুরাগতীরে ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব গতকাল শনিবার শেষ হয়েছে। আজ রবিবার বাদ ফজর দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়ে সোমবার আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমা। : জানা যায়, গতকাল শনিবার সকাল ১০টা ৪০ মিনিট থেকে ১১টা ৭ মিনিট পর্যন্ত ২৭ মিনিটের এই আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন বাংলাদেশের কাকরাইল মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মো. যোবায়ের। আজ রবিবার বাদ ফজর দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমাকে সামনে রেখে গতকাল শনিবার বিকাল ৫টার মধ্যে (৬ ঘন্টা) ইজতেমা ময়দান খালি করার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান জানান, ‘রবিবার বাদ ফজর থেকে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে। তাই দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় অংশ নিতে ইচ্ছুকরা গতকাল বিকাল থেকেই আসা শুরু করেছেন। কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রথম পর্বের অনুসারীদের ময়দান খালি করে দিতে হবে। এজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬ ঘন্টা সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিকাল ৫টার মধ্যেই ইজতেমা ময়দান খালি করতে হবে।’ র্যাব ১-এর সিও (কমান্ডিং অফিসার) লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, ইজতেমার প্রথম পর্ব খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের জন্য সুযোগ করে দিতে বিকাল ৫টার মধ্যে প্রথম পর্বের লোকজনদের ইজতেমা ময়দান খালি করতেবলা হয়েছে। জানা যায়, গতকাল শনিবার যোবায়ের-পন্থী অনুসারীদের আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে ভোর থেকে ঢাকা ও গাজীপুরের আশপাশের জেলা থেকে লাখ লাখ মুসল্লি ইজতেমায় আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। এ সময় ‘আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে মহামহিম ও দয়াময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি লাভের আশায় মুসল্লিরা আকুতি জানান। মোনাজাতে মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি বন্ধ করে সুন্নতের জিন্দেগী, ঈমান, আমল, আখলাক, ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য, সংহতি, আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য কোরআন সুন্নাহর আলোকে প্রত্যেক মুসলমানকে নীতি আদর্শ মেনে চলার সক্ষমতা দানে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয়। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ কামনায় দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লি আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করেন। মহামহিম ও দয়াময় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে আকুতি ব্যক্ত করেন। ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষে সর্বস্তরের লাখ লাখ মুসল্লি সবকিছু ভুলে দু হাত তুলে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানান। ইজতেমায় আখেরি মোনাজাতে প্রায় ২৫ লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে আবেগঘন পরিবেশে রাহমানুর রাহিম আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা, আত্মশুদ্ধি, দুনিয়ার সব বালা মুসিবত, বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শান্তি, দেশ ও বিশ্ব মানবতার কল্যাণ কামনায় দুই হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে রহমত প্রার্থনা করেন। বাদ ফজর থেকে উর্দুতে বয়ান করেন মাওলানা ওবায়েদ উল্লাহ খুরশিদ, বাংলায় তরমজা করেন মাওলানা আব্দুল মতিন। আখেরি মোনাজাতের পূর্বে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা মো. ইব্রাহিম। বাংলায় তরজমা করেন মাওলানা যোবায়ের। মোনাজাতের সময় ইজতেমা ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। জায়গা না পেয়ে হাজার হাজার মুসল্লি ময়দানের পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, কামারপাড়া সড়কসহ আশপাশের অলি-গলি, ফুটওভারব্রিজ, বাসাবাড়ি, কলকারখানা, মার্কেট ও যানবাহনের ছাদ, শহীদ আহসান উল্লাহ উড়াল সেতু, তুরাগনদে নৌকায় অবস্থান নিয়ে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। বিশ্ব ইজতেমার আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে, তুরাগতীরে একটানা চারদিনব্যাপী ৫৪তম ইজতেমায় দুটি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে শনিবার আখেরি মোনাজাতসহ প্রথম দুদিন ইজতেমা পরিচালনা করেন মাওলানা যোবায়ের অনুসারীরা। আজ থেকে দুদিন সা’দ অনুসারীরা ইজতেমা পরিচালনা করবেন। কাল সোমবার সকালে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমার আনুষ্ঠানিকতা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, আব্দুল মতিন খসরু এমপি, গাজীপুর সিটি মেয়র আলহাজ এড. মো. জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, পুলিশ কমিশনার ওয়াইএম বেলালুর রহমানসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের পদস্থ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান জানান, আখেরি মোনাজাতের পর মুসল্লিদের বাড়ি ফেরা পর্যন্ত ইজতেমা ময়দানসহ আশপাশের এলাকায় পুলিশের নিরাপত্তা অব্যাহত থাকবে। এছাড়া সাদা পোশাকে মুসল্লিদের বেশে খিত্তায় খিত্তায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, হামদর্দ, ইবনে সিনা, ইসলামিক মিশন, যমুনা ব্যাংক ফাউন্ডেশন, জহিরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, হাফেজি হুজুর সেবা সংস্থা, হোমিওপ্যাথিক ওয়েলফেয়ার, বাংলাদেশ ইউনানি-আয়ুর্বেদিক, বঙ্গবন্ধু ইউনানী-আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথিক ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পসহ বেশকিছু সংগঠন ইজতেমা ময়দানে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। : জানা গেছে, আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে গতকাল শনিবার সকালে চার দিক থেকে লাখ লাখ মুসল্লি পায়ে হেঁটেই টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমাস্থলে পৌঁছেন। সকাল ৯টার আগেই ইজতেমা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে মুসল্লিরা মাঠের আশপাশের রাস্তা, অলিগলি, বিভিন্ন ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। এছাড়া পার্শ্ববর্তী বাসাবাড়ি-কলকারখানা-অফিস- দোকানের ছাদ, যানবাহনের ছাদ ও তুরাগ নদে নৌকায় মুসল্লিরা অবস্থান নেন। যে দিকেই চোখ যায় সে দিকেই দেখা যায় শুধু টুপি-পাঞ্জাবিপরা মানুষ। সবাই অপেক্ষায় আছেন কখন শুরু হবে সেই কাক্সিক্ষত আখেরি মোনাজাত। ইজতেমাস্থলের চারপাশের ৩-৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। : মোনাজাতে যা বলা হয় : মাওলানা জোবায়ের মোনাজাতে বলেন, হে আল্লাহ আমাদের ঈমানকে আরো মজবুত করে দেন। হে আল্লাহ আমাদের আপনার বান্দা হিসেবে কবুল করে নেন। জিন্দেগিতে আমাদের যতো পাপ আছে তার সব মাফ করে দেন। সারা বিশ্বের মুসলমানদের আপনি শান্তি কবুল করে দেন। জিন্দেগি থেকে নাফরমানি দূর করে দেন। মোনাজাতে আরও বলা হয়, হে আল্লাহ তুমি তো ক্ষমাশীল, তোমার কাছেই তো আমরা ক্ষমা চাইব। দ্বীনের ওপর আমাদের চলা সহজ করে দাও। হে আল্লাহ, তুমি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আমরা যেন তোমার সন্তুষ্টিমাফিক চলতে পারি সে তওফিক দাও। দুনিয়ার সব বালা-মুসিবত থেকে আমাদের হেফাজত করো। নবীওয়ালা জিন্দেগি আমাদের নসিব করো। : মোনাজাতে অতিরিক্ত মাইকের ব্যবস্থা : বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত প্রচারের জন্য গণযোগাযোগ অধিদফতর ও গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। এর মধ্যে গণযোগাযোগ অধিদফতর ইজতেমা ময়দান থেকে আবদুল্লাহপুর ও বিমানবন্দর রোড পর্যন্ত এবং গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস ইজতেমা ময়দান থেকে চেরাগআলী, টঙ্গী রেলস্টেশন, স্টেশন রোড থেকে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু ও আশপাশের অলিগলিতে পর্যাপ্ত মাইক সংযোগ দেয়া হয়। : ইজতেমায় নারীদের অংশগ্রহণ : ইজতেমায় নারীদের অংশ নেয়ার কোনো বিধান না থাকলেও আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে বিভিন্ন বয়সী কয়েক হাজার নারী আগের দিন রাত থেকে ইজতেমা ময়দানের আশপাশে, বিভিন্ন মিলকারখানা, বাসাবাড়িতে ও বিভিন্ন দালানের ছাদে বসে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। আখেরি মোনাজাতের ফজিলত লাভের আশায় তারা মোনাজাতে শরিক হতেই ময়দানের আশপাশের এলাকায় পর্দার সঙ্গে অবস্থান নেন। : :
