বেবিচকের অডিট শাখায় শাহীনা-জাহিদ সিন্ডিকেটের অডিট আপত্তি বাণিজ্য

ডেক্স রিপোর্ট: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অডিট শাখায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে একটি সিন্ডিকেট—যার নেতৃত্বে রয়েছেন সৈয়দা শাহীনা আক্তার ও জাহিদ নামের দুই কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, এ সিন্ডিকেট অডিট আপত্তির ভয় দেখিয়ে কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করে আসছে।

সূত্র জানায়, চাহিদা অনুযায়ী অর্থ না পেলে এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন অজুহাতে আর্থিক আপত্তি তোলার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা কর্মকর্তাদের হয়রানি করে। সৈয়দা শাহীনা আক্তার সরাসরি চেয়ারম্যানের অধীনে কাজ করায় তিনি সদস্য ও পরিচালকদের কোনো নির্দেশনাকেই গুরুত্ব দেন না।

অভিযোগ রয়েছে, প্রাক্তন চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমানের আমলে এই সিন্ডিকেট সবচেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে। মফিদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে শাহীনা ও জাহিদ বেবিচকের নানাবিধ দুর্নীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।

অডিট আপত্তি বাণিজ্যের কৌশল

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন দপ্তর থেকে অনিয়মিত সুবিধা আদায়ের জন্য এই সিন্ডিকেট অডিট আপত্তির ভয় দেখায়। কেউ যদি অবৈধ সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তাকে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয়। আবার মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বড় বড় অনিয়ম ও দুর্নীতি অডিট আপত্তি ছাড়াই নিষ্পন্ন করে ফেলা হয়।

অডিট আপত্তি এড়ানোর বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

অভিযোগ অনুসারে, নিচের কয়েকটি বড় অনিয়মেও অডিট আপত্তি এড়িয়ে গেছে টাকার বিনিময়ে—
ক) কোনো টেন্ডার ছাড়াই ৪টি EDS মেশিন ক্রয়, যার মূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা।
খ) ফ্লাইট সেফটি বিভাগের কয়েকজন প্রাক্তন চেয়ারম্যানের বন্ধু ও তাদের সন্তানদের চুক্তিভিত্তিক পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রতি মাসে ৫ লক্ষাধিক টাকা বেতন প্রদান, যদিও তাদের কোনো কার্যকর দায়িত্ব ছিল না।
গ) সিভিল শাখার নানা প্রকল্পে অনিয়ম—যেমন আবাসিক এলাকার পার্ক সংস্কার, পিএন্ডডি কিউএস গেট মেরামত, ৯নং গেট নির্মাণ এবং ৩য় টার্মিনাল প্রকল্পের Variation Order–এর মাধ্যমে অতিরিক্ত বাজেট অনুমোদন।

দুদকের মামলায় আড়ালে অডিট সিন্ডিকেট

বেবিচকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চারটি মামলার অভিযোগপত্রে শাহীনা ও জাহিদ সিন্ডিকেটের নাম না থাকলেও, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন—এরা আসলে সেই দুর্নীতির মূল পৃষ্ঠপোষক। প্রাক্তন চেয়ারম্যান মফিদুর রহমানের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় থেকে তারা বড় বড় অনিয়মকে পাশ কাটিয়ে ছোটখাটো বিষয়কে বড় করে তুলে সবকিছু আড়াল করে এসেছে।

এমনকি বেবিচকের অডিট শাখা যদি প্রকৃত অর্থে আপত্তি তুলত, তাহলে ৩য় টার্মিনাল প্রকল্পে ৫০০টিরও বেশি Variation Order দেওয়া সম্ভব হতো না বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।

শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্বৈরাচার দোসর অবসরপ্রাপ্ত উপ পরিচালক রাশিদা সুলতানা মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের সরকারী চাকুরীতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারির পূর্বেই ওবায়দুল মুক্তাদিরের স্বাক্ষরিত চিঠির বরাতে সরকারী বয়স শর্ত লঙ্ঘন করে চাকুরীতে যোগদান করায় তার চাকুরী সম্পূর্ণ অবৈধ। তারপরও, প্রাক্তন চেয়ারম‍্যান মফিদুর রহমানের হস্তক্ষেপে সৈয়দা শাহিনারা এ বিষয়ে কোনো আপত্তি উত্থাপন করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমান চেয়ারম্যান যোগদানের মাত্র দুই দিন পরই তাঁর নাম ব্যবহার করে একজন বিকাশ প্রতারক বেবিচক অডিট শাখার কর্মকর্তা সৈয়দা শাহীনা আক্তারের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রশাসনিক সূত্রের প্রশ্ন—একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে যাচাই-বাছাই না করেই এমন ফোনকলকে সত্য ধরে টাকা পাঠাতে পারেন? বিষয়টি তার পেশাগত বিবেচনা, সতর্কতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা—সবকিছুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

তদুপরি, যথাযথ যাচাই ছাড়া এমন আর্থিক লেনদেনে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রবণতা দুর্নীতিমূলক মনোভাব ও অস্বচ্ছ আচরণের ইঙ্গিত বহন করে, যা একজন সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত অনভিপ্রেত।

এছাড়াও, তার বিরুদ্ধে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (ACR) স্বাক্ষর না করানোর অভিযোগ হয়েছে। আরও জানা যায় বেবিচকের দূর্নীতিকে জায়েজ করার জন‍্য বেবিচকের অর্গানোগ্রামকে অমান‍্য করে সরাসরি চেয়ারম‍্যানকে ফাইল দিয়ে আসছিল। যার ফলশ্রুতিতে বেবিচকের বিরুদ্ধে দুদকের ৪টি মামলা দয়ের করা হয়েছে।

উপসংহার

বেবিচকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অডিট সিন্ডিকেটের কার্যক্রম নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি তদন্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে, শাহীনা-জাহিদ সিন্ডিকেটকে দুদকের তদন্তের আওতায় এনে প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত না করলে বেবিচকের সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।