নিউজ ডেক্স : আশিয়ান গ্রুপের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ করার প্রলোভন দিয়ে ডেকে নিয়ে মডেল ও অভিনেত্রী ইসরাত জাহান ওরফে স্নিগ্ধা চৌধুরীকে প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রেখে হাত-পা বেঁধে মারধর, হত্যাচেষ্টা, জোরপূর্বক কাগজে স্বাক্ষর করানো এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আশিয়ান গ্রুপ ও আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় স্নিগ্ধার সঙ্গে থাকা মডেল কো-অর্ডিনেটর ইমনকেও মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় রাজধানীর খিলক্ষেত থানায় হত্যা চেষ্টার অভিযোগে মামলা করেছেন স্নিগ্ধা চৌধুরী। তবে মামলা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম।
মামলার এজাহার, ভুক্তভোগীর সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
রোববার রাতে খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন অভিনেত্রী স্নিগ্ধা। তবে মামলার পরদিন আসামি নজরুল ইসলামের জামিন হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। নজরুলের জামিনে একজন প্রতিমন্ত্রীর হাত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন মডেল স্নিগ্ধা। সোমবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। তবে ওই প্রতিমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করেননি তিনি। ভুক্তভোগী এই অভিনেত্রী বলেন, আসামিরা তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন। তার মৃত্যু হলে দায়ী থাকবে আশিয়ানের নজরুল এবং ওই প্রতিমন্ত্রী।
মামলার এজাহারে বলা হয়, গত ২৪ জুলাই বিকালে আশিয়ান গ্রুপের পক্ষে ইমন হোসেন নামে এক ব্যক্তি স্নিগ্ধা চৌধুরীকে ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’ করার প্রস্তাব দেন। ১৬ লাখ টাকার বিনিময়ে এক বছরের জন্য চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। ওই সময় স্নিগ্ধার মা উপস্থিত ছিলেন। পরে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে চূড়ান্ত বৈঠকের কথা বলে রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর ৩০০ ফুট সড়কসংলগ্ন আশিয়ান মেডিকেল কলেজের একটি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে স্নিগ্ধা বলেন, ভবনে প্রবেশের পর থেকেই তার সন্দেহ হয়। করিডোরে ফিঙ্গারপ্রিন্টভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে তিনি ইমনকে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, চেয়ারম্যান ভেতরে থাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা রাখা হয়েছে। পরে তারা একটি কক্ষে প্রবেশ করলে সেখানে নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া, তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মিয়ামি, পলাশসহ আরও কয়েকজনকে দেখতে পান। স্নিগ্ধার অভিযোগ, শুরুতে স্বাভাবিক কথাবার্তা হলেও কিছুক্ষণ পর আচমকাই পরিস্থিতি পালটে যায়। নজরুল ইসলাম তাকে ‘জেবা তাকিয়া’ নামে সম্বোধন করে বলতে থাকেন, তিনি তার কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়েছেন এবং অন্য একজনের সঙ্গে সংসার করছেন। তিনি বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তাকে অন্য একজনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু এতে অভিযুক্ত আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, একপর্যায়ে নজরুল ইসলাম শটগান বের করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। এরপর স্নিগ্ধার হাত-পা বেঁধে তাকে একটি সোফায় ফেলে কাঠের লাঠি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ৫০ থেকে ৬০টি আঘাত করা হয়। চুল ধরে টানাহেঁচড়া, গলা চেপে ধরা এবং বারবার অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। এছাড়া গরম কফি মুখে ছুড়ে মারা, কাঁচি দিয়ে মুখ বিকৃত করার হুমকি এবং জোর করে মদের সঙ্গে ওষুধ বা নেশাজাতীয় পদার্থ মিশিয়ে পান করানোর অভিযোগও করা হয়েছে।
স্নিগ্ধা দাবি করেন, নির্যাতনের সময় তাকে একটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। তিনি বলেন, বাঁচার জন্যই বাধ্য হয়ে সেখানে ভিন্ন নামে স্বাক্ষর করেছিলেন।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় নির্যাতনের পর নজরুল ইসলাম অন্য একটি কক্ষে গেলে সুযোগ বুঝে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ভবনের একতলার বারান্দা থেকে নিচে লাফ দিয়ে পালিয়ে বাসায় ফেরেন তিনি। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। চিকিৎসা শেষে রোববার রাত সোয়া ১২টার দিকে খিলক্ষেত থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন।
শুধু স্নিগ্ধাই নন, তার সঙ্গে থাকা মডেল কো-অর্ডিনেটর ইমনও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে স্নিগ্ধা বলেন, ইমনকে মারধর করা হয় এবং তার পায়ের নখ তুলে ফেলা হয়। নির্যাতনের সময় ইমন তাকে পরিস্থিতি সামাল দিতে অভিযুক্তের ভুল ধারণার সঙ্গে তালমিলিয়ে চলার পরামর্শ দেন বলেও দাবি করেন তিনি।
মামলা দায়েরের পর সোমবার সকালে রাজধানীর খিলক্ষেতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্নিগ্ধা অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থেকেই তাকে বিভিন্নভাবে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অভিযুক্ত জামিনে মুক্তি পাওয়ায় তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কায় রয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘টাকার কত ক্ষমতা? একটি মেয়েকে ডেকে নিয়ে এভাবে নির্যাতনের পরও অভিযুক্ত জামিন পেয়ে গেলেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাই। তিনি একজন মানবিক মানুষ। আমার বিশ্বাস, তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন এবং আমি ন্যায়বিচার পাব।’ বিচার না পেলে আত্মহত্যার হুমকিও দেন স্নিগ্ধা। তিনি বলেন, ‘আমাকে প্রতিনিয়ত মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যদি আমার কিছু হয় বা অপমৃত্যু হয়, তাহলে এর জন্য দায়ীদেরই দায় নিতে হবে। আমি শুধু নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার চাই।’
এ বিষয়ে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রোববার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে খিলক্ষেত থানায় মামলাটি রেকর্ড হওয়ার পর সোমবার বিকাল ৩টার দিকে অভিযুক্ত আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত তাকে ৫০ হাজার টাকা মুচলেকায় মেডিকেল প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত জামিন মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই তারিকুল ইসলাম।
অভিযোগের বিষয়ে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ সত্য নয়। স্নিগ্ধাকে অন্য একজন ভেবে নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য না করে পরে কথা বলবেন বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে মামলার তদন্তের পাশাপাশি অভিযোগে উল্লিখিত ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য সংগ্রহের কাজ চলছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
