এক পোস্টিংয়ে একযুগ , দায়িত্বভাতা প্রদান : ঘুষের ভাগ যেতো ডিডি প্রশাসনের টেবিলেও : অবশেষে কেরানি হাফিজের লাগাম টেনে ধরছে সিএএবির প্রশাসন : তদন্ত কমিটির প্রধান সেই ডিডি নাসির : তদন্তে সেইভ করার তদবির : কেরানি হাফিজের সরস উক্তি : ‘ফান্ডের ফাইল রেডি ,নথি আইছে , নথি কিন্ত আটকে যাবে, মাল লইয়া আসেন’

একুশে বার্তা  রিপোর্ট : ‘ফান্ডের নথি আইছে,  নথি  রেডি,  দেরি করলে  নথি কিন্ত আটকে যাবে  মাল লইয়া আসেন। তাড়াতাড়ি আসবেন,  না হলে নথি ’- এভাবেই সদস্য (অর্থ)-এর পিএ কেরানি হাফিজ চাকরি নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রায় একযুগ ধরে সিএএবির সদর দপ্তরে বসে বসে টেন্ডার বানিজ্যসহ ঘুষ বাণিজ্য করে বেড়াচ্ছে। তাকে পিএগিরি করার জন্য সিএএবির নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ডিডি প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দায়িত্ব ভাতাও দেয়া হচ্ছে। যা অডিট আপত্তিতে ধরা পড়ার পর তা ধামাচাপা দেয়া হয়েছে। কেরানি হাফিজের বাড়ি খুলনায় হলেও তিনি নিজেকে গোপালগনজের লোক বলে জাহির করে বেড়ান। সিএএবির সদর দপ্তরে হাফিজ সদস্য (অর্থ) এবং সদস্য (প্রশাসনের) দপ্তরে দীর্ঘ প্রায় একযুগ ধরে দিব্যি পিএগিরি করছেন আর ফাইল ঠেকিয়ে দুহাতে এতোদিনে কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছেন বলে অন্যান্য পিএরা বলে বেড়ান।

এবার ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ নেয়ার হুমকির সেই অডিও রেকর্ড সিএএবি কর্তৃপক্ষের কাছে ধরা পড়েছে। চেয়ারম্যানের নির্দেশে সেই কর্মকর্তা  ডিডি  রাডার আব্দুন নূর নাসির – যিনি ইতিপূর্বে  এডি পদে কর্মরত থাকার সময় ২৯ নিরাপত্তা রক্ষীর ব্যাপারে গোয়েন্দা রিপোর্ট পাল্টে দিয়ে ২৯ জনকেই তদন্ত থেকে বাচিয়ে দিয়েছিলেন। ওই ২৯ জন নিরাপত্তারক্ষী এখনও সিএএবিতে বহাল। আর তিনিই কেরানি হাফিজের ঘুষ-দুর্নীতির তদন্ত করছেন, তাকে বাচিয়ে দেবার তদবির শুরু হয়ে গেছে বলেও শোনা যায়। কেরানি হাফিজ ইতিমদ্যেই তদন্ত কর্মকর্তা বরাবর নিজেকে সেইভ করার জন্য লিখিত বক্তব্য পেশ করেছেন। তার স্যারও তার প্রতি নেকনজর রাখছেন।

সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) সদস্য (অর্থ’র) কেরানি মোল্লা মো. হাফিজ  ঠিকাদারদের কাছে এভাবেই হুমকিস্বরূপ বার বার  ফোন করে ঘুষ চেয়ে তা হাতিয়ে নিতেন । এবার  উচ্চমান সহকারী মোল্লা মো. হাফিজুর রহমান ধরা খেলেন। তাকে বাচানোর মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন অনেকে। কেরানি হাফিজ  শতকরা ৫ ভাগ ঘুষ হাতিয়ে নিতেন বলে ঠিকাদাররা জানান। ঘুষের টাকা না দিলে কোন ঠিকাদারি কাজের ফান্ড ছাড়করণ হতো না, ঠিকাদাররা অনেকটা বাধ্য হয়েই কেরানি  হাফিজের চাহিদামতো শতকরা ৫ ভাগ ঘুষ তুলে দিয়ে ঠিকাদারি কাজ করতো।

খোজখবর নিয়ে জানা যায়, কেরানি হাফিজের এই ঘুষ কেলেংকারি দীর্ঘদিনের। ইতিপূর্বে একজন সংখ্যালঘু সদস্য (অর্থ)’র  জগদীস বসুর দরজায় লাথি মেরে ঠিকাদাররা এই ঘুষের প্রতিবাদ করে এবং ওই সদস্য (অর্থ)কে প্রায় ৫ ঘন্টা অফিসে আটকে রাখে। এ নিয়ে সিএএবিতে তোলপাড় শুরু হয়। পরেরদিন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

একযুগেরও বেশি সময় ধরে কেরানি হাফিজ  সিএএবির সদস্য অর্থের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন।মাঝখানে ৬ মাস আগে সদস্য( প্রশাসন) সরকারের যুগ্ম সচিব হাফিজুর রহমানের ব্যক্তিগত পিএগিরি করেন। তখন কেরানি হাফিজ তাবলগি জামাতের প্রতি ঝুকে পড়েন। কারন ওই সদস্য (প্রশাসন) প্রতি সপ্তাহেই তাবলীগে যেতেন। তাদের সাথে ডিডি প্রশাসনও শরিক হতেন।

বিমানবন্দরের উন্নয়নমূলক কাজের বাজেট বা প্রশাসনিক আর্থিক অনুমোদন বা ফান্ডের নথি অনুমোদনের ফাইল  সদস্য (অথ)’র দপ্তরে জমা পড়তেই তার ( কেরানি হাফিজ)ফোন যায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের কাছে। নিরুপায় হয়ে ব্যবসায়ীরাও পূরণ করেন সেই অন্যায় আবদার।

অবশেষে মো. হাফিজুর রহমানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে যান  ঠিকাদাররা। তার সীমাহীন ঘুষবাণিজ্যের বিরুদ্ধে সিএএবি চেয়ারম্যান ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। গত ২০ আগস্ট দায়ের করা ওই অভিযোগের বিষয়ে সম্প্রতি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সিএএবি। অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ প্রসঙ্গে গত ২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক শাখা থেকে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়- সিএএবির সদস্য অর্থের ব্যক্তিগত সহকারী মো. হাফিজুর রহমানের (উচ্চমান সহকারী) বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে একটি অভিযোগপত্র পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে অভিযোগ তদন্তে উপপরিচালক (রাডার অ্যান্ড নেভ এইড) মো. আব্দুন নাসিরকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাকে বর্ণিত অভিযোগগুলো তদন্তপূর্বক সুস্পষ্ট মতামতসহ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় ওই চিঠিতে। এ প্রসঙ্গে মো. আব্দুন নাসির বলেন, ‘ঠিকাদারদের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তাদের অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

সিএএবি প্রধানের দপ্তরে দাখিল করা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়- বিমানবন্দরের উন্নয়নমূলক কাজের বাজেট বা প্রশাসনিক আর্থিক অনুমোদন বা ফান্ডের নথি অনুমোদনের জন্য সদস্য অর্থের দপ্তরে যাওয়ার আগে তার পিএর (উচ্চমান সহকারী হাফিজুর রহমান) কাছে আসে। নথি আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ফোন করে হাফিজুর রহমান বলেন- ‘ফান্ডের নথি আইছে, মাল লইয়া আসেন। তাড়াতাড়ি আসবেন, নথি কিন্তু আইটক্যা যাইবে।’ বছরের পর বছর ধরে আমাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে তিনি এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এত দিন প্রতিবাদ করিনি কারণ তিনি যদি সত্যিই ফান্ডের নথি আটকে দেন এই আশঙ্কায়।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, সরকারি চাকরির পাশাপাশি টেন্ডারবাজি করেন উচ্চমান সহকারী হাফিজুর রহমান। বিভিন্ন নামে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বা ওই প্রতিষ্ঠানের প্যাডে তিনি বিভিন্ন টেন্ডারে অংশ নেন। এমনকি তিনি যে টেন্ডারে অংশ নেন সেই কাজ থেকে আমাদের অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করেন। আর অংশগ্রহণ করলে কাজের ফান্ডের নথি আটকে দেওয়ার হুমকি দেন। তাই এ বিষয়ে এত দিন আমরা মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছিলাম না। তবে অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে সিএএবির উচ্চমান সহকারী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঠিকাদারদের অভিযোগের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে আমি লিখিত বক্তব্য পেশ করেছি। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে যা শাস্তি হয় মাথা পেতে।