একুশে বার্তা ডেক্স : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ১১৩ দিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারের একমাত্র বন্দী তিনি। ৭৩ ঊর্ধ্ব সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর রোগে-শোকে দিন কাটছে। তাঁর মুক্তির দাবিতে বিএনপি কয়েক দফায় রাজপথের সাদামাটা কর্মসূচি দিলেও এখন আর কোনো কিছুতেই নেই দলটি। সর্বশেষ গত ৩১ মে কুমিল্লার দুটি মামলায় কারাবন্দী খালেদা জিয়ার জামিনের যে আদেশ হাই কোর্ট দিয়েছিল, তাতে স্থগিতাদেশ দেয় আপিল বিভাগ। ফলে ঈদুল ফিতরের আগে তার মুক্তি মিলছে না। নেতা-কর্মীরা আদালতের ওপর ভরসা ছেড়েই দিয়েছেন। রাজপথেই খালেদা জিয়ার মুক্তির ফয়সালা দেখছেন তারা। বড় আন্দোলন ছাড়া নির্বাচনের আগে তাঁর মুক্তি মিলবে না বলেও মনে করেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।
জানা যায়, মাঠ পর্যায়ের নেতারা কঠোর কর্মসূচি চাইলেও বিএনপির নীতিনির্ধারকরা ধীরে চলো নীতিতেই এগোচ্ছেন। তাদের বক্তব্য হলো, বেগম জিয়াই কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচিতে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সময় কঠোর কর্মসূচিতে গেলে নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা হতে পারে। বিএনপির হাইকমান্ড এখন ব্যস্ত সিটি নির্বাচন, ইফতার পার্টি, অঙ্গসংগঠন গোছানো আর দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর কর্মসূচি নিয়ে। কিন্তু দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে। তিনি নানা রোগে আক্রান্ত। এ নিয়ে সেই অর্থে ঢাকার নেতাদের তেমন মাথাব্যথা নেই। অবশ্য লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন। খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনকে কীভাবে ত্বরান্বিত করা যায়, তা নিয়েও নেতাদের মতামত নিচ্ছেন। বিএনপির মধ্যম সারির এক নেতা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দল এখন ব্যস্ত ঢাকা মহানগরের থানা ও ওয়ার্ড কমিটি নিয়ে। অসম্পূর্ণ মহানগর কমিটিও ঈদের আগেই দিতে চায়। এ ছাড়া অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর জেলা কমিটি নিয়েও দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। ঈদের আগেই অসম্পূর্ণ এসব কমিটির কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একাদশ জাতীয় নির্বাচন আর বেগম জিয়ার মুক্তি দাবিকে ঘিরেই সারা দেশে সংগঠনগুলোর কমিটির কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আরেক নেতা অবশ্য এ-ও বলেন, ঈদের আগে এসব কমিটিকে ঘিরে ‘কমিটি বাণিজ্য’ও হবে প্রভাবশালী একটি শ্রেণির। তাদের জন্য ঈদের আগে কমিটি গঠন করা একটি আশীর্বাদ।
দলীয় সূত্র জানায়, গত ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম জিয়া জেলে যাওয়ার পর থেকে কয়েক দফায় সাদামাটা কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। এর মধ্যে ছিল— সভা, সমাবেশ, দোয়া মাহফিল, মানববন্ধন, অবস্থান, লিফলেট বিতরণ, স্মারকলিপি প্রদান ও গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। তবে জনসভার জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে তিন দফা ব্যর্থ হওয়ার পর আর কোনো কর্মসূচি দেয়নি দলটি। দলের কোনো কোনো নেতা বলছেন, সরকারের নির্বাচনকেন্দ্রিক মেরুকরণই আন্দোলনের নতুন মাত্রা তৈরি করবে। আর তারা ওই পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছেন। সম্প্রতি দলের স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা কাউন্সিল, যুগ্ম মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের বৈঠকে কেউ কেউ শক্ত আন্দোলনের পরামর্শ দেন। হরতাল-অবরোধসহ সহিংস কর্মসূচি ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে না বলেও ওইসব নেতা অভিমত দেন। তবে বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের বড় একটি অংশই শান্তিপূর্ণ ধারায় আরও কিছু দিন কর্মসূচির কথা বলেন। কিন্তু এরপর থেকে নতুন করে আর কর্মসূচি দেওয়া হয়নি। রমজানে কোনো কর্মসূচি নেই। আন্দোলনের বদলে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নিয়ে খোদ দলেরই একাংশে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটাতে না পারলে আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়াকে জীবিত মুক্তি দেবে না। জেলগেটে তার লাশ ফেরত নিতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আগে আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারপর নির্বাচনের চিন্তা করতে হবে। জনগণের কাছে ম্যাসেজ যাচ্ছে বিএনপির কাছে নির্বাচনটা বড়, খালেদার মুক্তি নয়। তাহলে সরকার কেন তাকে মুক্তি দেবে।’
গণস্বাক্ষর কর্মসূচিও ভেস্তে গেছে : বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি নেয় বিএনপি। কর্মসূচি উদ্বোধনকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, চেয়ারপারসনের মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলবে। সপ্তাহখানেক এ কর্মসূচি ভালোই চলছিল। প্রথমে সিদ্ধান্ত হয় জেলা প্রশাসককে স্বাক্ষর সংবলিত স্মারকলিপি দেওয়া হবে। কেন্দ্রে একটি ডাটাভেজও তৈরি করে রাখবে। কিছু এলাকায় জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দেওয়াও হয়। একপর্যায়ে তা থমকে যায়। এখন কেন্দ্রও এ নিয়ে খোঁজখবর রাখছে না। জেলা বিএনপিরও আর কোনো গরজ নেই।
তৃণমূল নেতারা যা বলেন : সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য এবং ইউপি চেয়ারম্যান ফুল মিয়া বলেন, আমরা তো ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যেতে পারি না। আর কেন্দ্র থেকে এখন ম্যাডামের মুক্তির আন্দোলনের কথাই বলা হচ্ছে। যখনই আন্দোলনের বার্তা আসবে, আমরা তা কার্যকর করব। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থানা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বলেন, বেগম জিয়া শুধু তিনবারের প্রধানমন্ত্রীই নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী। সুতরাং তার মুক্তি দাবিতে কেন্দ্রের যে কোনো শক্ত কর্মসূচিই আমরা পালন করব। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য প্রকৌশলী মেজবাহ উদ্দিন রাজু বলেন, কঠোর আন্দোলন ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি মিলবে না। আর আদালতের ওপর বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। কারণ, এটা সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। সুতরাং, রাজপথই এখন আমাদের ঠিকানা হওয়া উচিত। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইয়াজ্জেম হোসেন রোমানও মনে করেন, সরকারকে গণতান্ত্রিক রাজপথের কর্মসূচি দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না। বেগম জিয়াকে মুক্ত করতে রাজপথে দুর্বার আন্দোলনের বিকল্প নেই।বিডি প্রতিদিন
Share this:
- Click to share on Facebook (Opens in new window)
- Click to share on Twitter (Opens in new window)
- Click to share on LinkedIn (Opens in new window)
- Click to share on Tumblr (Opens in new window)
- Click to share on Pinterest (Opens in new window)
- Click to share on Pocket (Opens in new window)
- Click to share on Reddit (Opens in new window)
- Click to share on Telegram (Opens in new window)
- Click to share on WhatsApp (Opens in new window)
- Click to print (Opens in new window)
