নিউজ ডেক্স : অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধনের কঠিন বাস্তবতায় যখন রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার, ঠিক তখন পবিত্র হজ উপলক্ষে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি বিশাল বহর সৌদিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংস্থাটির প্রশাসন ও মানবসম্পদ দপ্তরের জারি করা অফিস আদেশে ৪০ জনের চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে। তাদের পেছনে বেতনের বাইরে প্রতিদিন জনপ্রতি ২৬৩ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতিদিন ৩২ হাজার টাকা) ব্যয় হবে। সব খরচ মিলিয়ে অন্তত ৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, প্রায় ৫০ দিন সৌদি আরবে অবস্থান, ওভারসিজ কন্ট্রাক্ট সার্ভিস সুবিধা, দৈনিক ভাতা, আবাসন, পরিবহন ও অন্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মিলিয়ে ৪০ জনের পেছনে মোট খরচ দাঁড়াতে পারে ৮ কোটি টাকা। তারা হজযাত্রীদের সেবায় সৌদিতে যাবেন বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষে বলা হচ্ছে। গত বছর এমন কোনো বহর ছাড়াই হজ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর এবার এই বিশাল খরচের আয়োজন কতটা বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয়- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, প্রি ও পোস্ট-হজ অপারেশন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়োগ পেয়েছেন। বিপণন ও বিক্রয় বিভাগের থেকেই সর্বোচ্চ সংখ্যক জনবল নেওয়া হয়েছে। হজ-পরবর্তী পর্যায়ে এ বিভাগ থেকে মোট ১৩ জন দায়িত্ব পালন করবেন। ডেপুটি ম্যানেজার (কমার্শিয়াল) পদে রয়েছেন তামান্না আলী তাবাসসুম, মো. ফয়সল কবির, মো. বাদশাহ ফাহাদ, মো. আব্দুল্লাহ, মো. মহিদুল ইসলাম শান্ত এবং মো. মাহফুজ আলী। কমার্শিয়াল সুপারভাইজার হিসেবে রয়েছেন মো. আল আমিন মিয়া, মো. তামিজ উদ্দিন সরকার, রেজাউর রহমান, মো. রিপন আলী, ফারহানা হুসাইন, শাহিনুর ইসলাম এবং মো. মাহসিন। গ্রাহকসেবা বিভাগে মোট ১৪ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাক-হজে দায়িত্ব পালন করবেন মোহিউদ্দিন আহমেদ এবং জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার মো. ইউসুফ ইকরাম।
হজ-পরবর্তী পর্যায়ে দায়িত্বে থাকবেন গ্রাহকসেবা পরিচালক বদরুল হাসান লিটন, সাজেদা বেগম, সহকারী ব্যবস্থাপক জিএস সায়িদা আয়েশা সুলতানা, মো. শামসুদ্দিন আহমেদ বারি, মো. হুমায়ুন কবির, মো. আবদুস সালাম, মো. শফিকুল ইসলাম খান, এএম আশরাফুল আলম চৌধুরী, মো. সাইদুর রহমান এবং আলিকুজ্জামান ভুঁইয়া। তারা সবাই জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার। এ ছাড়া গ্রাউন্ড সার্ভিস সুপারভাইজার মো. সান্তু হাওলাদার ও সিনিয়র সহকারী অপারেশন মোহাম্মদ শামসুল হুদা।
ফ্লাইট অপারেশন বিভাগে প্রাক-হজ ও হজ-পরবর্তী মিলিয়ে ৬ জন এবং অতিরিক্ত ৫ জন দায়িত্ব পালন করবেন। প্রাক-হজে রয়েছেন জুনিয়র অপারেশন অফিসার মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন খান। প্রাক-হজ তালিকায় আছেন মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ, মো. হেলাল উদ্দিন এবং মো. জাকিউল আলম। হজ-পরবর্তী দায়িত্বে থাকবেন ডেপুটি ম্যানেজার অপারেশনস জান্নাতুল ফেরদৌস এবং জুনিয়র অপারেশন অফিসার কানিজ ফাতেমা, মো. জয়নাল আবেদীন এবং দেবাশিষ কুমার কুণ্ডু।
পরিকল্পনা ও সময়সূচি বিভাগ থেকেও কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাক-হজে দায়িত্বে থাকবেন উপ-ব্যবস্থাপক মো. সারওয়ার্দী বিশ্বাস। হজ-পরবর্তী পর্যায়ে থাকবেন উপ-ব্যবস্থাপক মো. শরিফুল ইসলাম এবং আবিদুল মুহাইমিন। অর্থায়ন বিভাগ থেকে হজ-পরবর্তী দায়িত্বে থাকবেন জুনিয়র অফিসার অ্যাকাউন্টস মো. গোলাম মোস্তফা, আইটি বিভাগ থেকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন সিস্টেম বিশ্লেষক (প্রোগ্রামার) মো. শাহীর রহমান।
গত বছরের তুলনায় এবার হজযাত্রীর সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার কম। গত বছর ছিল ৬৫ হাজার। এবার বাংলাদেশ বিমান পরিবহন করবে ৩৯ হাজার ৬৫০ জন হজযাত্রী। বাংলাদেশ থেকে এবার হজ করতে যাচ্ছেন ৮১ হাজার। বাকি যাত্রী পরিবহন করবে সৌদি এয়ারলাইনস ও ফ্লাইনাস। তুলনামূলক এ বছর কম সংখ্যক মানুষ হজে যাচ্ছেন। গত বছর হজ ডিউটিতে বিমানের পক্ষে একজনও সৌদি আরবে পাঠানো হয়নি। এবার বিমান কর্তৃপক্ষ ১২৮টি ফ্লাইটে হজযাত্রীদের পরিবহন করবেন। প্রথম হজ ফ্লাইট যাত্রা করবে ১৮ এপ্রিল। এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের জিএম বোশরা ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, হজযাত্রীদের সেবা করার জন্য ৪০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সম্মানিত হাজিরা যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন। সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক সমাধান করবেন তারা। গত বছর একজনও নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, গত বছর না পাঠানোর কারণে অনেক সমস্যা হয়। সমস্যা সমাধানে হিমশিম খেয়েছি। এবার সে কারণেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, মনোনীত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রি বা পোস্ট-হজ ফ্লাইট শুরুর চার দিন আগে জেদ্দায় যাবেন এবং অপারেশন শেষে দেশে ফিরবেন। বাস্তবে প্রি-ডিপ্লয়মেন্ট, ফ্লাইট শিডিউল, ডিউটি রোটেশন এবং ফেরত বিলম্বের সুযোগ বিবেচনায় তাদের মোট অবস্থানকাল প্রায় ৫০ দিনে গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
হজ-২০২৬ কার্যক্রমের সার্বিক তদারকি করবেন জেদ্দায় নিযুক্ত রিজিওনাল ম্যানেজার, যিনি প্রয়োজন অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেবেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানদের নিজ নিজ জনবলের হজ ভিসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এত বড় জনবল, বিদেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং সম্ভাব্য বিপুল ব্যয় নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে সংস্থার ভেতরে ও বাইরে। সংশ্লিষ্টদের একাংশ বলছেন, অপারেশনাল প্রয়োজনের সঙ্গে এই জনবল কাঠামোর সামঞ্জস্য আছে কিনা তা যাচাই জরুরি। বিশেষ করে গত বছর এমন কোনো বড় বহর ছাড়াই হজ অপারেশন সম্পন্ন হওয়ায় এবারের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
