ডেক্স রিপোর্ট : সারাদেশে টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে নাকাল জনজীবন। বুধবার দিনভর বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলজট ও যানজটে চরমভাবে ব্যাহত হয় রাজধানীবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগে পড়ে অফিস ও স্কুলগামীরা। বুধবার বজ্রপাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মাদারীপুর ও দাউদকান্দিতে একজন করে এবং ঝড়ের কবলে পড়ে সিরাজগঞ্জে একজনের মৃত্যু হয়েছে। পশ্চিমা লঘুচাপ ও কালবৈশাখীর প্রভাবে রাজধানীসহ সারাদেশে বৃষ্টি হচ্ছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। ঝড়ো হাওয়ার কারণে সমুদ্র বন্দরসমূহকে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবারও আবহাওয়ার এমন অবস্থা বিরাজ করবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
গত তিন দিন ধরে রাজধানীতে প্রতিদিন সকালে বৃষ্টি হচ্ছে। বুধবারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সকাল সোয়া আটটার দিকে শুরু হয় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। কিছুক্ষণ পরই ঝরতে থাকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি। দুর্ভোগে পড়ে অফিস ও স্কুলগামীরা। বুধবার দিনভর রাজধানীর আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। থেমে থেমে বিদ্যুত চমকাতে থাকে। ঝরে টিপটিপ বৃষ্টি। মাঝে মধ্যে উঁকি দেয় সূর্যের রশ্মি। কিন্তু কোন উত্তাপ ছড়াতে পারেনি। বুধবার বিকেলে শুরু হয় আরেক দফা বৃষ্টি। এতে রাজধানীর রাস্তাঘাট ও অলিগলি আরও কর্দমাক্ত পড়ে। কোথাও কোথাও জমে যায় বৃষ্টির পানি। পথচারীদের পড়তে হয় দুর্ভোগে। শীতের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। তবে ধুলাবালির যন্ত্রণা থেকে রেহাই পায় নগরবাসী। দেশের কোথাও কোথাও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে শিলা ও বজ্রসহ বৃষ্টি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে কালবৈশাখী বয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বৃষ্টি হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার কারণে দেশের উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে হবে। ঝড়ো হাওয়ার কারণে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নৌযানগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সাবধানে চলাচল করতে হবে।
আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, মার্চ মাসে সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। ওই মাসে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ২ থেকে ৩ দিন তীব্র কালবৈশাখী অথবা বজ্র-ঝড় এবং দেশের অন্যত্র ১ থেকে ২ দিন মাঝারি কালবৈশাখী অথবা বজ্র-ঝড় হতে পারে। মার্চের দিনের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ৩৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে। মার্চের দ্বিতীয়ার্ধে সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিক অপেক্ষা অধিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। ওই মাসে বঙ্গোপসাগরে ১ থেকে ২টি নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এপ্রিলে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে ৩ থেকে ৪দিন মাঝারি থেকে তীব্র কালবৈশাখী অথবা বজ্র-ঝড় ও দেশের অন্যত্র ২ থেকে ৩দিন হালকা থেকে মাঝারি কালবৈশাখী অথবা বজ্রঝড় হতে পারে। ওই মাসে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ২ থেকে ৩টি মৃদু তাপপ্রবাহ এবং এর মধ্যে একটি তীব্র তাপপ্রবাহে রূপান্তরিত হতে পারে।
স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস থেকে জানান, পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে সৃষ্ট মেঘমালায় তিনদিন ধরে বিরাজ করছে গুমোট আবহাওয়া। থেমে থেমে চলছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। শীত ঋতু বিদায়ের পরও বজায় রয়েছে শীতের আমেজ। আজ বৃহস্পতিবারও এমন অবস্থা বিরাজিত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। চট্টগ্রামসহ দেশের সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, সাগরে এ সময়ে কোন ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি নেই। তবে পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাব বাংলাদেশ পর্যন্ত বিরাজিত থাকায় চট্টগ্রাম, মংলা, কক্সবাজার ও পায়রা সমুদ্র বন্দরকে ৩ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। মাছ ধরার নৌকা ও ছোট নৌযানগুলোর ওপর উপকূলের কাছাকাছি থেকে নিরাপদে চলাচলের নির্দেশনা রয়েছে। লঘুচাপের কারণে মেঘমালা তৈরি হয়েছে, যা বজ্রবৃষ্টি ঘটাতে পারে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বুধবারও হাল্কা বৃষ্টিপাত হয়েছে, সঙ্গে ছিল দমকা হাওয়া ও বজ্রপাত। বাতাসে জলীয়বাষ্প বেড়েছে। সূর্যের দেখা না মেলায় কমেছে তাপমাত্রা।
এদিকে, আবহাওয়া বিরূপ হওয়ায় অভ্যন্তরীণ জলপথে ছোট ছোট নৌযান চলাচল বিঘিœত হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেনার হ্যান্ডলিং স্বাভাবিক থাকলেও বহির্নোঙ্গরে পণ্য লাইটারিং করতে হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।
চট্টগ্রাম বন্দর লাইটারেজ ঠিকাদার সমিতির সভাপতি হাজী শফিক আহমেদ জানান, সাগরে বাতাসের তীব্রতা এবং ঢেউ অত্যধিক। সে কারণে লাইটার জাহাজগুলোকে মাদার ভেসেলের কাছাকাছি রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বহির্নোঙ্গরে পণ্য লাইটারিং কাজ চললেও দুর্ঘটনার আশঙ্কায় সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করছে নৌযানগুলো।
নিজস্ব সংবাদদাতা,নড়াইল থেকে জানান, নড়াইলে টানা তিন দিনের বৃষ্টি ও শিলা বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কালিয়া উপজেলার অরুনিমা রিসোর্ট গলফ্ ক্লাবের কয়েক হাজার দেশী বক এবং অতিথি পাখি মারা গেছে। সোমবার থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত থেমে থেমে জেলার ওপর দিয়ে বৃষ্টি প্রবাহিত হয়। এছাড়া জেলার সীমান্তবর্তী বিছালি, খড়রিয়া, পাঁচগ্রামসহ ৮টি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে শিলা বৃষ্টি ও ঝড় বয়ে যায়। ঝড়ে কয়েক’শ গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে। এতে নড়াইল শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক সংযোগ বিছিন্ন হয়ে যায়।
জেলা কৃষি অধিদফতরের উপপরিচালক চিন্ময় রায় জানান, তিন দিনের টানা বৃষ্টি ও শিলা বৃষ্টিতে খেসারি, মসুরি, গম, পেঁয়াজ, তরমুজসহ বিভিন্ন শাক-সবজির মোটামুটি ক্ষতি হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার নীলফামারী থেকে জানান, ফাগুনের হাওয়ায় উত্তরের নীলফামারীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বুধবার সকাল হতে থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি থেকে বজ্রসহ ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টিতে জনজীবনে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। এতে শীত মৌসুমের বিদায় লগ্নে এমন বৃষ্টি নতুনভাবে শীত নামিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি খেটে খাওয়া মানুষ পড়ে বেকায়দায়।
স্টাফ রিপোর্টার চাঁপাইনবাবগঞ্জে থেকে জানান, আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে বুধবার ভোর থেকে শুরু হয়েছে থেমে থেমে বৃষ্টি। এর আগে গত দু’দিন রাতেও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ এখন আমের গাছে মুকুলে মুকুলে ছেয়ে গেছে। ভারি বৃষ্টিতে আমের মুকুল নষ্ট হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে আমচাষীরা ।
স্টাফ রিপোর্টার ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বজ্রপাতে মঞ্জুর আলী (৩৫) নামে ইটভাঁটির এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। বুধবার সকালে নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। তিনি নাছিরনগর উপজেলার সোলাকান্দি গ্রামের গোলাপ রহমানের ছেলে। জানা যায়, সকালে মঞ্জুর আলী নৌকায় করে মাটি উত্তোলন করার সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে সে গুরুতর আহত হয়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও সরাইলে ১০/১৫ টি আধাপাকা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এ সময় গাছপালাসহ ফসলেরও ক্ষতি হয়। বুধবার বিকেলে বয়ে যাওয়া ঝড়ের কারণে আশুগঞ্জ বিদ্যুত কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের উৎপাদন বেশ কিছুক্ষণ বন্ধ ছিল।
নিজস্ব সংবাদদাতা মাদারীপুর থেকে জানান, বুধবার সকালে রাজৈর উপজেলার ইশিবপুর ইউনিয়নের নগরগোয়ালদি গ্রামে পুকুরে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে গফুর মাতুব্বর (৬০) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। গফুর একই এলাকার মৃত হেলাল মাতুব্বরের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গফুর মাতুব্বরসহ কয়েক ব্যক্তি সকালে নগরগোয়ালদি এলাকায় স্থানীয় একটি পুুকুরে মাছ ধরতে নামে। পুকুরের মধ্যে হঠাৎ বজ্রপাত হলে গফুর গুরুতর আহত হয়। এ সময় স্থানীয়রা তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রাজৈর উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিজস্ব সংবাদদাতা দাউদকান্দি থেকে জানান, মেঘনা উপজেলার মানিকারচরে কুঁচে (কুইচা) মাছ শিকার করতে গিয়ে ১ জন নিহত ও আহত হয়েছেন ১ জন। বুধবার দুপুরে মেঘনা উপজেলার মানিকারচর গ্রামে বজ্রপাতে এই হতাহতের ঘটনাটি ঘটে। নিহত ব্যক্তি হলেন হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার মৃত জীবন সরকারের ছেলে রঙ্গলাল। আহত হলেন একই এলাকার প্রবিন্দের ছেলে পবিত্র। তারা সম্পর্কে ভায়রা ভাই বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, রঙ্গলাল ও পবিত্র তারা মঙ্গলবার কুঁচে শিকারের উদ্দেশে এ এলাকায় আসেন। বুধবার দুপুরে মানিকারচর মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনের পুকুরে কুঁচে শিকার করাকালে বৃষ্টিসহ বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এ সময় বজ্রপাতে রঙ্গ লালের বুক ঝলসে যায়। আহত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আর তার ভায়রা ভাই পবিত্র আহত হয়। মরদেহ উদ্ধার করে মেঘনা থানা পুলিশ এবং আহত ব্যক্তিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দিয়েছে পুলিশ।
স্টাফ রিপোর্টার সিরাজগঞ্জ থেকে জানায়, বুধবার দুপুরে সিরাজগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙ্গে সুফিয়া খাতুন (৫২) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা সীমানায় বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম ইকোপার্ক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত সুফিয়া খাতুন সয়দাবাদ ইউনিয়নের সারটিয়া এলাকার আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী। এদিকে ঝড়ের সঙ্গে শিলা বৃষ্টিও হয়েছে। ঝড়ে বেশ কিছু গাছপালা উপড়ে পড়েছে। প্রায় চার ঘণ্টা বিদ্যুত সঞ্চালন বন্ধ ছিল।
বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ শহীদ আলম জানান, ইকোপার্কে ঝড়ের সময় গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে এক নারীর মৃত্যুর খবর পেয়েছি। নিহতের স্বজনরা ওই নারীর মৃতদেহ নিয়ে গেছে।জনকন্ঠ
