নার্স তানিয়া হত্যা : ড্রাইভা নূরুর জবানিতে নৃশংসতার লোমহর্ষক বর্ণনা : ডিআইজির ঘটনাস্থল পরিদর্শন

ডেক্স রিপোর্ট : গণধর্ষণের পর কটিয়াদীর মেয়ে ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে হত্যা করা হয়। তানিয়ার শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি আঘাতের চিহ্ন  রয়েছে। এর মধ্যে মাথার পিছনের আঘাত ছিল সবচেয়ে গুরুতর। ভারি কিছু দিয়ে আঘাতের ফলে তার মাথার পিছনের খুলি ফেটে যায়। মাথার খুলি দুই ভাগ হয়ে যাওয়া ছাড়াও মাথার পেছনের দিকে দু’টি হাড় ভেঙে যায়। গণধর্ষণ শেষে এই আঘাতের কারণেই তানিয়ার মৃত্যু হয়েছে। তানিয়ার ময়নাতদন্ত রিপোর্টের বরাত দিয়ে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমান এসব তথ্য জানান।

ময়নাতদন্ত রিপোর্ট গতকাল রোববার পুলিশের কাছে জমা দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ, বিপিএম (বার) জানান, এখনো ময়নাতদন্ত রিপোর্ট তারা হাতে পাননি। তবে আশা করছেন শীঘ্রই সেটি তারা পেয়ে যাবেন। এদিকে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। শনিবার বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল-মামুন বাসচালক নূরুজ্জামান নূরুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে রাত ৮টার দিকে বাসচালক নূরুকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে বাসচালক নূরুজ্জামান নূরুর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছে, সে নিজেসহ তিনজনে মিলে পালাক্রমে তানিয়াকে ধর্ষণ করে। অন্য দুই ধর্ষক হলো, বাসের হেলপার লালন মিয়া এবং নূরুর খালাতো ভাই ও বাসটির অপর হেলপার বোরহান। তাদের মধ্যে লালন মিয়া গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে থাকলেও বোরহান এখনও পলাতক রয়েছে। বোরহানের বাড়িও গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায়। তাকে ধরতে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। এদিকে চলন্তবাসে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে গণধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় গতকাল রোববার সরজমিনে ঘটনাস্থল বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড় গজারিয়া এলাকা পরিদর্শন করেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বিপিএম-পিপিএম। এ সময় ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপস এন্ড ইন্টেলিজেন্ট) মো. আসাদুজ্জামান বিপিএম (বার), পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরাফাতুল ইসলাম, ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার রেজুয়ান দিপু ডিআইজির সঙ্গে ছিলেন। তারা ঘটনাস্থল বিলপাড় গজারিয়ায় প্রত্যক্ষদর্শী ভ্যানচালক জাকির হোসেন (১৯), চাল ব্যবসায়ী মোশারফ, মামলার বাদী নিহত তানিয়ার পিতা গিয়াস উদ্দিন এবং পিরিজপুর বাজারের সততা ফার্মেসির মালিক হাবিবুর রহমান ও হাওয়া ফার্মেসির মালিক খায়রুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ভ্যানচালক জাকির হোসেন জানান, সোমবার রাত ৮টার দিকে চালের বস্তা নিয়ে তিনি কটিয়াদী থেকে গজারিয়া বাজারে যাচ্ছিলেন। ভৈরব-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের বিলপাড় গজারিয়া এলাকায় স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাস রাস্তায় দাঁড়ানো অবস্থায় তিনি দেখতে পান।

এ সময় তিনি বাসের দরজার পাশে রাস্তার উপর আড়াআড়ি একটি মহিলাকে মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। ভ্যানচালক জাকির হোসেন বাসের চালক ও সহযোগীকে জিজ্ঞাসা করলে তারা জানায়, মেয়েটি গাড়ি থেকে লাফ দিয়েছে। ভ্যানচালক তাদেরকে মেয়েটির চিকিৎসার জন্য বললে তারা মেয়েটিকে আবার বাসে উঠিয়ে পিরিজপুরের দিকে নিয়ে চলে যায়।

ডিআইজিসহ পুলিশের কর্মকর্তাগণ পিরিজপুর বাজারের হাবিবুর রহমানের সততা ফার্মেসি ওষুধের দোকান পরিদর্শন করেন। হাবিবুর রহমান জিজ্ঞাসাবাদে বলেন, রাতে স্বর্ণলতা বাসের চালকসহ তিনজন ব্যক্তি অসুস্থ একটি মেয়েকে আমার দোকানে নিয়ে আসে। তার অবস্থা আশংকাজনক দেখে আমি তাদেরকে পার্শ্ববর্তী বাজিতপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেই। বাসের চালক ও তার সহকারীরা অটোরিকশা খোঁজাখুঁজি করলেও কোন ড্রাইভার মেয়েটিকে চিনতে না পারায় তারা হাসপাতালে নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অগত্যা তারা মেয়েটিকে পুনরায় তাদের বাসে তুলে কটিয়াদীর দিকে চলে যায়। হাবিবুর রহমান আরও জানান, মেয়েটি তখন কোন কথা বলতে পারছিল না। বাজারের কেউ তাকে চিনতেও পারছিল না। মামলার বাদী গিয়াস উদ্দিন ডিআইজিকে বলেন, আমার মেয়ে হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের ফাঁসি চাই।

ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন পরে বাজিতপুর থানায় গিয়ে মামলায় গ্রেপ্তারকৃত রিমান্ডে থাকা চার আসামি বাসের হেলপার লালন মিয়া, কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার মো. রফিকুল ইসলাম রফিক (৩০), লাইনম্যান মো. খোকন মিয়া (৩৮) এবং পিরিজপুরের কাউন্টার মাস্টার মো. বকুল মিয়া ওরফে ল্যাংড়া বকুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে বিকালে কিশোরগঞ্জে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন তানিয়া হত্যার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে মিডিয়া কর্মীদের ব্রিফ করেন। ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মামলার প্রধান আসামি স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসের চালক নূরুজ্জামান নূরু আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সে জানিয়েছে, তিনজনে মিলে তারা মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছে। ইতোমধ্যে বাসটিকে (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ডিএনএ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্যও পুলিশ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা হবে বলেও তিনি জানান।

এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু পাশবিক এই গণধর্ষণের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। সে জানিয়েছে, তার খালাতো ভাই বোরহান কাপাসিয়া উপজেলার বীর উজুলী থেকে বাসটিতে ওঠে। বাসের মধ্যে একাকী তানিয়াকে পেয়ে বোরহান তাকে ধর্ষণ করতে উদ্যত হয়। এ সময় প্রাণপণে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে তানিয়া। বোরহানের সাথে মেয়েটির কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে বোরহান মেয়েটির পায়ে আঘাত করে তাকে বাসের মধ্যে ফেলে দেয়। তখন তানিয়া বোরহানকে থাপ্পড় মারে। পরে দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। বোরহান মেয়েটিকে প্রথমে ধর্ষণ করার পর নূরু হেলপার লালনকে বাসটি চালাতে দিয়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ শেষে সে বাসে চালকের আসনে গিয়ে বসলে লালন মেয়েটিকে ধর্ষণ করে।

এদিকে চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি করা হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী। রোববার অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির নির্ধারিত সভায় অবধারিতভাবেই নার্স তানিয়া হত্যার বিষয়টি আলোচনায় ওঠে আসে। জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় সদস্যদের সুপারিশের ভিত্তিতে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়া তানিয়া হত্যায় সভায় শোক প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়।

নিহত শাহিনুর আক্তার তানিয়া কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে। তিনি ঢাকার ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কল্যাণপুর শাখায় সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মস্থল ঢাকা থেকে বাড়িতে আসার জন্য গত ৬ই মে বিকাল ৩টায় ঢাকার বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) ওঠেন শাহিনুর আক্তার তানিয়া। স্বর্ণলতা পরিবহনের বাস মহাখালী থেকে কটিয়াদী হয়ে বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত চলাচল করে। বাসে ওঠে তানিয়া তার বাবাকে জানান, তিনি পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে নামবেন। কিন্তু বাড়িতে ফিরতে দেরি হওয়ায় রাত সাড়ে ৮টায় তানিয়ার মোবাইলে ফোন করে নম্বরটি বন্ধ পান বাবা গিয়াস উদ্দিন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফোন করে এক ব্যক্তি গিয়াস উদ্দিনকে জানায়, তার মেয়ে বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে এবং বর্তমানে সে কটিয়াদী হাসপাতালে রয়েছে। এ খবর পেয়ে স্বজনেরা হাসপাতালে গিয়ে তানিয়াকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পড়ে থাকতে দেখেন। এ ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ৮দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের মধ্যে বাসচালক নূরু আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।