ডেক্স রিপোর্ট : ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। ৩৬৫ দিন অর্থ্যাৎ এক বছর ধরে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কারাগারে বন্দি রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। কারাবন্দি থেকেই দলের নেতাকর্মীদের কাছে উপাধি পেয়েছেন গণতন্ত্রের মা হিসেবে।
গৃহবধূ থেকে আপোষহীন নেত্রী হয়ে ওঠা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দুটি ঈদ কারাগারে কাটিয়েছেন স্বজনদের ছাড়া। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুবার্ষিকীও কেটেছে সেখানেই। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ঈদের দিনে স্বজনরা কারাগারে দেখা করলেও দুই মৃত্যুবার্ষিকীতে একা একা নামাজ আদায়, দোয়া-দরুদ, কোরআন পড়েই কেটেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দিন। ছেলেকে স্মরণ করে অঝোরে কেঁদেছেন কারাগারে। কোকোর প্রতিটি মৃত্যুবার্ষিকীতে গোরস্থানে গিয়ে তার কবর ছুঁয়ে চোখের পানি ফেলতেন।এবারই তার ব্যতিক্রম হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থেকেও তার মনোবল এতটুকুও টলেনি বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। কিন্তু শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সুচিকিৎসা না পাওয়ায় পুরনো রোগগুলো বেড়ে গেছে। চোখেও প্রচন্ড ব্যথা, তাঁর পা ফুলে গেছে। একা একা হাটতে পারছেন না। এই অবস্থা থেকেও তিনি তার দল ও দেশবাসীকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে বলেছেন।
পরিবার, চিকিৎসক ও দলের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়া চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। কর্তৃপক্ষের অবহেলা, হয়রানী, অস্বাস্থ্যকর স্যাঁতসেতে বদ্ধ পরিবেশের মধ্যে তাঁকে দিনযাপন করতে হচ্ছে, যা একটি চরম নির্যাতন। এই নির্যাতন সহ্য করতে যেয়ে তাঁর পূর্বের অসুস্থতা এখন আরও গুরুতর রূপ ধারণ করেছে। কর্তৃপক্ষ তাঁকে সুচিকিৎসা হতে বঞ্চিত করেছে। তাঁকে বিশেষায়িত হাসপাতালের সুবিধা ও ব্যক্তিগত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের দ্বারা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকেও বঞ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।
বেগম জিয়ার চিকিৎসকরা জানান, তাঁর আর্থারাইটিসের ব্যথা, ফ্রোজেন শোল্ডার, হাত নড়াচড়া করতে পারেন না। হৃস্ট জয়েন্ট ফুলে গেছে, সার্ভাইক্যাল স্পন্ডিলোসিস এর জন্য কাঁধে প্রচন্ড ব্যথা, এই ব্যথা হাত পর্যন্ত রেডিয়েট করে। হিপ-জয়েন্টেও ব্যথার মাত্রা প্রচন্ড। ফলে শরীর অনেক অসুস্থ, তিনি পা তুলে ঠিক মতো হাঁটতেও পারেন না।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে তার মতো একজন অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা না দিয়ে একটি নির্জন কক্ষে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যেভাবে রাখা হয়েছে তাতে আমরা সত্যিই ভীষণ উদ্বিগ্ন। কারণ তিনি কারাবন্দি হওয়ার আগেই নানাবিধ অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তার নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন। যা তাকে কারাগারে দেয়া হচ্ছে না।
যদিও কারবাসের এই এক বছরে শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ থাকায় গত অক্টোবর থেকে ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীনও ছিলেন। এখনো অসুস্থ থাকায় বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি। এই সময়ে খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর থেকেই তার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন, অনশন কর্মসূচি, বিক্ষোভ, স্মারকলিপি প্রদান, গণসাক্ষর অভিযান, বিভাগীয় সমাবেশ, দোয়া মাহফিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। এর মধ্যে চলছে আইনি লড়াইও। যদিও দলটির আইনজীবী ও নেতারা বলছেন খালেদা জিয়াকে আইনি লড়াইয়ে মুক্ত করা যাবে না। কারণ তাকে কোন অপরাধের কারণে কারাবন্দি করা হয়নি। বন্দি করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে। দলের সিনিয়র নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতারাও এখন বলছেন, এ সরকার আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়াকে মুক্ত হতে দেবে না। তাকে মুক্ত করতে রাজপথে নামতে হবে। তাদের ভাষায়, যেহেতু রাজনৈতিক কারণে তিনি জেলে আছেন, তাই তাকে রাজনৈতিকভাবেই মুক্ত করতে হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছেন, খালেদা জিয়াকে আইনি লড়াইয়ে মুক্ত করা যাবে না। তাকে মুক্ত করতে হলে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলন ছাড়া তাকে মুক্ত করা যাবে না। কারণ সরকার ইচ্ছা করে তাকে একের পর এক মামলা দিয়ে কারাবাস দীর্ঘায়িত করছে।
খালেদা জিয়া কারাগারে থাকাবস্থায় গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। যে নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধ্বস পরাজয় হয়েছে। এই দলের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মাত্র ৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এরপর থেকেই দলের নেতাকর্মীরা হতাশাগ্রস্থ হলেও তারা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত দলের প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারাগারে নেয়ার পর খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। বিভিন্ন সময় বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে পরিত্যাক্ত কারাগারের সেঁতসেঁতে একটি কক্ষে একা ৭৩ বছর বয়সী একজন বয়স্ক মহিলাকে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিনই তার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, তিনি (খালেদা জিয়া) প্রচন্ড অসুস্থ। চোখেও প্রচন্ড ব্যথা, তাঁর পা ফুলে গেছে। কিন্তু তাঁকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। অসুস্থতার কারণে তিনি হাটতেও পারছেন না। অথচ এই অবস্থায় কিছুদিন যাবত নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারের নিচ তলায় ছোট একটি কক্ষে অস্থায়ী ক্যাংগারু আদালত সাজিয়ে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেখানে টেনে এনে জোর করে বিভিন্ন ভুয়া মামলায় শুনানি করা হচ্ছে। কতটা নৃশংস, কতটা নিষ্ঠুর, কতটা প্রতিহিংসাপরায়ণ, কতটা হিংস্র আর বিষাক্ত মানসিকতার হলে ৭৩ বছরের একজন মহিয়সী নারীকে এভাবে জিঘাংসা চরিতার্থ করতে কতটা উন্মত্ত হওয়া যায়, সেই চিত্রটাই দেশবাসী লক্ষ্য করছে। তিনি বলেন, ক্ষমতার অন্ধলিপ্সায় ন্যুনতম মনুষ্যত্বটুকুও সরকার হারিয়ে ফেলেছে। বিএনপি নেতা বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে একজন সম্মানিত বয়স্কা জনপ্রিয় নেত্রীকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় জ্বলে-পুড়ে এমনভাবে সাজানো মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়ার দেয়ার কোন দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে নেই। বেগম জিয়ার অপরাধ মাত্র একটাই-সেটা হলো জনগণের মাধ্য তাঁর অপরিসীম ও অভাবনীয় জনপ্রিয়তা।
এদিকে খালেদা জিয়ার অসুস্থ্যতা এবং জামিন না পাওয়ায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় রয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীরা। নেতাকর্মীরা বলেন, ‘বিএনপি’ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল হলেও দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিক নন; তিনি একটি আদর্শ-দর্শন একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি হাসলে আলোকিত হয় হাজারো মুখ; মুখ ফেরালে লাখো মানুষের জীবনে নামে গভীর অন্ধকার। কর্মময় জীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন দেশের কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার বিমূর্ত প্রতীক। গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসে ৯ বছর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে দেশবাসীর কাছে তিনি ‘আপোষহীন নেত্রী’র খেতাব অর্জন করেছেন। জনগণের ভোটে তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার কোটি কোটি অনুসারী সারাদেশে ছড়িয়ে রয়েছে। মা, মাটি ও মানুষের এই নেত্রী দেশের নারীদের কাছে ‘আইডল’। দেশের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী তরুণ-তরুণীরা তাঁকে নিয়ে আগামীর স্বপ্ন বোনেন। নতুন প্রজন্ম দেখেন জেগে ওঠার স্বপ্ন। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে রয়েছে বেগম জিয়ার অনুসারী। শিশু, যুবা, বয়স্ক, বৃদ্ধা সব স্তরের মানুষ খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল; তাঁকে চেনেন, জানেন, মানেন।
