আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। আজ স্বাধীনতার ৪৭তম বর্ষ অতিক্রম করে ৪৮তম বর্ষে পদার্পণ ঘটলো। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার সূচনা করে। হানাদার বাহিনীর এই হামলা ও গণহত্যার বিরুদ্ধে দেশের মানুষ তখনই দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরু হয়ে যায় মুক্তির লড়াই। গড়ে তোলা হয় মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বাহিনী ও সেক্টর। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে বেতারে ঘোষিত হয় মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তার এই ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে ও লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ ৯ মাসের মরণপণ সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশমাতৃকা হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শাহাদাত বরণ করেন, অসংখ্য মানুষ আহত হন। মা-বোনদের কয়েক লাখ সম্ভ্রম হারান। সম্পদ-সম্পত্তির বেশুমার ক্ষতি হয়। এত কিছুর বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা, যার প্রতীক্ষায় যুগ যুগ ধরে অপেক্ষায় ছিল দেশের মানুষ। স্বাধীনতা যে কোনো জাতির জন্য পরম আকাক্সক্ষার বিষয়। আত্মপ্রতিষ্ঠার অধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন, অর্থনৈতিক মুক্তি, বৈষম্যের অবসান ইত্যাদি ছিল স্বাধীনতার লক্ষ্য। এইসব লক্ষ্য অর্জনের প্রত্যাশা নিয়েই জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং বিপুল ত্যাগ ও মূল্যে স্বাধীনতার স্বপ্নের বন্দরে উপনীত হতে সক্ষম হয়েছিল। শুরুতেই স্বাধীনতার তিনটি মৌলিক লক্ষ্যের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছিল। এই তিনটি মৌলিক লক্ষ্য হলো: সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং সাম্য। এদের সঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার, সুশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত ছিল।
প্রশ্ন ওঠে, স্বাধীনতার এত বছরেও কি স্বাধীনতার লক্ষ্য ও প্রত্যাশগুলো অর্জিত হয়েছে? এই প্রশ্নের জবাব ইতিবাচক হলে এই জাতির মানুষের চেয়ে খুশী আর কেউ হতো না। দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, স্বাধীনতার লক্ষ্য ও প্রত্যাশার কোনোটিই যথাযথভাবে পূরণ হয়নি। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত যারা ক্ষমতাসীন হয়েছেন, তারা সবাই স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাসমূহ বাস্তবায়নের প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন, মানুষের উন্নয়ন, কল্যাণ ও প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করে সমৃদ্ধ দেশগঠনই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। অথচ এখন পর্যন্ত এই অঙ্গীকার-প্রতিজ্ঞা কথার কথাই হয়ে আছে। রাজনীতি এখনো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানমূলক ধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উল্টো দোষারোপের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। গণতন্ত্র এখনো সোনার হরিণ। সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ। মানবিক মর্যাদা ও সাম্য নিখোঁজ প্রায়। অর্থনৈতিক মুক্তি সুদূরপরাহত। সবচেয়ে গভীর উদ্বেগের বিষয় এই যে, সা¤প্রতিক বছরগুলোতে জাতিকে বিভক্ত করার এক সর্বনাশা তৎপরতা চলছে। একথা কে না জানে, জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই স্বাধীনতা অর্জন সম্ভবপর হয়েছিল। বলা হয়, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা অনেক কঠিন। স্বাধীনতা তখনই সুরক্ষিত থাকে যখন জাতি ইস্পাতকঠিন ঐক্যে দৃঢ়বদ্ধ থাকে। যারা জাতিকে বিভক্ত করতে তৎপর তারা মূলত স্বাধীনতাকে অরক্ষিত করে তুলছে। আমাদের রাজনীতি, নির্বাচন, শাসন ইত্যাদিতে বহিঃশক্তির প্রভাব আমরা নানাভাবে প্রত্যক্ষ করছি। এটা জাতির ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর উদ্বেগময় অশনি সংকেত। ক্ষমতা যখন মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, ক্ষমতার জন্য বহিঃশক্তির প্রভাব স্বীকার করে নেয়ার প্রবণতা যখন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে তখন জাতির ভবিষ্যত নিয়ে শংকা জাগা স্বাভাবিক। বলা হয়, জনগণই দেশের মালিক, ক্ষমতার উৎস, অথচ বাস্তবতা হলো, জনগণের মালিকানা হাতছাড়া হয়ে গেছে। তারা আর এখন ক্ষমতার উৎস নয়। দেশে এখন একতরফা ও জোর-জবরদস্তিমূলক শাসন চলছে। এ ধরনের শাসনে জনগণের প্রত্যাশিত উন্নয়ন ও মঙ্গল সাধিত হতে পারে না। দেশের অগ্রগতিও দ্রæতায়িত হতে পারে না। এই মুহূর্তে মানুষের নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। গুম, খুন, অপহরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাÐ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে অপরাধের রীতিমত সয়লাব দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জোর যার মুল্লুক তার নীতি। দলীয়করণ, দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, দুষ্কৃৃতি, দখল, অর্থপাচার ব্যাপক ও বেপরোয়া রূপ পরিগ্রহ করেছে। অন্যদিকে শাসকদের দুর্বলতা ও অপরিণাম দর্শিতার জন্য বহিঃশক্তির দাদাগিরি জাতির জন্য বড় রকমের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের এই সার্বিক পরিস্থিতিতে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া উপায় নেই।
প্রশ্ন হলো: আমরা কি কেবল দুঃখ প্রকাশ, হতাশা প্রকাশ ও দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ করবো? নতজানু হয়ে ভাগ্যের ওপর দোষারোপ করবো? এ পরিস্থিতিতে আত্ম উদ্ধারের কি কোনো প্রেরণা ও উপায় নেই? অবশ্যই আছে। আমাদের জাতি বিশ্বে সংগ্রামী জাতি হিসেবে নন্দিত। এ জাতির অন্তর্গত মানুষ শত শত বছর ধরে জাতীয় প্রতিষ্ঠা, স্বশাসন ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই-সংগ্রাম ও যুদ্ধ করেছে। তার অতীত অত্যন্ত উজ্জ্বল। জাতির ইতিহাসের মধ্যেই প্রেরণা রয়েছে, দিক-নির্দেশনা রয়েছে। ঐক্যবদ্ধ জাতি স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করেছিল। ঐক্যবদ্ধ জাতিই তার আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশাকে বাস্তবায়িত করতে পারে। জাতিকে ফের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। হিংসা-বিদ্বেষ দূর করতে হবে। সব ধরনের দুর্নীতি, অপকর্ম ও অপরাধ নির্মূল করতে হবে। শাসক শ্রেণীকে ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে দেশ ও জনকল্যাণে ব্রতী হতে হবে। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। এ ব্যাপারে একটা গণজাগরণ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। জনগণকে জাগাতে হবে। এ দায়িত্ব নিতে হবে সচেতন ব্যক্তিদের। জনগণকেও জেগে উঠতে হবে। জনগণ জেগে উঠলে সকল দৈন্য, সকল জীর্ণতা, সকল হতাশা, সকল দুঃশাসন, সকল অন্যায় ও অবিচার দূর হয়ে যাবে।
Share this:
- Click to share on Facebook (Opens in new window)
- Click to share on Twitter (Opens in new window)
- Click to share on LinkedIn (Opens in new window)
- Click to share on Tumblr (Opens in new window)
- Click to share on Pinterest (Opens in new window)
- Click to share on Pocket (Opens in new window)
- Click to share on Reddit (Opens in new window)
- Click to share on Telegram (Opens in new window)
- Click to share on WhatsApp (Opens in new window)
- Click to print (Opens in new window)
