একুশে বার্তা রিপোর্ট : কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে ৩৬টি মামলা। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের সাজার রায়ের পর তার কারাবন্দির এক বছর হতে চলেছে। ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দির
এক বছর পূর্ণ হবে। এখনো চারটি মামলায় জামিন না হওয়ায় আটকে আছে তার কারামুক্তি।
এক এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ৪টি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের গত দশ বছরে ৩২টি মামলা দায়ের হয়েছে খালেদার বিরুদ্ধে। এরমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ৫টি, নাশকতার ১৬টি, মানহানির ৪টি, ৩টি হত্যা, মানহানিকর বক্তব্য দেয়ার ২টি, রাষ্ট্রদ্রোহের একটি, ভুয়া জন্মদিন পালনের একটি, সাবেক নৌমন্ত্রীর ওপর বোমা হামলার একটি, জাতীয় পতাকার অবমাননার একটি, ড্যান্ডি ডাইংয়ের অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন একটি এবং বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ের মালিকানা নিয়ে একটি দেওয়ানী মামলা রয়েছে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে।
আইনজীবীরা বলছেন, কারামুক্ত হতে চারটি মামলায় জামিন পেতে হবে। জিয়া অরফানেজ মামলায় হাইকোর্টের ১০ বছরের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করা হলে জামিন আবেদন করবেন তার আইনজীবীরা। চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্টে করা আপিলের জামিন আবেদন করা হয়েছে।
এ ছাড়া কুমিল্লার হত্যা মামলা ও মানহানির একটি মামলায় জামিন হয়নি এখনো। এসব মামলার ১৬টিতে অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। উচ্চ আদালতে ১১টির বিচার স্থগিত আছে। আর বাকি ২০টি মামলার কোনোটিতে অভিযোগপত্র জমা পড়েছে, বা কোনোটি তদন্তের পর্যায়ে আছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, রাজনৈতিক কারণে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছে। এগুলোর যতটা না আইনি ভিত্তি রয়েছে তার চেয়ে বড় উদ্দেশ্য হলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।
তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা কঠিন হবে। কারণ বর্তমান সরকার সকল প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। তাই, আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয় বলে আমি আগেও বলেছি। এখনো তাই মনে করি। আমরা আইনি প্রক্রিয়ার কথা যতই বলি না কেন, সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া তাকে মুক্ত করা যাবে না। এজন্য রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন গড়ে তুলে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।
দণ্ড যে দুই মামলায়: দুইটি মামলায় সাজা হয়েছে আদালতের রায়ে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালতের পাঁচ বছরের সাজা ঘোষণা হলে আপিল করেন তার আইনজীবীরা। গত ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট এ মামলায় সাজা বাড়িয়ে ১০ বছরের রায় দেন। গত ২৮ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। এখন এ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করতে হবে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩রা জুলাই রমনা থানায় মামলাটি করে দুদক।
আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় গত ২৯ অক্টোবর বিচারিক আদালতের সাত বছরের কারাদণ্ড ঘোষণার পর ১৮ নভেম্বর হাইকোর্টে আপিল করা হয়েছে সাজার বিরুদ্ধে। এই মামলাতেও জামিন আবেদন করতে হবে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় অবৈধভাবে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ৮ই আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় এ মামলাটি করে দুদক।
তিনটিতে অভিযোগ গঠনের ওপরে শুনানি চলছে: গ্যাটকো, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ও নাইকো মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি চলছে। গ্যাটকো মামলায় আগামী ৭ই ফেব্রুয়ারি এবং নাইকো মামলায় ৪ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। কারাগারে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালত ও বকশিবাজারের আলিয়া মাদরাসা মাঠের আদালতে চলছে মামলার বিচার।
গ্যাটকো মামলা ২০০৭ সালের ২রা সেপ্টেম্বর দুদকের উপ-পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী দায়ের করেন। এতে খালেদা জিয়া, তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়।
নাইকো মামলা ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় এই মামলা করে দুদক। পরের বছর ৫ই মে খালেদা জিয়া ও তার মন্ত্রী সভার সদস্য মওদুদ আহমদসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোপত্র দেয়া হয়। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি মামলা ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া এবং চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভার ১০ সদস্যসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করে দুদক।
নাশকতার ও হত্যা মামলা: যাত্রাবাড়ী এলাকায় নাশকতার তিনটি এবং একটি হত্যা মামলা রয়েছে। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি উপ-পরিদর্শক কে এম নুরুজ্জামান নাশকতার দুটি মামলা দায়ের করেন। একই বছরের ৬ মে খালেদা জিয়াসহ ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক বশির আহমেদ। ২০১৫ সালের ১৫ই মে আরেকটি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেয়। সেখানে খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। হাইকোর্টের আদেশে এই মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। এ ছাড়াও যাত্রাবাড়ী থানায় নাশকতার আরো একটি মামলা রয়েছে।
দারুস সালাম থানা ৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। এই মামলার সবগুলো হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত আছে। এরমধ্যে বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা দুই মামলায় খালেদা জিয়াসহ ৫১ জনের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ১১ মে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। দুই মামলায় পুলিশ খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে। এর একটিতে আসামি রয়েছেন ২৮ জন, অন্যটিতে ২৩ জন। ২০১৫ সালে হরতাল-অবরোধ চলাকালে ৪ ফেব্রুয়ারি ও ৩ মার্চ এ মামলা দুটি দায়ের করা হয়।
চৌদ্দগ্রামের জগমোহনপুর এলাকায় ২০১৫ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী আইকন পরিবহনে দুর্বৃত্তদের পেট্রোলবোমা হামলার ঘটনায় খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও চৌদ্দগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে প্রধান আসামি করে ৭১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা ও নাশকতার ২টি সহ তিনটি মামলা করা হয়েছে।
নাশকতার মামলায় ২০১৭ সালের ৬ মার্চ খালেদা জিয়াসহ ৭৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। একই বছরের ৯ অক্টোবর এ মামলায় খালেদা জিয়াসহ ৭৮ জনের বিরুদ্ধে পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্র গ্রহণ করে কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজ জেসমিনা বেগম গ্রেপ্তারি পরোয়না জারির আদেশ দেন।
কুমিল্লার হত্যা মামলায় ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর কুমিল্লা জেলা ডিবির পরিদর্শক ফিরোজ হোসেন ওই মামলার অধিকতর তদন্ত শেষে খালেদা জিয়া, রুহুল কবির রিজভী, মনিরুল হক চৌধুরী, জামায়াত নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরসহ ৭৭ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
২০১৮ সালের ২রা জানুয়ারি কুমিল্লার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও ৫ নম্বর আমলি আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক জয়নব বেগম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন খালেদা জিয়াসহ ৫৫ আসামির বিরুদ্ধে।
পঞ্চগড়ের বিএনপি ঘোষিত হরতাল, অবরোধ ও সারা দেশে নাশকতা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার অভিযোগে খালেদা জিয়াকে হুকুমদাতা হিসেবে ১ নম্বর আসামি করে ৩ জনের বিরুদ্ধে পঞ্চগড়ের বোদা (৩) আমলী আদালতে মামলা করা হয়েছে।
রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানি মামলা: ভুয়া জন্মদিন পালনের অভিযোগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ৩০শে আগস্ট ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী জহিরুল ইসলাম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে (সিএমএম) বাদী হয়ে মামলা করেন জননেত্রী পরিষদের সভাপতি এবি সিদ্দিক।
২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ জননেত্রী পরিষদের সভাপতি এবি সিদ্দিকী ‘স্বীকৃত স্বাধীনতা বিরোধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে দেশের মানচিত্র এবং জাতীয় পতাকার মানহানি ঘটানোর অভিযোগে সিএমএম আদালতে একটি মানহানির মামলা করেন। এই মামলায় গত ১২ই অক্টোবর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ঢাকা মহানগর হাকিম নুর নবী।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মমতাজ উদ্দিন মেহেদী ২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। এই মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
এ ছাড়া খুলনার ফুলতলা থানায় ২০১৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নাশকতার একটি, পঞ্চগড়ের আমলী আদালতে ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি নাশকতার একটি, ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নৌমন্ত্রীর ওপর বোমা হামলার অভিযোগে গুলশান থানায় করা মামলা, ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর মানহানিকর বক্তব্য দেয়ার মামলা, সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে দেয়া মানহানিকর বক্তব্যের অভিযোগে মামলা, ২০১৪ সালের ২১ অক্টোবর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলা, ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর নড়াইলে করা মানহানির মামলা, কুমিল্লায় এক কোটি টাকার মানহানির মামলা, ২০১৫ সালের ২২ মার্চ করা ড্যান্ডি ডায়িং মামলা, নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের জমি নিয়ে করা মামলা রয়েছে।
