ডেস্ক রিপোর্ট: চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকালে রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা এবং আরা দু’জনকে হত্যা মামলায় ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের তৎকালিন কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন জনকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গতকাল রোববার এ রায় দেন। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত অপর দুই আসামি হলেন, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো: রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো: মশিউর রহমান।
একই রায়ে রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালিন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে দেয়া হয়েছে ২০ বছরের কারাদ-। এ ছাড়া রামপুরা থানার তৎকালিন সাব-ইন্সপেক্টর তরিকুল ইসলাম ভুইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হয়েছে। গতকাল রোববার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন, মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রায় ঘোষণাকালে ২০ বছর কারাদ-প্রাপ্ত চঞ্চল চন্দ্রকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
গত রোববার ২৮ জুন বেলা ১১টা ৪৮ মিনিট থেকে রায় পড়া শুরু হয়। প্রথমেই রায়ের কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সরাসরি সম্প্রচারের জন্য অনুমতি চান প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। পরে অনুমতি সাপেক্ষে এ কার্যক্রম বিটিভিতে সরাসরি দেখানো হয়।
কার্যক্রমের শুরুর দিকে এ মামলার আসামিদের দায় পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার। পরে চার্জ পড়েন বিচারক মোহিতুল হক এনাম। আর রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ।
এর আগে বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে গ্রেফতার থাকা একমাত্র আসামি রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালিন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে এজলাসে তোলা হয়। মামলার অপর চার আসামি পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন, হাবিবুর রহমান, মো: রাশেদুল ইসলাম, মো: মশিউর রহমান, তারিকুল ইসলাম ভুইয়া।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে জুমা নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন আমির হোসেন। বাসার কাছাকাছি এলে তিনি সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান। এ সময় পুলিশ গুলি করে। পুলিশের গুলি থেকে প্রাণ বাঁচাতে রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন ভবনের চার তলায় গিয়ে আশ্রয় নেন তরুণ আমির। একপর্যায়ে আমির হোসেনকে ধাওয়া করে পুলিশও ভবনটির চারতলায় ওঠে। সেখানে আমির হোসেনকে পেয়ে পুলিশ সদস্যরা তাকে গুলি করেন। আমির তখন লাফ দিয়ে নির্মাণাধীন ভবনটির কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকেন। তখন তৃতীয় তলা থেকে আরেক পুলিশ সদস্য তাকে লক্ষ্য করে পরপর ৬টি গুলি করেন। এসব গুলি আমিরের দুই পায়ে লাগে।
পরে পুলিশ চলে গেলে এই যুবক ঝাঁপ দিয়ে কোনোরকমে তৃতীয় তলায় পড়েন। তখন তার দুই পা দিয়ে রক্ত ঝরছিল। পরে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। তবে একই দিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম শহীদ হন।
এ মামলায় গত বছর ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা। ৭ আগস্ট প্রসিকিউশনের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউটর ফারুত আহাম্মদ। গতবছর ১৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিচার শুরু হয়।
এদিকে রায় ঘোষণার পর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে তিনি বলেন, এটি একটি অত্যন্ত যথার্থ রায়। ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়েছে যে, তৎকালিন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার অধীনস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা সেই নির্দেশ অনুযায়ী নির্বিচারে বুক ও মাথায় গুলি চালিয়ে মায়া ইসলাম ও নাদিম ইসলামসহ সাধারণ মানুষকে হত্যা করেন। মামলার অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল রামপুরায় ভবনের কার্নিশে ঝুরে থাকা নিরস্ত্র তরুণ আমির হোসেনকে গুলি করা। এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার নিজে স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও বার্তায় এই অপরাধের কথা স্বীকার করেছিলেন।
এই রায়ের মাধ্যমে শহীদ ও আহত পরিবারগুলো দীর্ঘদিন পর কাঙ্খিত ন্যায়বিচার ফিরে পেয়েছে। তারাও এই রায়ে সম্পূর্ণ একাত্মতা ও সন্তোষ প্রকাশ করেছে। প্রসিকিউশন জানায়, চঞ্চল চন্দ্র সরকার ব্যতীত সাজাপ্রাপ্ত বাকি চারজন আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। ইন্টারপোল এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মাধ্যমের সহায়তায় যেকোনো মূল্যে পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে এনে এই সাজা কার্যকর করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রসিকিউশন।
পক্ষান্তরে ২০ বছর কারাদ-প্রাপ্ত চঞ্চল চন্দ্রের আইনজীবী অসন্তোষ প্রকাশ করে এ দ-াদেশের বিরুদ্ধে আপিল করবেন মর্মে জানিয়েছেন।
