নিউজ ডেক্স : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মানবপাচারের অর্ধশত সিন্ডিকেটের সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দারা। সিভিল এভিয়েশন, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা ,ম্যানপাওয়ার ডেক্সের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এই সিন্ডিকেড সদস্য সক্রিয়্। এদের তালিকা প্রস্তুতির প্রক্রিয়া ভেস্তে গেছে, গ্রেফতার আংতকও আপাতত উবে গেছে। ইতালির পর এবার জাল ভিসায় মালয়েশিয়ার পাঠানোর প্রক্রিয়ায় ৫ জন কট হলেও ৭৬ জন বিমানবন্দর থেকে পালিয়ে রক্ষা পেয়েছে।
এ দিকে শাহজালাল বিমানবন্দরে আওয়ামী-জামায়াত দোসরদের নিয়ে ১৫ বছর পর ওয়েলফেয়ার কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া ষোলকলা পূর্ন হতে যাচ্ছে। কমিটিতে যুববলীগ জামাতের দোসররা ঠাই পাচ্ছে।
এ দিকে ইডি শাহজালাল আওয়ামী দোসরদের নিয়ে যাত্রী সেবা বাস ‘ফ্রি শাটল বাস সার্ভিস’ উদ্ধোধন করেছেন বলে বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। ছাত্রলীগের এক্স নেতাও উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই বাস উদ্ধোধনের কথা ছিল বেবিচক চেয়াম্যানের। এ জন্য পিআর থেকে প্রচারনাও চালানো হয়। কিন্ত চেয়ারম্যানের পরিবর্তে ইডি শাহজালাল শেষাবধি তা উদ্ধোধন করেন। এক সময়কার ভারতীয় দূতাবাসের ওই কর্মকর্তার বাড়ি নাকি ফরিদপুরে। পরিচালক এভসেকের বাড়িও নাকি ফরিদপুরে।গত ১৫ বছল ধরে শাহজালালে কর্মরত যিনি ডবল দায়িত্ব পালন করছেন—সেই সেলিমও উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরের কর্মরত সিন্ডিকেড সদস্যরা ‘বডি কন্ট্রাক্ট’-এর নামে অর্থের বিনিময়ে যাত্রীদের অবৈধভাবে বিদেশে পাঠিয়ে আসছিলেন। উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যাওয়া এসব মানুষ অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়েছেন—কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মুক্তিপণ দিয়ে দেশে ফিরেছেন। এ ধারা অব্যাহতগতিতে বহমান। এদের মধ্যে বেবিচকের কোন কোন কর্মচারি-কর্মকর্তা একটানা শাহজালাল বিমানবন্দরে একটানা ২৮ বছর ধরে কর্মরত।রহস্যজনক কারণে এদেকে বদলি করা হয় না, আবার আইওয়াশের জন্য বদলি করা হলেও তদবির করে আবার ফিরে আসে। এদের মধ্যে আজাদ, মিজান, তোফায়েল, জিন্নাহ, সাঈদ, আফজাল, শরিফ, আরিফ, মনজু,আশরাফগং। এদের মধ্যে কয়েকজন বডিফিটিংসে সোনা পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ধরা পড়ে জেল খেটেছে, চাকরিচ্যুত হয়েছে। এদের সারিতে গার্ড মেজবাহ, রেজাউল, ইউসুফ কামাল।
সম্প্রতি লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ২১ জনের মৃত্যুর ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থানে যায়। এর পর বিমানবন্দরকেন্দ্রিক মানবপাচার সিন্ডিকেট নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সেই অনুসন্ধানে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বিদেশগামী ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও, ‘বডি কন্ট্রাক্ট’-এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধাপে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হতো। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়।
তিনি বলেন, অনুসন্ধানে বিমানবন্দরে কর্মরত একাধিক সরকারি কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা-কর্মচারি, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সদস্য এবং বাংলাদেশ বিমানসহ বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে ওই কর্মকর্তা জানান, একাধিকবার যাচাই-বাছাই ও ক্রসচেক করে তাদের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করেও তথ্যগুলো নিশ্চিত করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বডি কন্ট্রাক্টের এই চক্রে সিভিল এভিয়েশনের অন্তত ৩০ জন, এসবির ১০-১২ জন এবং বিমানসহ বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ১০-১২ জন প্রতিনিধি জড়িত। তারা প্রতি ব্যক্তির কাছ থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে অবৈধভাবে ফ্লাইটে তুলে দেওয়ার কাজে যুক্ত।
জড়িতদের নামসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে তালিকা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। একইসঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করা হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে।
এর আগে মানবপাচার প্রতিরোধে বিমানবন্দরজুড়ে চতুর্মুখী নজরদারি জোরদার করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে একাধিক সংস্থা বিশেষ তৎপরতা শুরু করে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ গণমাধ্যমে বলেন, বিমানবন্দরে মানবপাচার প্রতিরোধে নিয়মিত কাজ করা হচ্ছে। বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ বিষয়ে বিশেষ তৎপরতা চালাচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষ তাদের সহযোগিতা করছে।
তিনি বলেন, কারা এই চক্রে জড়িত সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ বা জাল ভিসার মাধ্যমে যাত্রী পার করলেও দীর্ঘদিন তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিচয় না জানায় মামলায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন না। ফলে অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।
