নিউজ ডেক্স : শেখ মুজিবকে নিয়ে গান ভাইরাল হওয়া ডিসি ফরিদাকেও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ডিএনসিসির বজ্য কর্মকর্তা সাদেকুর রহমানকে সাসপেন্ড করার পর তাকেও পদোন্নতি দিয়ে যুগ্ম সচিব করা হয়েছে।দন্ডপ্রাপ্ত নজরুলকেও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এর আগে গত অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলে আওয়ামী দোসরদের পদোন্নতি দিয়ে যুগ্ম সচিব করা হয়েছে। এদের একজন প্রেষণে বেবিচকে কি-পয়েন্টে আছেন। তিনি আবার রাষ্ট্রপতির পিএস’র ঘনিষ্ঠ বটে।
এ দিকে উপসচিব পদে থাকা মাইনুল হক ভূঁইয়াকে অবসরে পাঠিয়েছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ৯ দিন পর পদোন্নতি পেয়ে তিনি হলেন যুগ্ম সচিব। শুধু তিনি নন পদোন্নতি পেয়েছেন দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে অতীতে দণ্ড পাওয়া কর্মকর্তারাও।
গত বৃহস্পতিবার উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব হয়েছেন ১৭৯ জন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে তালিকায় ৫৩ নম্বরে আছেন মাইনুল হক। বিতর্কিত কিছু কর্মকর্তা পদোন্নতি পেলেও একটি ব্যাচের মেধা তালিকায় শীর্ষে থাকা দুজন বাদ পড়েছেন। এতে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনে এটাই একসঙ্গে সবচেয়ে বড় পদোন্নতি।
গত ৩০ জুন জারি করা প্রজ্ঞাপনে মাইনুল হক ভূঁইয়াকে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হয়। যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে বৃহস্পতিবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাঁর নাম থাকায় প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
মাইনুল হক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের উপসচিব ছিলেন। তাঁর বয়স ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি চাকরি আইনের ধারা ৪৩ এর ১(ক) অনুযায়ী অবসরে পাঠানো হয়। পদোন্নতি প্রসঙ্গে মাইনুল হক গত ১০ জুলাই শুক্রবার সমকালকে বলেন, ‘জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জেনেশুনে আমাকে পদোন্নতি দিয়েছে। এটা ভুল করে করা হয়নি। কারণ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকেই গত ৩০ জুন অবসর-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন হয়েছিল। এখন হয়তো আর একটি প্রজ্ঞাপনে আবার বিষয়টি স্পষ্ট করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আমি চূড়ান্ত কোনো কিছু জানি না।’
দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও পদোন্নতির তালিকায় : পদোন্নতির তালিকায় থাকা দণ্ড পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। ডেমরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অসদাচরণের অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। তাঁকে তিন বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করলেও তাঁর দণ্ড বহাল রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব মো. শাহীনুর ইসলামকে বালুমহাল কেলেঙ্কারিতে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়।
নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) থাকাকালে তিস্তা নদীর বালুমহালের ইজারাগ্রহীতার চেক ব্যাংকে জমা না দিয়েই অর্থ প্রাপ্তির ভুয়া চুক্তি করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে এক বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিতকরণের দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তিনিও পদোন্নতি পেয়েছেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ মকবুল হোসেনকে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে দুর্নীতির দায়ে শাস্তি দেওয়া হয়। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে কর্মরত থাকাকালে নির্মাণকাজে দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে তাঁকে দুই বছরের জন্য দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার দণ্ড দেওয়া হয়। পরে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল তাঁর এই দণ্ড বাতিল করে। তিনিও আছেন পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে।
এদিকে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে অবহেলার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ২৮ মে বরখাস্ত হওয়া উপসচিব ছাদেকুর রহমানও পদোন্নতি পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তদন্ত চলছিল। তিনি এখনও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি (সংযুক্ত) হিসেবে আছেন।
এ বিষয়ে ছাদেকুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘আমার বিষয়টি তদন্ত হয়েছে এবং শুনানি করে জনপ্রশাসন সচিব নিষ্পত্তি করেছেন। এখনও ওএসডি (জনপ্রশাসনে সংযুক্ত) আছেন কেন? এ প্রশ্নে তিনি কোনো জবাব দেননি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এবার বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের ২৫ ও ২৪ ব্যাচের এবং অতীতে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তবে ২৫ ব্যাচে মেধা তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দুই কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়নি।
এসএসবির বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন : প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের শীর্ষ কমিটি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। এ কমিটি উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ের পর পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করে। এবার প্রায় আট মাস যাচাই-বাছাইয়ের পর উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতির সুপারিশ করা হয়। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয় সেই সারসংক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে এই কমিটির সদস্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র ও অর্থ বিভাগের সচিব বা জ্যেষ্ঠ সচিব এবং মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি)। প্রতিটি বৈঠকের জন্য ভাতা পান কমিটির সদস্যরা। এই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. এহছানুল হককে একাধিকবার ফোন করা ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা শীর্ষ কর্মকর্তাদের নির্দেশে পদোন্নতির তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া সমকালকে বলেন, অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই। এ কারণে, পুরো তালিকাই বিতর্কিত হয়ে গেছে। পদোন্নতির প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জাগবে। তিনি বলেন, এ জন্য এসএসবি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায় আছে। সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হয়েছে।
প্রশাসন-সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পদোন্নতি শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয় নয়। এটি পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার ন্যায্যতা, শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও আইনি ভিত্তি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
