ডেস্ক রিপোর্ট: : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্যানোপি-২ এক্সিট গেটের বাইরে গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত আনুমানিক ১২টা ৫২ মিনিটে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ঘটনার একটি অংশ মোবাইল ফোনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হলে তা ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ঘটনার পূর্বাপর বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই সময়ে একজন আগমনী যাত্রী ক্যানোপি-২ দিয়ে বের হওয়ার সময় তাঁকে গ্রহণ করতে আসা একজন পুরুষ সহযাত্রী ক্যানোপি-২ এক্সিট গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও যাত্রী চলাচলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেখানে কর্তব্যরত আনসার সদস্য তাঁকে প্রবেশ না করার জন্য অনুরোধ করেন এবং বাধা প্রদান করেন।
এরপরও ওই ব্যক্তি একাধিকবার ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে কর্তব্যরত আরেকজন আনসার সদস্য তাঁকে নিবৃত্ত করার জন্য এগিয়ে আসেন। এ সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। এরপর তাঁকে সঙ্গে নিয়ে আসা অন্য ব্যক্তিরা ঘটনাস্থলে এগিয়ে এলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
ঘটনার ওই পর্যায়ের একটি অংশ সেখানে উপস্থিত একজন ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে সেটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় ঘটনার পূর্ববর্তী পরিস্থিতিসহ পুরো ঘটনাপ্রবাহ দেখা যায়। এতে দেখা যায়, নির্ধারিত এক্সিট গেট দিয়ে একাধিকবার প্রবেশের চেষ্টা ঠেকাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার পরই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত হয়।
বিমানবন্দরে যাত্রীকে গ্রহণ করতে আসা স্বজন ও দর্শনার্থীদেরও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রটোকল, নির্ধারিত প্রবেশ ও বহির্গমন ব্যবস্থার নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলা উচিত। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা শুধু নিরাপত্তাকর্মীদের নয়; যাত্রী, স্বজন, দর্শনার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। পারস্পরিক সম্মান, ধৈর্য ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একইভাবে, কোনো ঘটনার আংশিক বা খণ্ডিত ভিডিও দেখে সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব কিংবা অনুমাননির্ভর বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে যেকোনো তথ্য প্রচারের আগে তার সত্যতা ও পূর্ণ প্রেক্ষাপট যাচাই করা আমাদের সবার কর্তব্য। অনিচ্ছাকৃতভাবেও ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়লে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে এবং জনমনে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনা, যেখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক দেশি-বিদেশি যাত্রী, তাঁদের স্বজন এবং বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীর চলাচল রয়েছে। ফলে বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং যাত্রীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে নির্ধারিত প্রবেশ ও বহির্গমন ব্যবস্থা অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যদের পাশাপাশি বিমানবন্দর ব্যবহারকারী প্রত্যেকেরই দায়িত্বশীল, ধৈর্যশীল ও সহযোগিতামূলক আচরণ প্রত্যাশিত।
যাত্রীসেবা ও বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন যাত্রী চলাচল নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিমানবন্দর ব্যবহারকারী সবাই নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি ও নির্দেশনা অনুসরণ করে দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে এই প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করবেন—এটাই প্রত্যাশা।
যা বলেছে আনসার বাহিনী:
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্যানোপি-২ এলাকায় যাত্রীর স্বজনদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের হাতাহাতির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।
বেবিচক জানিয়েছে, ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে ঘটনার পূর্বাপর চিত্র পাওয়া গেছে। অন্যদিকে আনসারের পক্ষ থেকেও ঘটনাটি নিয়ে পৃথক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১২টা ৫২ মিনিটে ক্যানোপি-২-এর এক্সিট গেটের বাইরে এ ঘটনা ঘটে। ওই সময় একজন আগমনী যাত্রী ক্যানোপি-২ দিয়ে বের হওয়ার সময় তাকে নিতে আসা এক পুরুষ সহযাত্রী নির্ধারিত এক্সিট গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
বেবিচক বলছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও যাত্রী চলাচলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেখানে দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্য ওই ব্যক্তিকে ভেতরে প্রবেশ না করার অনুরোধ করেন এবং বাধা দেন। কিন্তু তিনি একাধিকবার ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে আরেকজন আনসার সদস্য তাকে নিবৃত্ত করতে এগিয়ে আসেন। এ সময় ওই ব্যক্তি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান।
এরপর তাকে সঙ্গে নিয়ে আসা আরও কয়েকজন ব্যক্তি ঘটনাস্থলে এগিয়ে এলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত আনসার সদস্যদের ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতি হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা একজন ব্যক্তি মোবাইল ফোনে ঘটনার একটি অংশ ধারণ করেন। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বলে জানিয়েছে বেবিচক।
বেবিচকের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ঘটনার একটি অংশ দেখা যায়। তবে পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুরো ঘটনাপ্রবাহ দেখা হয়েছে। ফুটেজে ওই ব্যক্তিকে নির্ধারিত এক্সিট গেট দিয়ে একাধিকবার ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করতে এবং নিরাপত্তাকর্মীদের তা ঠেকাতে দেখা গেছে। ওই ব্যক্তি পড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং হাতাহাতির সূত্রপাত হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
হাতাহতির ঘটনায় যা বলছে আনসার
এদিকে আনসারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় ক্যানোপি-২ এলাকায় সি-শিফটে বিমানবাহিনী ও আনসার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। আনসারের বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার সময় আনুমানিক রাত ১টা ২০ মিনিট উল্লেখ করা হয়েছে।
আনসার বলছে, এক যাত্রীর স্বজন নিরাপত্তা নির্দেশনা অমান্য করে বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে বাধা দেন। পরে তিনি নিরাপত্তাকর্মীদের পাশ কাটিয়ে ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করলে একপর্যায়ে মেঝেতে পড়ে যান।
আনসার জানিয়েছে, ওই ব্যক্তিকে নিতে আসা কয়েকজন স্বজন এ সময় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করতে থাকেন। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিমানবাহিনীর সদস্যরা তাদের ভিডিও ধারণ বন্ধ করার অনুরোধ করলে কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
একপর্যায়ে দায়িত্ব পালনরত আনসার সদস্যদের ওপর হামলার চেষ্টা করা হয় বলে দাবি করেছে আনসার। তখন সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেন। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে কয়েকজন যাত্রীর স্বজন আনসার সদস্যদের ঘিরে ফেলেন। পরে বিমানবাহিনী, আনসারসহ দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
আনসারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরে উত্তেজিত যাত্রীর স্বজনেরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান। এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনরত পিসি হাবিবুর রহমান এবং আনসার সদস্য মো. নুরুজ্জামান ও মো. সাদেকুল সামান্য আহত হন। তাদের ইউনিফর্মের কিছু অংশও ছিঁড়ে যায়। আহত হওয়ার পরও ওই তিন সদস্য দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন বলে জানিয়েছে আনসার।
