বিশেষ প্রতিবেদক : দেশের কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত করের টাকায় জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) মেগা ঋণ পরিশোধ করছে বাংলাদেশ। তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত ৩য় টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (O&M) নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক ও অসন্তোষ। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ও ঋণে গড়ে ওঠা এই মেগা অবকাঠামো কোনো মূলধনি বিনিয়োগ ছাড়াই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।
বিনিয়োগহীন অংশীদারিত্ব ও অন্যায্য রাজস্ব বণ্টন:
পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) আইনের মূল শর্ত হলো বেসরকারি অংশীদারকে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগ করতে হবে এবং আর্থিক ঝুঁকি ভাগ করে নিতে হবে। কিন্তু ৩য় টার্মিনাল নির্মাণে জাইকার ঋণ কোনো পিপিপি চুক্তির আওতায় দেওয়া হয়নি, কিংবা পরিচালনার দায়িত্ব নির্দিষ্ট কোনো জাপানি কোম্পানিকেই দিতে হবে—এমন কোনো পূর্বশর্তও ঋণচুক্তিতে ছিল না। অথচ নির্মাণকাজে কোনো অর্থায়ন না করেও কয়েকটি জাপানি কোম্পানি টার্মিনালটি পরিচালনায় যুক্ত হতে চাইছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, টার্মিনাল থেকে আয়ের প্রায় ৭২ শতাংশ নিয়ে যাবে বিদেশি কোম্পানি, আর বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) পাবে মাত্র ২৮ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে প্রকল্পে বিদেশি পক্ষের কোনো আর্থিক বিনিয়োগ বা ঝুঁকি নেই, সেখানে আয়ের সিংহভাগ তুলে দেওয়া নীতিগত ও অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি অযৌক্তিক।
অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বনাম স্থায়ী বিদেশি নির্ভরতা:
বেবিচকের বর্তমান জনবল দিয়ে ৩য় টার্মিনাল পরিচালনা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক মান অর্জনের স্বার্থে শতভাগ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নতুন পদ সৃষ্টি, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেওয়া রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো, অন্যদিকে দেশীয় প্রকৌশলী ও কর্মীদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ত। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে একক কর্তৃত্ব তুলে দিলে স্থানীয় মানবসম্পদের বিকাশ রুদ্ধ হবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রবাসী শ্রমিক ও যাত্রীদের ওপর সেবামূল্যের বোঝা:
বিনিয়োগহীন বিদেশি অপারেটরগুলোর প্রধান লক্ষ্য থাকে যে কোনো মূল্যে মুনাফা নিশ্চিত করা। ফলে বিমানবন্দর ব্যবহারের বিভিন্ন মাশুল, হ্যান্ডলিং চার্জ এবং নিরাপত্তা ফি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে। এর চূড়ান্ত অর্থনৈতিক বোঝা চাপবে সাধারণ যাত্রী এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে কর্মরত প্রবাসী রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের ওপর। টিকিটের অতিরিক্ত মূল্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারাই, যাদের পাঠানো অর্থে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে।
একক উৎস নয়, উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দাবি:
পতিত সরকারের আমলে নেওয়া একতরফা ও সুবিধাজনক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা বজায় না রেখে বর্তমান সরকারের কাছে নীতিগত স্বচ্ছতার দাবি জানাচ্ছেন সচেতন মহল। একক কোনো দেশকে বিশেষ সুবিধা বা অযৌক্তিক চুক্তিতে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব না দিয়ে উন্মুক্ত ও বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের জোর দাবি উঠেছে। এতে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে এবং সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি রাষ্ট্রের ন্যায্য রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হবে।
জাতীয় সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের স্বার্থ অটুট রাখতে যেকোনো বিদেশি অংশীদারিত্বের শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুনর্মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি।
Share this:
- Click to share on Facebook (Opens in new window)
- Click to share on Twitter (Opens in new window)
- Click to share on LinkedIn (Opens in new window)
- Click to share on Tumblr (Opens in new window)
- Click to share on Pinterest (Opens in new window)
- Click to share on Pocket (Opens in new window)
- Click to share on Reddit (Opens in new window)
- Click to share on Telegram (Opens in new window)
- Click to share on WhatsApp (Opens in new window)
- Click to print (Opens in new window)
