ডেক্স রিপোর্ট : রিমান্ডে থাকা ব্যক্তির সহায়সম্পত্তি পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল হক কীভাবে লিখে নিতে সক্ষম হলেন, তা জানতে পুলিশ সদর দফতরে চিঠি দিচ্ছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। যুগান্তর
এ দিকে এ ঘটনার বিস্তারিত রিপোর্ট দৈনিক যুগান্তর এবং যুগান্তরে সূত্রমতে ‘একুশে বার্তা’র অনলাইনে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশ প্রতিদিনে বিঙাপন আকারে প্রতিবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দফতরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার কমিশন।
মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কার্যালয়ে কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা গুরতর অপরাধ। এটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম পর্যায়ের শামিল। আমরা যুগান্তরে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত রিপোর্ট দেখেছি। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে মানবাধিকার কমিশন।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আগেও এ ধরনের ঘটনা দেখা গেছে। এমনকি ৩০-৩৫টি পর্যন্ত মামলা দিয়ে পুলিশ হয়রানি করেছে- এমন ঘটনাও আছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ ধরনের প্রতিটি ঘটনা গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা দরকার। রিমান্ডে এনে একজন বৃদ্ধের জমি জোরপূর্বক রেজিস্ট্রি করে নেয়ার ঘটনাটি আমরা তদন্ত করব।
এদিকে এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ এখানে যে ধরনের ফৌজদারি অপরাধ করেছে, তার জন্য অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া উচিত। পুলিশ বিভাগের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সমন্বয়ে তদন্তের ব্যবস্থা নেয়া একান্ত কর্তব্য। শুধু পুলিশ বিভাগের তদন্ত নয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তা চাকরিবিধিমালাও লঙ্ঘন করেছেন। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনই প্রশাসনিক তদন্ত শুরু করতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো শক্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঘটনা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন যুগান্তরকে বলেন, এটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এসব অপরাধ করছেন। কেউ জমি দখল করছেন, কেউ নির্যাতন করছেন আবার কারও বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ। আপনারা যদি পুলিশ সদর দফতরেরই পরিসংখ্যান দেখেন তবে সেখানে প্রচুর এ ধরনের ঘটনা পাওয়া যাবে। ১০ হাজারের বেশি পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা পুলিশ সদর দফতরই দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরও অপরাধপ্রবণতা কমছে না কেন? অর্থাৎ অভিযুক্ত পুলিশের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থাটা নেয়া হচ্ছে, সেটা যথেষ্ট কার্যকর নয়। ফলে পুলিশ ক্ষমতার অপব্যবহার করেই যাচ্ছে। এ কারণে অভিযোগ প্রমাণিত হলে লঘু দণ্ড নয়, ফৌজদারি অপরাধ করলে তাকে ফৌজদারি আইনেই শাস্তি দিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘শুধু পুলিশ নয়। নানা শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যেই এখন লোভ ব্যাপকভাবে কাজ করছে। সম্পদ কোথা থেকে আসবে, সেটাই যেন বড়। যেহেতু পুলিশের হাতে ক্ষমতা আছে, তাই তারা সম্পদ অর্জনে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। তারা কোনোভাবেই ঔপনিবেশিক পুলিশ থেকে গণতান্ত্রিক পুলিশ হয়ে উঠতে পারছে না। তাই পুলিশ সম্পর্কে গভীর উৎকণ্ঠা উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় আমরা দেখতে পাচ্ছি।’
যুগান্তরের এ সংক্রান্ত রিপোর্টের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, রিমান্ডে একজন বৃদ্ধের জমিজমা রেজিস্ট্রি করে নেয়া হয়েছে মর্মে পত্রিকায় যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা আমি দেখেছি। এ ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে ঘটনাটি প্রমাণ করে- রিমান্ডের নামে হেফাজতে নিয়ে বন্দির সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করে পুলিশ। একই সঙ্গে এটাও প্রমাণিত হয়- শুধু একজন অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল নন, এ ধরনের আরও অনেক কর্মকর্তা পুলিশের ভেতরই বহাল রয়েছেন।
তিনি বলেন, ভাবতেই অবাক লাগে- একজন অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা কী করে এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতে পারলেন? অবিলম্বে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশ মহাপরিদর্শকের উচিত এ ধরনের কর্মকর্তাকে বাহিনী থেকে অবিলম্বে অব্যাহতি দেয়া। কারণ তার অধীনেই পুলিশ বাহিনী চলে।
প্রসঙ্গত, ‘রিমান্ডে থাকা অবস্থায় জমি রেজিস্ট্রি : বৃদ্ধের সর্বস্ব লিখে নিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি’ শিরোনামে পহেলা জুলাই যুগান্তরে বিশেষ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। জাহের আলী নামের এক বৃদ্ধ ও তার পরিবারের সদস্যদের ধরে এনে জোরপূর্বক জমিজমা লিখে নেয়ার অভিযোগে আদালতে মামলা করে ভুক্তভোগী পরিবারটি। ঢাকা মহানগর হাকিমের আদালতে এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলছে।
ভুক্তভোগী বৃদ্ধ জাহের আলী যুগান্তরকে বলেন, অতিরিক্ত ডিআইজি গাজী মোজাম্মেল খুবই ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তিনি আমার পরিবারের ওপর নির্যাতনের যে স্টিম রোলার চালিয়েছেন, তা নজিরবিহীন। নির্যাতনের পর সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে প্রায় এক বছর তাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তার পরিবারের সদস্যরা থানায় অভিযোগ জানাতে যান। কিন্তু থানা পুলিশ মামলা নেয়া তো দূরের কথা, জিডি পর্যন্ত নেয়নি। এমনকি গাজী মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে রূপগঞ্জ থানায় গেলে পুলিশের দায়িত্বরত ব্যক্তিরা একরকম ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের বের করে দেন। থানায় অভিযোগ জানাতে ব্যর্থ হয়ে তারা আদালতে মামলা করেন।
মামলার আইনজীবী হাসনা খাতুন যুগান্তরকে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে মামলা লড়তে গিয়ে তিনিও হুমকির মুখে পড়েন। অজ্ঞাত মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। কিন্তু ভয় পেয়ে তিনি পিছপা হননি। কারণ পুলিশের নির্যাতন ও রিমান্ডে জমিজমা লিখে নেয়ার সব প্রমাণপত্র তার হাতে রয়েছে, যা ইতিমধ্যে আদালতেও উপস্থাপন করা হয়েছে।
