একুশে বার্তা ডেক্স : মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী যুবক ফয়জুর রহমান ফয়জুল জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী। তবে কোন জঙ্গি সংগঠনের, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হামলাকালে তার সঙ্গে অন্তত আরও দুজন ছিল। তারা এখনো আটক হয়নি। হামলার পেছনে কারা, কেন জাফর ইকবালের ওপর হামলা করা হলো- এসব প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করছেন র্যাব-পুলিশের কর্মকর্তারা। এ জন্য ফয়জুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গত ৪ মার্চ বিকালে ফয়জুলকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে র্যাব। রাতে ফয়জুরের বাবা-মা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
এদিকে অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনার পর র্যাব ফয়জুরের মামা সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফজলুল রহমান ও চাচা আবুল কাহারকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করছে। র্যাব ফজলুল রহমানের বাড়িতে তল্লাশি করে ল্যাপটপ, সিডি, বেশ কিছু মালামাল জব্দ করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হামলাকারী ফয়জুল জানিয়েছে, ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ নামে একটি উপন্যাস লিখে নবী সোলায়মানকে (আ) ব্যঙ্গ করা হয়েছে। এ কারণে জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। সে জাফর ইকবালকে ইসলামের শত্রু হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছে, উনি নিজেও নাস্তিক এবং অন্য সবাইকে নাস্তিক বানানোর জন্য প্রচারণা চালাচ্ছেন। তার লেখা পড়ে মানুষ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছে। ফয়জুল আরও জানায়, জাফর ইকবালকে মারার জন্য অনেকদিন ধরে সে অনুসরণ করছে। ওদিকে অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনায় সিলেটের জালালাবাদ থানায় একটি মামলা করা হয়েছে, যেখানে আসামি করা হয় হামলাকারী ফয়জুলকে। ঘটনা তদন্তে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান হলেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবদুল গণি।
এদিকে হামলাকারী ফয়জুর রহমান ফয়জুলের বাবা-মা থানায় আত্মসমর্পণ করেছেন। গত রাত পৌনে ১১টার দিকে ফয়জুরের বাবা আতিকুর রহমান ও মা মিনারা বেগম সিলেট মহানগরের জালালাবাদ থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার বলেন, অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুর রহমানে বাবা-মা থানায় আত্মসমর্পণ করেছেন।
গতকাল বিকালে সিলেটের মেজরটিলার র্যাব ৯-এর কার্যালয়ে এক ব্রিফিংকালে র্যাব ৯-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আলী হায়দার আজাদ বলেন, ইসলামি জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েই অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায় মাদ্রাসাছাত্র ফয়জুল। হামলাকারী জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িতÑ এটি অনেকটাই নিশ্চিত। তবে তার কাছে থেকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার পুরো নাম ফয়জুর রহমান ফয়জুল। গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার জগদলে। বাবা আতিকুর রহমান মাদ্রাসার খ-কালীন শিক্ষক। ফয়জুল নিজেও মাদ্রাসায় দাখিল পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। তবে মাদ্রাসার নাম নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার চার চাচার মধ্যে দুজন কুয়েতে থাকেন, এক ভাইও কুয়েতপ্রবাসী।
হামলার সময় হামলাকারী একাই ছিল কিনাÑ এমন প্রশ্নে লে. কর্নেল আলী হায়দার আজাদ জানান, সাধারণত এমন ঘটনায় তারা একা থাকে না। নিশ্চয়ই অন্যরা ছিল, যারা কৌশলে পালিয়ে গেছে। এটি একটি চক্র। আমরা বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি। এ জন্য ফয়জুলের চাচা আবুল কাহারসহ তিনজনকে আটক করেছে র্যাব। তবে এখন পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে ফয়জুল সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায়নি। ফয়জুল সিলেটের জিন্দাবাজারের একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করত, সেটির স্বত্বাধিকারীকেও আটক করা হয়েছে। তবে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
শাবি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের রোষ থেকে শনিবার ফয়জুলকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে র্যাব। গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হওয়ায় তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, ইসলামের বিরুদ্ধে লেখালেখি করার কারণে অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলা চালায় সে। জাফর ইকবালের লেখা পড়ে তরুণরা নাস্তিক হচ্ছে বলে হামলাকারী ফয়জুল দাবি করেছে।
র্যাব জানায়, ফয়জুলকে পুলিশের মাধ্যমে আদালতে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। এ ব্যাপারে পুলিশ অধিকতর তদন্ত করবে, সঙ্গে র্যাবও একটি ছায়া তদন্ত করবে। র্যাব ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে।
এদিকে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে বাড়ি হলেও পরিবারের সঙ্গে শাবি ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী কুমারগাঁওয়ের শেখপাড়ায় থাকত ফয়জুল। রবিবার সেই বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসী জানান, ফয়জুল মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছে। সে মঈন কম্পিউটার নামে একটি দোকানে কাজ করত। ফয়জুলের বাবা মাওলানা আতিকুর রহমান সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পার্শ্ববর্তী টুকেরবাজারে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন।
ক্ষোভে উত্তাল শাবি
শাবি থেকে জিয়াউল ইসলাম জানান, জাফর ইকবালের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় উত্তেজনা বিরাজ করছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ে (শাবি)। সকাল সাড়ে নয়টা থেকে দফায় দফায় দিনভর বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া দিনব্যাপী শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি, কর্মচারী সমিতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ছাত্রলীগ, ছাত্রফ্রন্টসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতাকর্মী বিক্ষোভ প্রদর্শন করে হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলার প্রতিবাদে আজ বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালনের ঘোষণা দিয়েছে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন আহমেদ জানান, দুই ঘণ্টা কর্মবিরতির পাশাপাশি অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন শিক্ষকরা।
সকাল সাড়ে ৯টায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সামনে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিশ^বিদ্যালয়ের ২ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেন। বিক্ষোভ মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে সিএসই বিভাগের অধ্যাপক শহীদুর রহমান বলেন, ‘জাফর স্যার কখনই ইসলামবিদ্বেষী ছিলেন না। যদি তিনি ইসলামবিদ্বেষী হতেন, তা হলে দাড়ি-টুপি পরিহিত আমরা কেউই সিএসই বিভাগের শিক্ষক হতে পারতাম না। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলায় আজ জাফর ইকবালের এই পরিণতি।’
এদিকে বেলা ১১টায় বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করে শিক্ষক সমিতি। মানববন্ধনে বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ২ শতাধিক শিক্ষক অংশগ্রহণ করেন। একই সময়ে কর্মকর্তা সমিতি ও কর্মচারী সমিতির ব্যানারে মানববন্ধনে অংশ নেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। মানববন্ধন শেষে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ হাসানুজ্জামান শ্যামল বলেন, ‘অধ্যাপক জাফর ইকবাল মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একজন ধারক ও বাহক। তার ওপর হামলার মানে হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তিকে আজ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।’
দুপুর ১২টায় বিক্ষোভ মিছিল করে সম্মিলিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী জোট। বিক্ষোভ মিছিলটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সামনে থেকে শুরু হয়ে এক কিলোমিটার সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বঙ্গবন্ধু চত্বরে এসে সমাবেশ করে। একই বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জোটের বিক্ষোভ মিছিলের সঙ্গে যোগ দেন। একই সময় গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
দুপুর দেড়টায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট। মিছিলটি পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সামনে এসে সমাবেশে মিলিত হয়। পরে দুপুর ২টায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রলীগ। এ সময় ছাত্রলীগের শতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
বেশিরভাগ বিভাগে হয়নি ক্লাস-পরীক্ষা : হামলার ঘটনায় ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নেননি বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া শিক্ষকদের বড় একটি অংশ ক্লাস নেওয়ার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন বলে জানান।
মামলা দায়ের : হামলার ঘটনায় মামলা করেছে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। মামলা দায়েরের বিষয়টি জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করে বলেন, দায়েরকৃত মামলা নং-০৩, মূল ঘটনা উদ্ঘাটনে পুলিশ অঙ্গীকারবদ্ধ।
শিক্ষার্থীদের তিন দফা : জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনায় তিন দফা দাবি পেশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। দাবিগুলো হলোÑ হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে সঠিক তথ্য প্রকাশ, জড়িতদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত এবং ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং দ্রুততম সময়ে বিশ^বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের দাবি জানান তারা।
শাবি প্রেসক্লাবের কালো ব্যাজ ধারণ : এদিকে হামলার প্রতিবাদে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা দিনব্যাপী কালো ব্যাজ ধারণ করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন।
সিলেট নগরীতে প্রতিবাদ : অন্যদিকে ক্যাম্পাসের পাশাপাশি সিলেট নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বেশকিছু সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।
উল্লেখ্য, শনিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠান চলাকালে অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে ছুরিকাঘাত করে ফয়জুর রহমান। প্রথমে জাফর ইকবালকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। রাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিমানবাহিনীর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে আনা হয়। বর্তমানে সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন।
