বিশেষ সংবাদদাতা : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার উপদ্রব কোনভাবেই কমছে না। ২ ঘন্টা বিমান উড্ডয়নে ঢিলে হওয়ার পরও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ উদাসীন। অনেকটা গাছাট ভাব। বিএনপি-জামায়াত আর্শীবাদপুষ্ট এক সময়কার হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত বিমানবন্দরের ক্লিনিং ইজারাদার আব্দুল খালেকের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘একে ট্রেডার্স’-এর ক্লিনিং কাজে চরম অবহেলার দরুণ বিমানবন্দরে মশক উৎপাদনে সহাযতা হচ্ছে বলেও অনেকে বলে থাকেন। কারন একে ট্রের্ডাসের কর্মী বাহিনী ঠিকমতো বিমানবন্দরের ক্লিনিং কাজ করে না। কর্তব্যরত নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট এ ব্যাপারে তোরজোর করলেও তা ভেস্তে যাচ্ছে বার বার। বিমানবন্দরের ক্লিনিং ইজারাদার এক ট্রেডার্স দীর্ঘ ৯ বছর বিনা টেন্ডারে বিমানবন্দরের ক্লিনিং কাজ করার পর সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ টেন্ডার আহবান করে। টেন্ডারে একে ট্রেডার্স সর্বোচ্চ দরদাতা হবার পরও সংস্থার মেম্বার অপসের আর্শীবাদপুষ্ট হবার কারনে একে ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ দেয়া হয়।
এ তো গেল একে ট্রেডার্স-এর ক্লিনিং গাফিলতি। এর সাথে মশক বৃদ্বির জন্য যুক্ত হয়েছে শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন-১/২-এর সামনে যাত্রী নিরাপত্তা বেস্টনি যাকে বলে ক্যানপি- এই এলাকায় কমপক্ষে ৫০টি দোকান ইজারা দেয়া হয়েছে। আর এই দোকান ইজারা দিয়েছে গেছেন সিএএবির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এহছানুল গনি চৌধূরি। তিনি ক্যানপিতে পরিবহন সংগঠনের অফিসঘরগুলোকে দোকান বানিয়ে দিয়েছেন। আর এতে দোকান থেকে প্রতিনিয়ত ময়লা ও উচ্ছিষ্ট খাবারের সন্ধানে এক দিকে পাখির আগমনে বিমান উড্ডয়ন-অবতরনে ঝুকি বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্য দিকে দোকানের ময়লা আবর্জনায় মশকের বংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই টার্মিনাল ভবনের সামনে ক্যানপি ও ক্যানপির বাইরের দোকানপাট উচ্ছেদে অভিযান চালানো জরুরি বলে অনেকে মনে করেন।
একে ট্রেডার্সকে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে বিমানবন্দরের ক্লিনিং ইজারা দেয়ার জন্য দুদক ২ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে কৈফিয়ত পত্র তলব করে। সেই্ একে ট্রেডার্সই শাহজালাল বিমানবন্দরের সার্বিক ক্লিনিং কাজ করায় ময়লার আবর্জনার স্থূপের মধ্যে মশকের প্রজনন বৃদ্বি পাচ্ছে বলে বিশেষঙ্ঘরা মনে করছেন। এই প্রক্রিয়ার সাথে উপপরিচালক মোশাররফ হোসেনের সংশ্লিষ্টতার কথাও শোনা যায়।
খোজখবর নিয়ে জানা গেছে, বছরের এ সময়টাতে মশার উপদ্রব বেশি থাকে। মশার উৎপাতে বিমানবন্দরে আসা যাত্রী ও সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও প্রতি মুহূর্তে পড়ছেন বিড়ম্বনায়। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিমান দুই ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে এরই মধ্যে মশা নিধনে নেয়া হয়েছে বাড়তি ব্যবস্থা।
পুরো রাজধানীজুড়েই গত কিছুদিন ধরে মশার উৎপাত বেড়েছে অনেকাংশে। আর সেটা পৌঁছে গেছে বিমানবন্দরের মতো বড় একটি বিশেষ জায়গাতে।
বিমানবন্দরের ভেতরেই সন্ধ্যা হলেই শুরু হয় মশাদের মহড়া। কয়েল, অ্যারোসল এমনকি মশা নিধনকারী ওষুধও মশাদের আটকে রাখতে পারে না। পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়েই এ অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরেই ছিল। এ নিয়ে একাধিকবার বিমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বৈঠক হয়েছে বলেও জানা যায়। আর তারই ধারাবাহিকতায় ১ মার্চ বৃহস্পতিবার থেকে যৌথ উদ্যোগে মশা নিধন কার্যক্রমে নেমেছেন বলে জানিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। মশা নিধনে এরই মধ্যে বিমান কর্তৃপক্ষ একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। সকাল- বিকাল নিয়মিত মশা নিধনে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। সঙ্গে সিটি করপোরেশনও যোগ দিয়েছে।
মশা কমাতে শুধুই কি ওষুধ সমাধান নয়- জলাশয় পরিষ্কার করাটাও জরুরি। তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জলাময় পরিস্কারেও এখন নজর দিচ্ছে।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের সামনে , রানওয়েতে রয়েছে একাধিক জলাশয়। অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল ও ভিভিআইপি টার্মিনালের মধ্যবর্তী স্থানেও রয়েছে জলাশয়। এছাড়া বিমানবন্দরের সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে রানওয়ের চারপাশেও রয়েছে জলাশয়। বর্ষার মৌসুমে ছাড়াও সারাবছর এসব জলাশয়ে পানি থাকে। এসব জলাশয়ে পানিতে বংশবিস্তার করে মশা। নভেম্বর মাস থেকে প্রকট আকার ধারণ করে মশার উৎপাত।
এসব খোলা জায়গায় অতিরিক্ত মশা থাকে। ফলে এসব মশা ঢুকে পড়ে টার্মিনালের ভেতরেও। মশার উপদ্রবে যাত্রীদের পড়তে হয় ভোগান্তিতে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় যেসব উড়োজাহাজ বোডিং ব্রিজ না পেয়ে ‘বে’ এরিয়া থেকে যাত্রী ওঠায়, সেগুলোকে। খোলা জায়গার যাত্রী ওঠানোর সময় অতিরিক্ত মশা ঢুকে পড়ে উড়োজাহাজের ভেতরে।
গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার কথা ছিল মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের এমএইচ ১৯৭ নম্বর ফ্লাইটের। বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজটিতে দেড়শ’ যাত্রী ছিলেন। যাত্রীদের নিয়ে উড়োজাহাজটি রানওয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ উড়োজাহাজের ভেতরে থাকা মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে যান তারা। যাত্রীদের অভিযোগে আকাশে ডানা মেলার ঠিক আগমুহূর্তে আবার বে এরিয়ায় ফিরে আসে উড়োজাহাজটি। বে এরিয়ায় ফিরে আসার পর মশা নিধন শুরু হয়। কেবিন ক্রুরা ওষুধ ছিটিয়ে এ কাজ করতে থাকেন। ওষুধ ছিটানোর পর মশার দাপট কমে আসে। পরে প্রায় দুই ঘণ্টা দেরিতে রাত পৌনে তিনটার দিকে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি নিজ গন্তব্যের দিকে রওনা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, যাত্রী কিংবা তাদের স্বজনরা বিমানবন্দরে আসেন, আবার চলে যান। কিন্তু দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় এ দুর্ভোগের মধ্যেই কাজ করতে হয়। এ কারণে কোনো কোনো এলাকায় দিনেও কয়েল জ্বালাতে হয়। মশার কামড়ে মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তো আছেই।
বিমানবন্দরে আগত এক যাত্রীর স্বজন মিনহাজ জানান, গত তিনদিন আগে বন্ধুকে রিসিভ করতে এখানে এসেছিলাম। তখন সন্ধ্যার সময় ছিল। বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু মশার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়েছি। টার্মিনালের সামনে বসে থাকতেই একঝাঁক মশা মাথা থেকে পা অবধি যেন ঘিরে ফেলে। অস্থির হয়ে স্থান ত্যাগ করে দাঁড়িয়েছি। আমার বন্ধুর বের হতে দেরি হওয়ায় আরো কষ্ট হয়েছে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে।
মিনহাজের মতো আরেক যাত্রীর স্বজন স্নেহা জানান, গত পরশু রাত ১১টায় আমার ভাইয়া ওমান থেকে আসার কথা ছিল। কিন্তু কোনো এক কারণে আসা হয়নি। আজ আসবে তাই এখন তাকে রিসিভ করতে এলাম। এখানে তো কোথাও বসার মতো জায়গা নেই। আর ভেতরে যাওয়ার মতো অবস্থাও নেই। মা, ভাবি আরো কয়েকজন ভাইয়াকে রিসিভ করতে এসেছি। আজও তাই। রাতের ওই সময়ে মশার যে অবস্থা। মনে হচ্ছিল উঠিয়ে নিয়ে যাবে। মশার যন্ত্রণায় এক মিনিটও কোথাও দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি।
এদিকে সুমন নামের নিরাপত্তাকর্মীও মশার উপদ্রবের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, দিনের বেলায় তুলনামূলক কম উপদ্রব থাকলেও রাতে অস্থির করে ফেলে। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে ডিউটি করা সম্ভব হয় না। চারপাশে এত মশা। খুব যন্ত্রণায় ভুগতে হয় সারাক্ষণ। আর আমার ডিউটি বেশিরভাগ সময় রাতেই থাকে। তবে এখন তো কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ওষুধ দিচ্ছে। জানি না এই উপদ্রব থেকে কবে বাঁচতে পারবো।
