নিউজ ডেক্স : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সেবার মান নিয়ে যাত্রীদের আক্ষেপের শেষ নেই। বিদেশের বিমানবন্দরের সঙ্গে তুলনা করে আফসোস করাই যেন নিয়তি। যাত্রীদের অভিযোগের প্রতি বিবেচনা রেখে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বমানের সব সুযোগ-সুবিধাসংবলিত একটি টার্মিনাল ভবন হচ্ছে শাহজালালে। স্বপ্নের সেই থার্ড (তৃতীয়) টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়বে আড়াই গুণ। ফলে তিনটি টার্মিনাল দিয়ে বছরে শাহজালালের যাত্রী পারাপারে সক্ষমতা ৮০ লাখ থেকে বেড়ে দুই কোটিতে দাঁড়াবে।
২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদন হলেও আইনি জটিলতাসহ নানা কারণে তা আটকে যায়। অবশেষে আগামীকাল শনিবার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র জানায়, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে এই তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে। তিন তলার এ টার্মিনাল ভবনের আয়তন হবে দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার, লম্বা ৭০০ মিটার এবং চওড়ায় ২০০ মিটার। এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে জাপানের মিত্সুবিশি ও ফুজিটা এবং কোরিয়ার স্যামসাং এই তিনটি প্রতিষ্ঠান তৃতীয় টার্মিনাল ভবন নির্মাণকাজ করছে। থার্ড টার্মিনালের নকশা করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্থপতি রোহানি বাহারিন, যিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনালের নকশা করে বিশ্ব দরবারে খ্যাতি কুড়িয়েছেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, ‘বিমানবন্দর একটা দেশের ড্রয়িংরুমের মতো। একটা দেশে ঢোকার আগে বিদেশিরা বিমানবন্দর দেখেই ওই দেশ সম্পর্কে প্রথমে ধারণা নেন। আমাদের দেশে অনেক উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু একটা সুন্দর এয়ারপোর্ট নেই। ফলে নতুন এ উদ্যোগ খুই দরকার হয়ে পড়েছিল।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আমাদের একটা সুন্দর বিমানবন্দর হবে। আমরা হিথরো, জন এফ কেনেডি, চাঙ্গি এয়ারপোর্ট দেখেছি। সব কিছু দেখেই আমরা একটি অত্যাধুনিক বিমানবন্দর চাচ্ছি। এর অংশ হিসেবেই থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ হতে নেওয়া। এটি চার বছরের প্রকল্প হলেও তা সাড়ে তিন বছরেই শেষ হবে বলে আশা করছি। ২০২৩ সালে জুনের মধ্যেই আমরা এটির কাজ শেষ করতে পারব। এটির নির্মাণ শেষ হলে মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হবে।’
বেবিচকের তথ্য মতে, তৃতীয় টার্মিনালে থাকবে ২৬টি বোর্ডিং ব্রিজ। প্রথম ধাপে চালু করা হবে ১২টি বোর্ডিং ব্রিজ। উড়োজাহাজ রাখার জন্য ৩৬টি পার্কিং বে। বহির্গমনের জন্য ১৫টি সেলফ সার্ভিস চেক ইন কাউন্টারসহ মোট ১১৫টি চেক ইন কাউন্টার থাকবে। এ ছাড়া ১০টি স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট কন্ট্রোল কাউন্টারসহ থাকবে ৬৬টি ডিপারচার ইমিগ্রেশন কাউন্টার। আগমনীর ক্ষেত্রে পাঁচটি স্বয়ংক্রিয় চেক ইন কাউন্টারসহ মোট ৫৯টি পাসপোর্ট ও ১৯টি চেক ইন অ্যারাইভাল কাউন্টার থাকবে। এর বাইরে টার্মিনালে ১৬টি আগমনী ব্যাগেজ বেল্ট স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগেজের জন্য চারটি পৃথক বেল্ট স্থাপন করা হবে। গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে মাল্টিলেভেল কার পার্কিং ভবন নির্মাণ করা হবে। এতে ১৩৫০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।
সূত্র জানায়, তৃতীয় টার্মিনাল ভবনের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ পথ ও উড়াল সেতু নির্মাণ করা হবে, যার মাধ্যমে মেট্রো রেল ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ ব্যবস্থা থাকবে। এতে থাকবে আন্তর্জাতিকমানের অত্যাধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা। তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের প্রথম ধাপের সঙ্গে বর্তমান টার্মিনাল ভবনগুলোর আন্তযোগাযোগ ব্যবস্থা থাকবে না। তবে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে কানেকটিং করিডরের মাধ্যমে পুরনো টার্মিনাল ভবনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। বর্তমানে চালু ভিভিআইপি কমপ্লেক্সটি ভেঙে ফেলা হবে। তৃতীয় টার্মিনালে স্বতন্ত্র কোনো ভিভিআইপি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে না। তবে টার্মিনাল ভবনের ভেতরে দক্ষিণ পাশে সর্বাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ভিভিআইপি সময় কাটানোর জায়গা থাকবে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বলেন, ‘সরকারের স্বপ্নের প্রকল্প থার্ড টার্মিনালের কাজ শুরু হচ্ছে। এর নির্মাণকাজ শেষ হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে এবং ভবিষ্যতে আরো অনেক দেশের বিমান সংস্থার উড়োজাহাজ এ দেশের বিমানবন্দর দিয়ে চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বেবিচকের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং আকাশপথে যাত্রীদের আরো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হবে।’
জানা যায়, শাহজালালের উত্তর পাশে রয়েছে আমদানি ও রপ্তানি কার্গো ভিলেজ। এ ভিলেজকে সর্বাধুনিক সুবিধাসম্বলিত করে গড়ে তোলার উদ্যোগ আছে একই সঙ্গে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার কমোডর (অব.) এম ইকবাল হোসেন বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে এয়ারপোর্টের আধুনিকায়নে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। নতুন থার্ড টার্মিনাল হলে যদিও তা কিছুটা কাটিয়ে ওঠা যাবে। কিন্তু থার্ড টার্মিনাল না হওয়া পর্যন্ত আগামী চার বছরে যে হারে যাত্রী বাড়বে তা সামাল দিতে এখন থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য আরো নতুন বিমানবন্দর স্থাপনের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।’
