একুশে বার্তা ডেক্স : ৬ আগস্ট সোমবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’-এর খসড়ায় যাত্রী নয়, বাস মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবহন ও আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা ছিল বিদ্যমান আইনের চেয়ে প্রস্তাবিত আইনে সাজা আরও কঠোর হবে। কিন্তু আইনটিতে জনগণের চেয়ে বাস মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থকে বড় করে দেখা হয়েছে। এটি জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের আগেই যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে পাস করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ : আইনটি নিয়ে আদালতে রিট করেছিলেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তিনি সোমবার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সড়ক পরিবহন আইন যেভাবে অনুমোদন দেয়া হয়েছে তাতে আদালত ও জনসাধারণের দাবির প্রতিফলন ঘটেনি। এটি যাত্রীদের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে তা এখন দেখার বিষয়। আদালত সাজার মেয়াদ ৭ বছরের বেশি নির্ধারণ করার পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন, যা রোববার আমি মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে এ সংক্রান্ত কাগজপত্র দিয়ে এসেছিলাম। শিক্ষার্থী, জনগণ ও আদালতের চাওয়া ছিল আইনে সাজা আরও কঠোর হবে। যাতে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। কিন্তু প্রস্তাবিত আইনে যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। এটি কার্যকর হলে মূলত বাস মালিক ও শ্রমিকদের স্বার্থই রক্ষা হবে। আমাদের আহ্বান, আইন চূড়ান্ত করার আগে সংসদে বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে। সেখানে এমপিরা যেন নিরাপদ সড়কের কথা বিবেচনা করে আইনের খসড়া পুনর্বিবেচনা করেন।
ড. শামসুল হক : পরিবহন ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, সবার প্রত্যাশা ছিল এতে দৃষ্টান্তমূলক সাজার কথা থাকবে। কিন্তু দেখা গেল দুর্ঘটনার সাজা ৫ বছর করা হয়েছে। অথচ উন্নত বিশ্বে এ ধরনের অপরাধে কোথাও ১০ বছর আবার কোথাও ১৪ বছর পর্যন্ত সাজার বিধান রয়েছে। সাজার পরিমাণ কমাতে কমাতে এমন পর্যায়ে এসেছে যে এটাকে এখন আর দৃষ্টান্তমূলক সাজা বলা চলে না। এতে বাস মালিক-শ্রমিকদের স্বার্থই প্রাধান্য পেয়েছে। এতে নিরাপদ সড়ক ও যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে বলে আমার মনে হয় না। এটি চালকসর্বস্ব আইনে পরিণত হয়েছে। ড. শামসুল হক বলেন, দুর্ঘটনায় সব সময় চালক দায়ী নন। অনেক ক্ষেত্রে পথচারী বা যাত্রীও দায়ী থাকেন। আইনে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যে বা যারাই দায়ী হোক, সবারই শাস্তি নিশ্চিত হতে হবে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) : এ আইনে সাধারণ মানুষের দাবির প্রতিফলন ঘটেনি বলে অভিযোগ করেছেন নিরাপদ সড়ক চাইর (নিসচা) চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। সোমবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আমরা এ আইনের ওপর যে পরামর্শ দিয়েছিলাম তা গ্রহণ করা হয়নি। সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছিলাম ১০ বছর, হাইকোর্টের নির্দেশনা ছিল ৭ বছর কিন্তু করা হয়েছে ৫ বছর। সর্বোচ্চ শাস্তির কথা বলা হলেও সর্বনিু শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি। এতে শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালক-মালিকের জেল-জরিমানা সমাধান নয়। দুর্ঘটনার কারণ জানার পরে তা লাঘবে প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, ত্র“টি সংশোধন ও চালককে দক্ষ করে গড়ে তুলতে ইন্সটিটিউশন গড়ে তোলা। দরকার পরিকল্পনা ও বাজেট। নিসচার চেয়ারম্যান বলেন, আইনের আওতায় ক্ষতিপূরণের জন্য যে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হবে সেখানে সরকার, চালক ও মালিকের প্রতিনিধি থাকলেই চলবে না সেখানে থাকতে হবে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের প্রতিনিধি। এ আইন বাস্তবমুখী ও কার্যকর করতে হলে আরও সংশোধন করা প্রয়োজন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি : প্রস্তাবিত আইনে যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা হয়নি অভিযোগ করে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী সোমবার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ণে সরকারের দেয়া অঙ্গীকার ও জনগণের প্রত্যাশা এ আইনে পূরণ হয়নি। এ আইন দিয়ে চালকদের অমানবিক ও বেপরোয়া মানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়। পুরনো আইনে মালিক-শ্রমিক স্বার্থরক্ষায় মালিক-শ্রমিক-সরকার মিলেমিশে গণপরিবহন পরিচালনার কমিটি গঠন করায় এ সেক্টরে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, চাঁদাবাজি, নৈরাজ্য চরমে পৌঁছেছে। প্রস্তাবিত নতুন আইনে যাত্রীস্বার্থ উপেক্ষা করে অর্থাৎ যাত্রীর প্রতিনিধিত্ব আইনে অন্তর্ভুক্ত না করে পূর্বের ন্যায় মালিক-শ্রমিক-সরকার মিলেমিশে গণপরিবহন পরিচালনা, বাস ভাড়া নির্ধারণ, আঞ্চলিক পরিবহন পরিচালনা কমিটি (আরটিসি), জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল, সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব ক্ষেত্রে যাত্রীর প্রতিনিধিত্ব তথা জনপ্রতিনিধিত্ব উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাখা হয়নি। এটি কার্যকর করতে হলে আরও সংশোধন প্রয়োজন।
Share this:
- Click to share on Facebook (Opens in new window)
- Click to share on Twitter (Opens in new window)
- Click to share on LinkedIn (Opens in new window)
- Click to share on Tumblr (Opens in new window)
- Click to share on Pinterest (Opens in new window)
- Click to share on Pocket (Opens in new window)
- Click to share on Reddit (Opens in new window)
- Click to share on Telegram (Opens in new window)
- Click to share on WhatsApp (Opens in new window)
- Click to print (Opens in new window)
