অমির নারী পাচারের তালিকা পুলিশের হাতে : বাবা-পোলা মিলে আদম পাচার -সোন চোরাচালান-হুন্ডি পাচার জমজমাট : মালয়েশিয়া- দুবাইতে প্রমোদখানা!আদম তোফাজ্জল আত্মগোপনে

নিউজ ডেক্স :অভিনেত্রী পরীমণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামি তুহিন সিদ্দিকী অমি ও নাসির ইউ মাহমুদ সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য আসছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জিজ্ঞাসাবাদে। বিশেষ করে অমির জীবনাচরণ ও নারী পাচারসহ নানা অপকর্মের তথ্য বিস্মিত করেছে তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে। সংস্থাগুলো জানিয়েছে, মালয়েশিয়া ও আরব আমিরাতের দুবাইয়ে মানব পাচারকারী ১০ সদস্যের এক চক্রের অন্যতম সদস্য অমি। চাকরি ও নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার নাম করে তিনি মালয়েশিয়া ও দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে নারী পাচার করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরেই। বিপুলসংখ্যক নারী পাচার করার সেই তালিকাও এসেছে পুলিশের হাতে। এমনকি দুবাইতে একটি দ্বীপ কিনে সেখানে প্রমোদখানাও তৈরি করেছেন তিনি। শহরটিতে আছে তার একাধিক বাড়িও।

এদিকে বোট ক্লাবের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর অমির আশকোনায় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে গেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অমির বাবা আদম তোফাজ্জলসহ অন্য স্বজনরাও গেছেন আত্মগোপনে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, রাজধানীর আশকোনা ও উত্তরখানে বেশ কয়েকটি বাংলো বাড়ি আছে অমির। সেখানে দেশি-বিদেশি অতিথিদের আনাগোনা চলে। স্থানীয়রা জানায়, বাবা-ছেলের বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালান ও হুন্ডি ব্যবসার অভিযোগ আছে। আশকোনায় দেড় বিঘা জমির ওপর সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন অমি। তাছাড়া আশকোনা হুদা মসজিদ রোডে পাঁচ কাঠার ওপর ষষ্ঠতলার আলিশান বাড়ি রয়েছে। এ বাড়ির সংলগ্ন পাঁচ কাঠা জমি, দক্ষিণখানের দৌবাইদা এলাকায় দেড় বিঘা জমির ওপর সিঙ্গাপুর নামে আরেকটি ট্রেনিং সেন্টার, উত্তরখানের হেলান মার্কেটসংলগ্ন বিশাল গেস্ট হাউজ, টাঙ্গাইলের কটিয়ার বাইপালে বিশাল বাড়ি, রেস্টুরেন্ট, ঢাকার উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে দুটি আলিশান ফ্ল্যাটসহ বিপুলসংখ্যক সম্পদ রয়েছে অমির।

ডিবির কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, অমির আরেক নাম র‌্যাডিসন অমি। ঢাকার র‌্যাডিসন ওয়াটার ব্লু হোটেলে তার নামে সবসময় বেশকিছু কক্ষ বুকিং থাকে। সেখানে দেশি-বিদেশি অতিথি রাখেন। র‌্যাডিসন হোটেলে অমির মেহমান হয়ে প্রায়ই আসেন এএস খান নামে একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী। এএস খান মূলত অমির মানব পাচার ও হুন্ডি ব্যবসার সহযোগী। তার মাধ্যমেই বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণীকে পাচার করেছেন তিনি।

জিজ্ঞাসাবাদে সম্পৃক্ত ডিবি কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অমি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে চলেছেন। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ১০ প্রতিষ্ঠান (সিন্ডিকেট) তৈরি করেছেন। অমি সেই সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক। তার বাবা তোফাজ্জল হোসেন ওরফে আদম তোফাজ্জল ইন্ধনদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। তাদের দুর্নীতির কারণেই ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী নিয়োগ স্থগিত করে দেয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। ক্ষমতাশালী এ সিন্ডিকেটভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেড, প্যাসেজ অ্যাসোসিয়েটস, সানজারি ইন্টারন্যাশনাল, আল ইসলাম ওভারসিজ, ক্যারিয়ার ওভারসিজ, রাব্বী ইন্টারন্যাশনাল, ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল, আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, প্রান্তিক ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম ও এইচএসএমটি হিউম্যান রিসোর্স। তার মধ্যে এইচএসএমটি হিউম্যান রিসোর্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরিফুল ইসলাম সম্পর্কে অমির ভগ্নিপতি। অমি নিজ ভগ্নিপতির প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ক্যাথারসিস ও আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নারী পাচার করেছেন।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, অমির অর্থ ও মানব পাচারের অন্যতম সহযোগী পলাশ। অমির স্কুলজীবনের বন্ধু পলাশ নিজেকে এইচএসএমটি হিউম্যান রিসোর্সের কর্মকর্তা পরিচয় দেন। পলাশ অমির সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করেন। তার মাধ্যমে অমি ও তার বাবা তোফাজ্জল হোসেন অবৈধ হুন্ডি এবং অর্থ পাচারের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। অমির অবৈধ আয়ের ক্যাশিয়ার হিসেবেও কাজ করেন পলাশ। অমির আরও দুই সহযোগী কাদের ও জনির বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন গোয়েন্দারা। তারা বিপুলসংখ্যক যুবকের সমন্বয়ে একটি নারী পাচার সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। তারা প্রথম নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত তরুণীদের টার্গেট করে। তাদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে। বিয়ের পর আশকোনা ও উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া নেয়। সেখানে তিন-চার মাস ওইসব তরুণীকে মদ ও মাদকে আসক্ত করে। কৌশলে ওইসব বাসায় বিপুলসংখ্যক বন্ধু নিয়ে আড্ডাখানা তৈরি করে। একপর্যায়ে ঝগড়ার নাটক সাজিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় তার কথিত স্বামী। পরে অমি, কাদের ও জনি এসব তরুণীকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, মালয়েশিয়ার সানওয়ে কলেজসহ বিভিন্ন কলেজে ভর্তির নামে বিপুলসংখ্যক তরুণীকে মালয়েশিয়া পাচার করেন অমি ও তার সহযোগীরা। মালয়েশিয়ার বিখ্যাত প্যাভিলয় শপিং মল ও দুবাইয়ে অমির বেশকিছু সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। সেখানে এসব তরুণীকে কিছুদিন রেখে বিভিন্ন পার্টিতে নিয়ে যান। তাদের দিয়ে কিছুদিন ব্যবসা করানোর পর মালয়েশিয়ায় অন্য দালাল চক্রের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করে এই চক্র। সূত্র দেশ রূপান্তর