অমির বৈভব ও অপকর্মে পুলিশও বিস্মিত

দেশ রুপান্তর : ঢাকা বোট ক্লাবে অভিনেত্রী পরীমণিকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া তুহিন সিদ্দিকী অমি কম বয়স থেকেই বেপরোয়া। রাজধানীর দক্ষিণখান, উত্তরা ও আশকোনা ছিল তার বিচরণক্ষেত্র। পুলিশ বলছে, নারী পাচার করাসহ নানা অপকর্মে জড়িত অমি। এসব অপকর্মের পেছনে সব ধরনের ইন্ধন জুগিয়েছেন তার বাবা তোফাজ্জল হোসেন। প্রায় প্রতিমাসেই বদলাত গাড়ি। রিমান্ডে থাকা অমি তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। তাছাড়া মামলার আরেক আসামি নাসির ইউ মাহমুদও অনেক রকমের তথ্য দিয়ে চলেছেন। তাদের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করছে পুলিশ। বুধবার রাতেও আশকোনা অমিদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টারে অভিযান চালানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ক্যাশিয়ার সাইফুলকে গ্রেপ্তার করার জন্য এ অভিযান চালানো হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে অমি গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তিনি পলাতক বলে জানিয়েছে সেখানকার দারোয়ান।

তদন্তকারী সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে একযোগে তদন্তে নেমেছে পুলিশের পাঁচটি ইউনিট। সাভার, উত্তরা, দক্ষিণখান, গুলশান থানা ও ডিবি সমন্বিতভাবে এ ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে মাঠে নেমেছে। বুধবার রাতে হঠাৎ গুলশানের অল কমিউনিটি ক্লাব সংবাদ সম্মেলনে পরীমণির বিরুদ্ধে মদ খেয়ে ভাঙচুর করার অভিযোগের পর পুলিশকে নতুন কৌশলে তদন্ত করতে হচ্ছে। এখন আর একতরফা পরীমণির অভিযোগকে প্রাধান্য দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ডিবি বলছে, এ ঘটনায় পরীমণির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পরীমণির মামলা ও তার বক্তব্য গরমিল পাচ্ছে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, বোট ক্লাবের ঘটনার পর থেকে নাসির ও অমির বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে বোট ক্লাবের পরীমণিকে হত্যা ও ধর্ষণচেষ্টা, অমির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে মদ ও ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় উত্তরা থানায় মাদক ও আশকোনার ট্রেনিং সেন্টার থেকে পাসপোর্ট জব্দের ঘটনায় মানব পাচারের মামলা। তাছাড়া অল কমিউনিটি ক্লাবে ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা ও জিডি তদন্তে পুলিশের পাঁচটি ইউনিট মাঠে সক্রিয়।

পুলিশ বলছে, অমির বাবা তোফাজ্জল আশকোনায় দেড় বিঘা জায়গার ওপর সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার। এ ট্রেনিং সেন্টারটি বানানো হয়েছে সিঙ্গাপুরের আদলে। জায়গার দাম ৮ কোটি টাকা আর এটি তৈরি করতে অর্থ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। আলহুদা মসজিদের কাছাকাছি পাঁচ কাঠা জমির ওপরে একটি ছয়তলা ভবন ও আরেকটি খালি প্লট। এ দুটি জায়গার মূল্য ৯ কোটি টাকা। আইনোজবাগে আছে দুই বিঘা জমির ওপরে একটি গরুর খামার। যার মূল্য ১০ কোটি টাকা। দক্ষিণখান জোবাইদায় দেড় বিঘা জমির ওপরে সিঙ্গাপুর ট্রেনিং সেন্টার নির্মিত। জমি ও ট্রেনিং সেন্টারের নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে ৭ কোটি টাকা। তার সঙ্গে আছে এক বিঘা খালি যার মূল্য ৫ কোটি টাকা। উত্তরখান হেলাল মার্কেটে আছে গেস্ট হাউজ, সুইমিংপুল ও বাগানবাড়ি। এগুলো অমি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। মদ, জুয়া ও নৃত্যের আসর বসে নিয়মিত। উত্তরায় ১৫নং সেক্টরে তিনটি খালি প্লট আছে যার মূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা। উত্তরা ৪নং সেক্টরে আছে অমির একটি ব্যক্তিগত ফ্ল্যাট, যার মূল্য ২ কোটি টাকা। টাঙ্গাইলের করটিয়ার সামনে বাইপাস মসজিদ, মাদ্রাসা, খাবার হোটেল, হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। আরও রয়েছে একটি বিশাল প্রাসাদ। অমির একটি প্রাডো, একটি মার্সিডিজ গাড়ি, একটি লেক্সাস হরি গাড়ি এবং একটি কেয়া জিপ গাড়ি। তার আরও ১০-১৫টি গাড়ি রয়েছে। অমির মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম রয়েছে। নামে-বেনামে আছে অঢেল সম্পদ এবং আছে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার আদম পাচারের একাধিক লাইসেন্স। অমির ১০-১২ দেশের পাসপোর্টে ভিসা লাগানো থাকে। আশকোনা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে জানান, আদম তোফাজ্জলের আশকারা পেয়েই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন অমি। নিত্যনতুন গাড়ি পরিবর্তন করাই ছিল তার নেশা। তাছাড়া অমির বাবা আদম তোফাজ্জলও গাড়ি পরিবর্তনে ছেলেরও চেয়ে পিছিয়ে নেই। অমি ও তোফাজ্জলের বডিগার্ড বাবুল, সেলিম, ক্যাশিয়ার হাফেজ সাইফুল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, মশিউর রহমান পলাশ (অমির ক্যাশিয়ার), পলাশের ভাই পারভেজ, জয় (মেয়ে কালেকশন করে), পলাশের মামাতো ভাই মির্জা জনি, এজেন্ট শামীম, সুমন (হিসাব শাখা নিয়ন্ত্রণ করে), নরসিংদীর মাসুদ, আওলাদ, তার ভাই আল-আমিন তোফাজ্জল ও অমির আদ্যপান্ত সবকিছুই জানে। তারা আরও জানান, আদম তোফাজ্জল ও অমি এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উকিল বাবা সেজে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করে রাখেন। তার মধ্যে আলম মেম্বার, তোফাজ্জল চেয়ারম্যান ও জব্বারের ছেলের বিয়ের উকিল বাবা হয়েছেন।

মামলার বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, সাভার থানায় কমিউনিটি ক্লাবের ঘটনাটি আমাদের গুলশান টিমের এলাকায়। আমরা বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই আলোচনা করব। এ বিষয়ে যেকোনো ধরনের অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা জেনেছি ৮ জুন গুলশানে অলক্লাবে পরীমণি গিয়েছেন। ৯৯৯-এর একটি ফোনে ওখানকার ঘটনাটি জানতে পারে পুলিশ। তবে পরে এটা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আমরা এটি নিয়ে কাজ করব। এ সময় বোট ক্লাবের ঘটনায় পরীমণিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটি মামলা হয়েছে ঢাকা জেলাতে। যেহেতু মামলাগুলো চলমান, পরীমণি অবশ্যই প্রয়োজনে সব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আসবেন। জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত শেষে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা যাবে।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, সাভার থানায় যে মামলা হয়েছে, সেই মামলার এজাহারের বর্ণনার সঙ্গে পরীমণির বক্তব্যের মিল পাচ্ছেন না তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ কারণে পরীমণির অভিযোগ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তদন্তকারীরা এরই মধ্যে ওই রাতের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের পাশাপাশি ঢাকা বোট ক্লাবের দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানতে চাইবেন পরীমণির কাছেও। তবে প্রাথমিক তদন্তে বোট ক্লাবের ঘটনার সঙ্গে পরীমণির অভিযোগের অনেক কিছু মিলছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত সম্পর্কে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফি বলেন, আমরা প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য যা যা করণীয় সবই করছি। সেই রাতে ক্লাবে কী ঘটেছিল, নিবিড়ভাবে তদন্ত করে আমরা সেই সত্য তুলে আনতে চাই। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য আমরা আদালতে জমা দেব। তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাভার থানায় করা মামলায় পরীমণি বলেছেন, সেই রাতে পূর্ব পরিচিত অমিসহ কয়েকজন পরিকল্পিতভাবে দুই মিনিটের কাজ আছে বলে পরীমণিকে ঢাকা বোট ক্লাবের সামনে নিয়ে যান। সেখানে তারা গাড়িতে অপেক্ষা করেন। ছোট বোন বনি বারের পাশের একটি টয়লেট ব্যবহার করতে ভেতরে প্রবেশ করেন। কিন্তু ঢাকা বোট ক্লাবের প্রবেশপথ ও অভ্যর্থনা কক্ষে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, বোট ক্লাবের সামনে গাড়ি এসে থামার সঙ্গে সঙ্গেই স্বাভাবিকভাবেই পরীমণি ও তার সঙ্গীরা ক্লাবের ভেতরে প্রবেশ করেন। পরীমণি ক্লাবে প্রবেশ করেন ১২টা ২২ মিনিটে আর ক্লাব থেকে তাকে ধরাধরি করে বের করা হয় ১টা ৫৯ মিনিটে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই ১ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট ঢাকা বোট ক্লাবের ভেতরে কী করেছেন পরীমণি। তিনি কি স্বেচ্ছায় মদ খেয়েছেন নাকি জোরপূর্বক খাওয়ানো হয়েছে তদন্তকারীরা সেটাই বের করার বিষয়ে প্রাধান্য দিচ্ছে। এ ঘটনায় বর্তমানে সাত দিনের রিমান্ডে থাকা অমি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সেই রাতে পরীমণিসহ অন্যরা ক্লাবের ভেতরে গিয়ে নাসির ইউ মাহমুদসহ একসঙ্গে মদপান করেন। শেষে একটি বোতল নেওয়া নিয়ে প্রথমে একজন কর্মচারীর সঙ্গে পরীমণি বিতণ্ডা করেন। সেই বিতণ্ডায় যোগ দেন নাসির ইউ মাহমুদসহ আরও কয়েকজন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পরীমণিকে চ্যাংদোলা করে অচেতন অবস্থায় বের করে তার গাড়িতে তোলা হচ্ছে। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে নাসির ও অমি জোরপূর্বক মদ খাওয়ানোর বিষয়টি অস্বীকার করে তারা শুধু তাকে ঠেলা-ধাক্কা ও চড়-থাপ্পড় মারার কথা স্বীকার করছেন। এমনকি অমি ডিবিকে উল্টো অভিযোগ করেন, বোট ক্লাবে যাওয়ার আগে পরীমণির বনানীর বাসায় বসেই এক বোতল মদপান করেন তারা সবাই। এ সময় বাসাতে নাট্যপরিচালক চয়নিকা চৌধুরীও ছিলেন। অমি আরও জানিয়েছেন, বছর দুয়েক আগের পরিচয় সূত্র ধরে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়েছে পরীমণির। তার দক্ষিণখানের বাগানবাড়িতেও পরীমণির যাতায়াত ছিল।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দুটি ঘটনারই সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পরীমণি। তিনি সাংবাদিকদের গতকালও বলেছেন, অল কমিউনিটির অভিযোগ এতদিন পর কেন বলা হচ্ছে? ঢাকা বোট ক্লাবের ঘটনা না ঘটলে কি এটা বলা হতো না? আমি যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, তাহলে তারা কেন এতদিন চুপ করে ছিলেন। আমি যখন অভিযোগ করলাম, তখন অল কমিউনিটি ক্লাব কথা বলছে। বোঝাই যাচ্ছে, আসল ঘটনার ফোকাস ঘোরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।