আওয়ামী ঘাতকেরা ২০০৬ ’১২ ’১৮ : কোটা সংস্কারের দাবির প্রেক্ষিতে কোটা বাতিল নিয়ে এখন হয়েছে আমলাতান্ত্রিক কমিটি

আলী মামুদ : প্রকাশ্য রাজপথে আবার মাসলম্যানদের হাতে তরুণদের প্রহৃত হতে দেখা গেল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বা ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ের চত্বরে  এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে সাম্প্রতিক এমন ঘটনা ঘটলো নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের চোখের সামনেই। এসব দৃশ্য ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টনের বহুল আলোচিত লগি-বৈঠার আঘাতে ৬ যুবকের মৃত্যুর ঘটনাটি নতুন করে আলোচনা এনেছে। একইভাবে আলোচনায় এসেছে ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর সকাল-সন্ধ্যা অবরোধের সময় জগন্নাথ বিশ্ববদ্যালয় প্রাঙ্গণে পুরনো ঢাকার দর্জি দোকানি পথচারী তরুণ বিশ্বজিৎ দাসকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা। গত ২ জুলাই ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একজন ছাত্রীর ওপর কয়েকজন তরুণের সংঘবদ্ধ হামলার ছবি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা (দৈনিক যুগান্তর) হয় ভাজের নিচে। একই পৃষ্ঠায় ভাজের ওপরে সেদিন ছাপা হয় তখন বাংলাদেশ সফরকারী জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতোরেস ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের ছবি। কক্সবাজারে কুতুপালংয়ে শরণার্থীদের কথা শুনছিলেন তারা।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের লগি বৈঠার আঘাতে নিহতের ঘটনায় জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সাথে সাথে তিনি জনগণের কল্যাণ এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে কার্যকর নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কাক্সিক্ষত পরিবেশ তৈরিতে বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্রে কাজ করার আহবানও জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া বিউটেনিসও সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টিতে সহায়তা না করার জন্য রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশের এক বিশ্বখ্যাত শিল্পী সুলতানের চিত্রকর্মে বহু আগের পেশীবহুল মানুষের চর দখলের দৃশ্য দেখা যায়। একই ধরনের দৃশ্য এখন দেখা যাচ্ছে কথিত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বিষয়ক ইস্যুতে এমন দৃশ্যের সৃষ্টি হলেও এর আগেও এমন মাসলম্যানশীপ তৎপরতা চলেছে। অথচ বিরোধীদল বা ছাত্র সংগঠনের সমাবেশ করতে দেয়া হয় না। এমনকি প্রবীণ ব্যক্তিত্বদের সংগঠন শত নাগরিক কমিটির সদস্যদের কয়েক মিনিটও দাঁড়াতে দেয়নি পুলিশ শহীদ মিনারে।

ফিরে দেখা : ফিরে দেখলে দেখা যায়, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ১৪ দলীয় জোটের সমর্থকদের লগি বৈঠার আঘাতে ৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। ঘটনাটি ঘটেছিল রাজধানীর পল্টন এলাকায়। এতে নিহত হন মুজাহিদুল ইসলামসহ ৬ জন। ২৯ অক্টোবর ২০০৬ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকে লেখা হয়- বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে একটি সমাবেশস্থলে ১৪ দলের নেতা কর্মীরা হামলা চালায়। এতে ৩ জনের মৃত্যু ঘটে। পুরানো ঢাকার লালবাগ এলাকার এক নেতার সমর্থনে লগি ও লাঠি হাতে বিশাল মিছিল নিয়ে পল্টন মোড়ে এসেছিলেন বলে আমার দেশ পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছিল। ভারতের হিন্দুস্থান টাইমস-এর রিপোর্টে তখন উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতা ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়াতেও এই বিষয়টি তখন প্রাধান্য পেয়েছিল। : পল্টনের ঘটনার ৬ বছর পর অনেকটা একই ধরনের নৃশংস বা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছিল ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর। ঢাকার পল্টন এলাকা থেকে ৩/৪ কিলোমিটার দক্ষিণে সদর ঘাটের কাছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। এই ঘটনায় নৃশংসভাবে নিহত হন এক তরুণ। তার নাম বিশ্বজিৎ দাস। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নামধারী কিছু তরুণ লাঠি (রড) দিয়ে পিটিয়ে তাকে হত্যা করে। বিশ্বজিতের সারা শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। হত্যাকাণ্ডের ভিডিও চিত্রেও অনেক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। : নৃশংসভাবে নিহত বিশ্বজিতের মৃত্যু দেশ-বিদেশে বেশ প্রচার পেয়েছিল। সে জন্য হয়ত বিচারিক আদালতে বিশ্বজিৎ হত্যার ঘটনাটি গুরুত্ব পায়, যদিও তেমনটি পল্টন হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি পায়নি। শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর বাজার সংলগ্ন মশুরা ঘোষপাড়ার সন্তান বিশ্বজিতের মৃত্যু সেই এলাকাতেও মানুষকে বেদনা বিধুর করে তোলে। বিশ্বজিৎ হত্যার দায়ে আটজনকে ফাঁসি ও ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়া হয় নিম্ন আদালতে। এই রায় যে দেয়া হয় দৃষ্টান্তমূলক হিসেবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু তারপরেও একই ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে। এটাই প্রশ্ন। সর্বোচ্চ বিদ্যাপাঠ এক শিক্ষার্থী অপর শিক্ষার্থীকে মাটিতে ফেলে লাথি দিচ্ছে একজন। ছাত্রীকে কয়েকজন ছাত্র মিলে খাবলা-খাবলি করছে প্রকাশ্যে! ধর্ষণের হুমকিও নাকি দেয়া হয়েছে। এদিcj রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে (শহীদ জোহা চত্বরে) একইদিন হাতুড়ি ও লাঠি পেটার শিকার হয় কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত নেতা তারিকুল ইসলাম তারিক। শুধু তাই না রাজশাহী মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। : এ সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, সামনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন ঘটনা ঘটেছে। এবার হয়ত একটি ইস্যুতে (কোটা) হচ্ছে। আগামী মাসগুলিতে এমন অনেক ঘটনাবলির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করলেন এই বিশেষজ্ঞ। কারণ সাধারণ ছাত্রদের কোটা সংস্কারের দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক কোটা বাতিলের ঘোষণা কার্যকর নিয়ে যে আমলাতান্ত্রিক কমিটি গঠিত হয়েছে, তা সময় নেবে। কাজেই বিষয়টি আরো কিছু সময় ঝুলে থাকতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। দিনকাল :