খালেদার মুক্তি কোন পথে : প্যারোল, না জামিন? নেপথ্যে সমঝোতা

একুশে বার্তা ডেক্স : দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশ যাত্রা প্যারোলে না জামিনে- এ প্রশ্নে আটকে আছে সমঝোতা। অব্যাহত গোপন আলোচনায়ও বিষয়টির সুরাহা হয়নি। সমঝোতার আলোচনা যারা এগিয়ে নিচ্ছেন, তাদের একপক্ষ চান প্যারোলে বিদেশ যেতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসন। অপর পক্ষের চাহিদা জামিন। দুপক্ষের এমন অবস্থানে আপাতত আটকে আছে ফয়সালা। একপক্ষ নমনীয় হয়ে ছাড় দিলেই সুরাহা হবে বিষয়টির। এমনটা হলে সহসাই দৃশ্যমান হবে খালেদা জিয়ার বিদেশ যাত্রার প্রক্রিয়া। জামিন নিয়ে যাচ্ছেন, নাকি প্যারোলে বিদেশ যাচ্ছেন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী- তাই এখন দেখার বিষয়।

খালেদার বিদেশ যাত্রা প্রশ্নে সমঝোতা নিয়ে কাজ করছেন এমন একটি সূত্রের মতে, আলোচনা আটকে যাওয়ায় খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ নন, তাকে চিকিৎসার জন্য আপাতত বিদেশ যেতে হবে না- এমন মত এসেছে মেডিকেল বোর্ডের তরফ থেকে। যদি আলোচনা সফল হতো তাহলে ভিন্ন চিত্র দেখা যেত। ওই সূত্রের মতে, খালেদা জিয়ার পক্ষে মধ্যস্ততাকারীদের চাপে রাখতে ও প্যারোল নিয়ে বিদেশ যেতে রাজি করাতে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য জেল থেকে বের করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি কুমিল্লায় বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা মামলায় আরো আগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলেও গত ৮ এপ্রিল প্রথমবারের মতো খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

সমঝোতাকারীদের জানানো হয়েছে, জামিন নিয়ে খালেদা জিয়াকে বিদেশ যেতে হলে আদালতই একমাত্র ভরসা। আদালতের নির্দেশের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হবে। তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপারও। কিন্তু প্যারোল নিয়ে যেতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই যথেষ্ট। মন্ত্রণালয় খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য প্যারোল দিতে পারে। এ জন্য তেমন সময়েরও প্রয়োজন হয় না। সরকারের সিদ্ধান্তেই এ ক্ষেত্রে অনুমতি মেলে। যেমনটা খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের ক্ষেত্রে ঘটেছে। ২০০৮ সালে প্যারোল নিয়ে লন্ডন গিয়ে এখনো সেখানে রয়েছেন তিনি।

সূত্রের দাবি, ৭৩ বছর বয়স্ক খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে অসুস্থ। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলে তিনি জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এমন বিবেচনায় সরকার এ ধরনের ঝুঁকি হয়তো নিতে চাইবে না। নিজে নিরাপদ থাকতে খালেদা জিয়াকে রড় ধরনের ছাড় দিতে পারে সরকার।

এ ছাড়া বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারাবন্দি খালেদা জিয়া নিয়ামক শক্তি হিসেবে আর্বিভূত হতে পারেন, যা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর বিষয়ে পরিণত হতে পারে। এসব বিবেচনায় সরকারও চায় খালেদা জিয়াকে নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি না করতে। তার নিরাপদ দেশ ত্যাগে সরকারের হয়তো কোনো আপত্তিও নেই। এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার প্যারোলে বিদেশ চলে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করছেন সমঝোতাকারীরা।

খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ড প্রধান ডা. মো. শামসুজ্জামান জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার বাতজনিত রোগ রিউমেটাল আর্থ্রাইটিস ও অস্টো আর্থ্রাইটিস রোগ রয়েছে। হাড়ের জয়েন্টের কিছু রোগ আছে। এগুলো ওষুধ খেলে ভালো থাকবে, আবার বাড়তে-কমতেও পারে।

পরিস্থিতি এখন যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে দুপক্ষের সমঝোতা হতে আগামী ৮ মে পর্যন্ত গড়াতে পারে। এরপরই পাল্টাতে থাকবে দৃশ্যপট। খালেদা জিয়াকে নিয়ে পাওয়া যাবে নতুন নতুন তথ্য।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে নেয়ার পর খালেদা জিয়া অসুস্থ বলে বিএনপি অভিযোগ করে আসছিল। দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হয়, নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। এ জন্য তার জামিন দরকার। বিএনপির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ এপ্রিল শনিবার কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে নিয়ে খালেদা জিয়ার পছন্দের কয়েক জন চিকিৎসককে দিয়ে তার চেকআপ করান হয়। তারা খালেদা জিয়ার কয়েকটি এক্সরেও করান। এর আগে ৪ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অধ্যাপক মো. শামসুজ্জামানকে ওই মেডিকেল বোর্ডের প্রধান করা হয়।

গত ১ এপ্রিল কারাগারে গিয়ে খালেদা জিয়াকে দেখে এসে বোর্ডের চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে বলা হয় তার অসুস্থতা গুরুতর নয়। সরকারের ওই মেডিকেল বোর্ডেকে লোক দেখানো আখ্যায়িত করে বিএনপির পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করানোর দাবি জানানো হয়। এরপর গত ৬ এপ্রিল কারাগারে গিয়ে খালেদা জিয়াকে দেখে এসে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ম্যাডামের স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো নয়। সর্বশেষ গত বুধবার খালেদার ব্যক্তিগত দুই চিকিৎসক কারাগারে গিয়ে তাকে দেখে আসেন। পরে তারা বিএনপি চেয়ারপারসনকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার জন্য সুপারিশন করেন।

এমন পরিস্থিতিতে গত রবিবার খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক মো. শামসুজ্জামান বলেন, শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপারসনকে এখন বিদেশে নেয়ার প্রয়োজন নেই। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে যে ৩ জন চিকিৎসক গত শনিবার খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন, তাদের মতামত পেলে মেডিকেল বোর্ড পরবর্তী পদক্ষেপে যাবে বলে জানান তিনি। এদিকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল হারুন জানান, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন গতকাল রবিবার কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চিকিৎসকদের পরামর্শে এবং জেল কোর্ড অনুযায়ী হবে, এতে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়াকে দণ্ড দিয়েছেন আদালত, তিনি দণ্ডিত ব্যক্তি। তার মুক্তির ব্যাপারে আদালতই সিদ্ধান্ত নেবে, এতে সরকারের কিছুই করার নেই।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, চেয়ারপারসনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের ভূমিকা প্রয়োজন। খালেদা জিয়াও কারা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছেন, তিনি তার চিকিৎসকদের বাইরে কারো ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করবেন না।