„নূর হোসেন দিবসের মূল্যায়নে অধ্যাপক আনোয়ার :স্বৈরতন্ত্রের নিপাত হলেও গণতন্ত্রের মুক্তি মেলেনি

নিউজ ডেক্স : ১০ নভেম্বর ১৯৮৭ সাল। প্রেসিডেন্ট এরশাদের পদত্যাগ ও  গণতন্ত্রের দাবিতে ঢাকার সচিবালয়ে অবরোধের ডাক দেয় বিরোধী দলগুলো। অবরুদ্ধ নগরীতে সেদিন ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ বুকে- পিঠে লিখে রাস্তায় নেমেছিলেন নূর হোসেন।
এক পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয় তার। দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে ১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেন দিবস পালন করা হয়।
যে গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন নূর হোসেন সে গণতন্ত্র কী পেয়েছি? এমন প্রশ্নে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন, নূর হোসেনের বুকে পিঠে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক’।  স্বৈরাচার নিপাত গেছে কিন্তু গণতন্ত্র তো মুক্তি পায়নি। আমরা তো মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম সার্বিক মুক্তির জন্যই। কিন্তু গণতন্ত্রই তো মুক্তি পেলো না আজ পর্যন্ত। নূর হোসেনের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই। যা আছে তাকে ডেমোসক্লেরোসিস বলা যায়।

এটাকে আমি দুটো শব্দ যোগ করেছি ডেমোক্রেসি যোগ এথোরোস্কে¬রোসিস। এথোরোস্কে¬রোসিস একটা রোগ যাতে করে মানুষ শ্লথ হয়ে যায়। কারণ তার ধমনী শুকিয়ে যায় রক্ত সঠিকভাবে প্রবাহিত হয় না। আপাতদৃষ্টিতে সে সচল থাকে কিন্তু ধীরগতিসম্পন্ন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই, আছে ডেমোসক্লেরোসিস। সংবিধানে গণতন্ত্রের সব কথা আছে। বাস্তবে যা নেই। সংবিধানের ৭, ৮ ধারায় বলা আছে জনগণই ক্ষমতার মালিক যা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন। বাস্তবে তো সরকার সব ক্ষমতার মালিক।

আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। বিগত নির্বাচনগুলো আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আগামী নির্বাচন আমি প্রশ্নাতীত চাই। কিন্তু আমার চাওয়া-পাওয়া পরিণত হবে কিনা তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয়, যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে বলে আমি মনে করি। শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন হ-য-ব-র-ল অবস্থা চলছে।

এই  শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষার মানুষের হাতে আছে। শিক্ষামন্ত্রী পেশায় একজন ডাক্তার। শিক্ষার দর্শন সম্পর্কে তার কিছু জানা আছে বলে এতদিন তিনি প্রমাণ করতে পারেননি। উপরন্তু শিক্ষা সচিব একজন আমলা। বঙ্গবন্ধুর সময় আমি দেখেছি প্রথম শিক্ষা সচিব হলেন-ড. এ আর মল্লিক তারপর ড. আল-মতি শরফুদ্দিন, তারপর হলেন-অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু শিক্ষিত মানুষের হাতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।  যা আজকে নেই। আজকে রাষ্ট্রটি  পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক বলা যায়। আমলারাই দেশ শাসন করছে, দেশ পরিচালনা করছে। যেমন ধরা যাক, মেট্রোরেল। মেট্রোরেলের মতো এত ব্যয়বহুল প্রকল্প সংসদে আলোচনা হয়নি। আমলাদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হ্যাঁ করে দিয়েছেন। কাজেই আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শিক্ষা সবসময় বিপন্ন হয় সেই অবস্থাই হয়েছে বাংলাদেশে। আমাদের যে দীর্ঘ সংগ্রাম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেটা ছিল গণতন্ত্রের প্রত্যাশায়। গণতন্ত্র পাকিস্তানে থাকলে বাঙালিরা তাদের স্বাধিকার পেতো। বঙ্গবন্ধু সেই জন্য আন্দোলন করলেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের কাঠামোগত অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিল। তার প্রমাণ হচ্ছে বাংলাদেশের সংবিধান। যাকে আমরা বলি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অবদান। এই সংবিধান একটি জনসম্পৃক্ত রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। সুতরাং আমাদের যাত্রাটা খুব ভালো হয়েছিল। ’৭৫-পর থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত আমাদের সামরিক শাসন হলো যেখানে গণতন্ত্র উধাও, বাংলাদেশ উধাও, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উধাও।