বিচারের আশায় খাদিজা-চন্দ্রিকা : গ্রেফতারিপরোয়ানা নিয়েও দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন এসি রিন্টু- সারোয়ার আলম : ডিসির আজীবন পদাবনতি:মাঠ প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকান্ডে বিব্রত মন্ত্রণালয়

নিউজ ডেক্স : অনৈতিক  সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছেন মাঠ প্রশাসনের বেশকিছু কর্মকর্তা। স্ত্রীদের তরফ থেকে এমন অভিযোগ উঠছে প্রতিনিয়ত। মামলা হচ্ছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। বিভাগীয় তদন্তও চলছে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তবে উপযুক্ত শাস্তি দিতে না পারলেও কর্মকর্তাদের এমন কর্মকাণ্ডে বিব্রত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

অভিযোগ আছে, নামমাত্র শাস্তি প্রদানের কারণে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তদন্তে ধীরগতি ও সিনিয়রদের প্রশ্রয়ে অভিযুক্তরা পার পেয়ে যাচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে সিনিয়ররা বিব্রত।

অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মকর্তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন বেশি। বিসিএসে যারা নৈতিকতা ও সুশাসনের সিলেবাস পড়ে চাকরি নিয়েছে তাদের মধ্যে গুটিকয়েক কর্মকর্তা প্রশাসন ক্যাডারের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীরের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনা সামপ্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত। এই ঘটনার পর পর সুনামগঞ্জের এক উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) নারী সংশ্লিষ্ট ঘটনা আলোচনায় আসে। সম্প্রতি জামালপুরের সেই ডিসিকে নিম্ন পদে নামিয়ে দেয়া হয় এবং আজীবনের জন্য তার পদোন্নতি বন্ধ করা হয়।

অপরদিকে পার পেয়ে যান সুনামগঞ্জের সেই ইউএনও। এসব ঘটনার আড়ালে চাপা পড়ে আছে আরো চাঞ্চল্যকর কিছু ঘটনা। নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে বর্তমানে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান আছে। এর মধ্যে রয়েছেন কুড়িগ্রামের বহুল আলোচিত সাংবাদিক নির্যাতন মামলার আসামি সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা। তার স্ত্রী চন্দ্রিকা চাকমা অভিযোগ করেছেন, রিন্টু বিকাশ পরকীয়ায় লিপ্ত। অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ করায় বেশ কয়েক দফা স্বামীর মারধর ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। হাসপাতালে চিকিৎসাও নিতে হয়েছে তাকে। আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন চন্দ্রিকা। সকল তথ্য-প্রমাণ দাখিল করলেও তার অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটি। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এমন অভিযোগ তুলে পুনরায় তদন্তের জন্য আবেদন করেছেন চন্দ্রিকা। চন্দ্রিকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর অভিযোগ করেছেন, ৩৫তম বিসিএসে উত্তীর্ণ রিন্টু বিকাশ চাকমা চাকরিতে যোগ দেয়ার পর বদলে যান। কর্মস্থলে বন্দোবস্ত থাকলেও স্ত্রী-সন্তানকে দূরে রাখতেন। স্ত্রী-সন্তানের মাসিক খরচ বাবদ মাত্র ২ হাজার টাকা পাঠাতেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, রিন্টু পরনারীতে আসক্ত। এলাকার একটি মেয়ের সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক আছে। এ পরিস্থিতিতে স্বামীকে বুঝানোর চেষ্টা করেন চন্দ্রিকা। সন্তানকে নিয়ে কুড়িগ্রাম আসতে চাইলে রিন্টু তাকে হুমকি দেন। পরবর্তীতে ওই নারীকে বিয়ে করতে চাইলে চন্দ্রিকা কুড়িগ্রাম চলে আসেন। ওই সময় রিন্টু ছুটি নিয়ে কুড়িগ্রামের বাইরে চলে যান। জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে কর্মস্থলে ফিরলেও রিন্টু তার সঙ্গে খারাপ আচরণ শুরু করেন। ডরমিটরিতে থাকা অবস্থায় প্রায় রাতে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন চালাতো। ডরমিটরিতে বসেই সে মদ পান করতো। নেশা করে সে অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও প্রহার করতো। একমাত্র মেয়ের সামনেই রিন্টু তার ওপর এমন নির্যাতন চালাতো। চন্দ্রিকা অভিযোগ করেন, নির্যাতনের কারণে তাকে কয়েক দফা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এ অবস্থায় তিনি এলাকায় ফিরে যেতে বাধ্য হন। ইতিমধ্যে তাকে ডিভোর্স দিবেন বলে আত্মীয়স্বজনদের কাছে প্রচার করতে থাকে। রিন্টুর অনৈতিক কাজ বন্ধ ও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রংপুরের বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে জনপ্রশাসন সচিব বরাবর অভিযোগ দেন চন্দ্রিকা। পাশাপাশি আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন চন্দ্রিকা। বর্তমানে ওই মামলায় জামিনে আছেন রিন্টু বিকাশ চাকমা। তাকে ওএসডি করে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে স্ত্রীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তদন্ত কমিটি। কিন্তু সেই তদন্তে চন্দ্রিকার সকল অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি মর্মে প্রতিবেদন দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপ-সচিব আমিনুল ইসলাম খান। যদিও বিচার বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলে এবং আদালত রিন্টুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে পুনরায় তদন্তের জন্য জনপ্রশাসন সচিব বরাবর আবেদন করেছেন চন্দ্রিকা। মানবজমিনকে চন্দ্রিকা বলেন, সহকর্মী রিন্টুকে বাঁচাতে মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা প্রভাব খাটাচ্ছেন। সহকর্মীদের জোর দেখিয়ে রিন্টু দম্ভ করে বলে বেড়াচ্ছেন তার কিছুই হবে না।

চন্দ্রিকার মতো স্বামীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগসহ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন খাদিজা আকতার। তার অভিযোগ, বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় নারী ব্যাচমেটের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ান সহকারী কমিশনার (ভূমি) সারোয়ার সালাম। পরবর্তীতে ভূমি প্রশাসন প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণকালে সেই সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়। অবৈধ প্রেমিকাকে নিয়ে সংসারে অশান্তি শুরু করে সারোয়ার সালাম। সুস্থ সবল স্ত্রী-সন্তান থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিবাহের জন্য খাদিজার ওপর চাপ সৃষ্টি করে সে। অনুমতি না দেয়ায় খাদিজার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। সেই সঙ্গে চলে যৌতুক আদায়ের চাপ। নির্যাতনের মাত্রা বাড়লে দু’দফা থানায় জিডি করেন খাদিজা। একই সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দ্বারস্থ হন তিনি। এতে সারোয়ার সালাম ক্ষিপ্ত হয়ে নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন খাদিজা। সারোয়ার সালামের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। খাদিজা অভিযোগ করেছেন, জামিন ছাড়াই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা অবস্থায় সচিবালয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন সারোয়ার সালাম। সরকারি চাকরিবিধি মোতাবেক কোনো কর্মকর্তা ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হলে কিংবা আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার কথা। কিন্তু সারোয়ার সালামের বিরুদ্ধে এমন কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। উপরন্তু তাকে অনেক কর্মকর্তা প্রশ্রয় দেয়ার চেষ্টা করছেন। তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের কোনো প্রকার প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা ও তদন্ত অনুবিভাগ) এ এফ এম হায়াতুল্লাহ। তিনি মানবজমিনকে বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজের অভিযোগ পেলে আমরা তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি। দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তি প্রদান করে তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে প্রকাশ করা হয়- যেন সবাই সতর্ক হয়।মানবজমিন