„বিমানবন্দরে ভুতুড়ে সেবা, বার বার বদলিকৃত নির্বাহি পরিচালক বললেন ব্যবস্থা নেবেন

নিউজ ডেক্স : আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মিলিয়ে বছরে প্রায় ৫০ লাখ যাত্রীকে বছরের পর বছর ভুতুড়ে সেবা দিয়ে আসছে হযরত শাহ্‌জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ফ্রি-ইন্টারনেট ও ফ্রি টেলিফোন সেবার নামে এ ধরনের ভুতুড়ে আয়োজন করে রেখেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে প্রবাসীদের সুবিধার জন্য এ দু’টি সেবা ফ্রি করা হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। তবে প্রবাসীরা ওই দুই ফ্রি সেবা পান না বললেই চলে। বিমানবন্দরে ‘আমরা’ ও ‘উই’- এর মাধ্যমে ফ্রি ইন্টারনেট সেবার আয়োজন করে রেখেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রবাসীরা যখন বিমানবন্দরে পা রাখেন তখন তারা আগেই ফ্রি ইন্টারনেট সেবা পাওয়ার চেষ্টা করেন। পরিবহন সেবা নিতে ও বিমানবন্দরে আসা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তারা ওই সুবিধা পেতে চান। কিন্তু শত চেষ্টা করেও তাদের পক্ষে ওই সেবা নেয়া সম্ভব হয় না।

অথচ বিমানবন্দরের বার বার বদলিকৃত নির্বাহি পরিচালক এ দিকে ভ্রুক্ষেপ করছেন না, বলছেন ২/৩ মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তখন এ ভুতুরে অবস্থা থাকবে না।

কারণ ফ্রি ইন্টারনেট সেবা পেতে গেলে প্রথমেই বাংলাদেশি একটি মোবাইল নাম্বার চাওয়া হয়। কারণ ওই নাম্বারে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড বা ওটিপি পাঠাবে। কিন্তু যেসব প্রবাসী বছরের পর বছর বিদেশে থাকেন তাদের কাছে বাংলাদেশি কোনো সিম থাকে না। তাই ওই ফ্রি সেবাও নেয়া সম্ভব হয় না। বিশ্বের অন্যান্য দেশে পাসপোর্ট নাম্বারের মাধ্যমে ফ্রি ইন্টারনেট সেবা দেয়া হলেও বাংলাদেশে এখনো ওই ব্যবস্থা করা হয়নি। এটা গেল একটা।

এরপর প্রবাসীদের সুবিধার জন্য বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড বা বিটিসিএল’র সহায়তায় চারটি টেলিফোন বুথ স্থাপন করেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। যাত্রীদের অভিযোগ অনুযায়ী, একটি টেলিফোন বুথ কাপড় দিয়ে ঢাকা রয়েছে। বাকি তিনটির কোনোটাতে সংযোগ নেই, কোনোটাতে টেলিফোন সেটের বাটন নষ্ট। অথচ এসব সেবার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করছে সিভিল এভিয়েশন। অথচ দেশে ফিরে বিমানবন্দরে নেমেই ভোগান্তির মুখে পড়েন রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে খ্যাত প্রবাসীরা। এ কারণে যাত্রীরা ফ্রি ইন্টারনেট ও টেলিফোনকে বলছেন ‘ভুতুড়ে আয়োজন’।

আবুধাবি থেকে সম্প্রতি দেশে আসেন রাশেদুল হাসান। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট স্বাস্থ্য ডেস্কে দেখানোর সময় জটিলতায় পড়েন। ইন্টারনেট সংযোগ পেলে অনলাইন থেকে ডাউনলোড করে দেখানোর কথা বললেন রাশেদুল। তখন তাকে জানানো হলো, বিমানবন্দরে ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আছে। মোবাইলে ওয়াইফাই সংযোগ করতে গিয়ে দেখেন, সেখানে তাকে দিতে হবে মোবাইল নাম্বার। মোবাইল নাম্বার দেয়ার পর জানানো হলো তার মোবাইলে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড মেসেজ করে পাঠানো হচ্ছে। সেই পাসওয়ার্ড দিলেই তিনি যুক্ত হবেন ইন্টারনেটে। কিন্তু দুবাইয়ের মোবাইল নাম্বার তো বাংলাদেশে নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না, ফলে সেখানে আদৌ কোনো মেসেজে পাসওয়ার্ড যাচ্ছে কিনা, আর গেলেও সেটি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। রাশেদুল হাসান বলেন, এটা একটা কমনসেন্স ইস্যু। যে ব্যক্তির কাছে বাংলাদেশের কোনো সিম থাকবে না, সেই ব্যক্তির বিমানবন্দরে ফ্রি ইন্টারনেট ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়বে। অনেকদিন পর যারা বিদেশ থেকে আসেন, তাদের কাছে বাংলাদেশের সিম না থাকাই স্বাভাবিক। ফলে বিমানবন্দরের মতো জায়গায় মোবাইলে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড দিয়ে ওয়াইফাই নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার পদ্ধতিটা অযৌক্তিক। ছোট একটা বিষয়ে এমন ভুতুড়ে ব্যবস্থা করে রেখেছে। রাশেদের মতো আরেক যাত্রী হাসনাইন ইমতিয়াজ বলেন, গত বছরও আমি দেশে এসে বিমানবন্দরে এসে এই সমস্যা দেখেছি, এবারও একই অবস্থা। অযোগ্য, অদক্ষ লোকজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে টাকা খরচ করে, কিন্তু যাদের জন্য আয়োজন তারা সুফল পাচ্ছে না। যাত্রীরা কেমন ইন্টারনেট পায় কখনো তারা (বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ) এটার খোঁজ নেয়নি। খোঁজ নিলে তো টের পেতো, বছরের পর বছর এমন পরিস্থিতি থাকতো না। শাহ্‌জালাল বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের জন্য টেলিফোন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বিটিসিএল’র উদ্যোগে বসানো টেলিফোন থেকে বিনা পয়সায় ফোন করা যাবে। তবে এই টেলিফোন কোথায় আছে সেটা খুঁজে বের করাই যাত্রীদের জন্য চ্যালেঞ্জ। দৃশ্যমান স্থানে টেলিফোন বুথের সাইন না থাকায় ফ্রি টেলিফোন বুথ খুঁজে পেতে গোলক ধাঁধায় পড়তে হয় যাত্রীদের। টেলিফোন পেলেও কল করতে গেলে দেখা যাবে টেলিফোন সেটের বাটন নেই কিংবা সংযোগ নেই। বিমানবন্দরে এসে যাত্রীরা অপেক্ষমাণ স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান। অনেকেই গাড়ি কোথায় আছে জানতেও যোগাযোগের প্রয়োজন পড়ে। সে সময়ে ফোন কিংবা ইন্টারনেটের সুবিধা থাকলে যাত্রীদের যোগাযোগ সহজ হয়।

এ প্রসঙ্গে বিমানবন্দরে ইন্টারনেট সেবা দেয়া প্রতিষ্ঠান ‘আমরা’ নেটওয়ার্কস লিমিটেডের ডিজিএম মোহাম্মদ মুশফিকুর রহমান খান মানবজমিনকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে অনেক যাত্রীর কাছ থেকে আমরাও অভিযোগ পেয়ে থাকি। কিন্তু বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসি’র গাইডলাইন অনুযায়ী আমাদের সেবা দিতে হয়। তাই এ বিষয়ে আমাদের কিছু করণীয় নেই। প্রবাসীরা বিমানবন্দরে এসে যদি বাংলাদেশি সিম সংযোগ করেন তাহলে ফ্রি ইন্টারনেট সেবা পেতে পারেন। এ ছাড়া পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে টেলিফোন সেবা প্রসঙ্গে বিটিসিএল’র জি.এম (মার্কেটিং, পিআর অ্যান্ড পি) মীর মোহাম্মদ মোরশেদ মানবজমিনকে বলেন, বিটিসিএল’র পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে চারটি টেলিফোন বুথ স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো সিভিল এভিয়েশনের অনুরোধে করা হয়েছে। ওই বুথগুলোর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। বুথের সংযোগ বা টেলিফোন সেটে কোনো সমস্যা হলে আমাদের খবর দেয় তখন আমরা তা ঠিক করে দিয়ে আসি। এর বাইরে আমাদের কাজ করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, চারটি টেলিফোন সেটে যাত্রীরা একবারে দুই মিনিট করে কথা বলতে পারেন। এজন্য কোনো বিল দিতে হয় না। দুই মিনিট পর আবার তারা কল করার সুযোগ পান। একজন যাতে একটানা দীর্ঘক্ষণ টেলিফোন ব্যবহার করতে না পারেন, অন্যরাও যেনো সুযোগ পান সেকারণে দুই মিনিট করে সময় নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে।

বিমানবন্দরের এ ধরনের ভুতুড়ে আয়োজন প্রসঙ্গে হযরত শাহ্‌জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এম তৌহিদুল আহসান মানবজমিনকে বলেন, বেশির ভাগ সময় টেলিফোন সেটগুলো ব্যবহার করতে গিয়ে যাত্রীরা নষ্ট করে ফেলেন। পরে আমরা আবার তা মেরামত বা নতুন করে লাগাই। তবে টেলিফোন সেটগুলোর অবস্থান কোথায় তা যাত্রীদের সঠিকভাবে জানাতে আরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। ফ্রি ইন্টারনেট সেবা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের বিমানবন্দরেও পাসপোর্ট নাম্বার দিয়ে ইন্টারনেট সেবা দেয়ার পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী ২/৩ মাসের মধ্যে ওই ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে। হযরত শাহ্‌জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাজধানী ঢাকার কুর্মিটোলায় অবস্থিত বাংলাদেশের প্রধান এবং সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ১৯৮০ সালে এর কার্যক্রম শুরু করার পরে, পূর্বের বাংলাদেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল তেজগাঁও বিমানবন্দর, এরপর থেকে এর কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়। এটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ সহ বাংলাদেশের সকল এয়ার লাইন্সগুলোর হোম বেস। ১,৯৮১ একর এলাকা বিস্তৃত এই বিমানবন্দর দিয়ে দেশের প্রায় ৫২ শতাংশ আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট উঠানামা করে, যেখানে চট্টগ্রামে অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রায় ১৭ শতাংশ যাত্রী ব্যবহার করে। এ বিমানবন্দর দিয়ে বার্ষিক প্রায় ৪০ লাখ আন্তর্জাতিক ও ১০ লাখ অভ্যন্তরীণ যাত্রী এবং ১৫০,০০০ টন ডাক ও মালামাল আসা-যাওয়া করে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশকে বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।