একুশে বার্তা ডেক্স : : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। ৮ ফেব্রুয়ারি বকশীবাজার বিশেষ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান তাঁকে কারাদন্ড দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করেন। বিএনপির অভিযোগ মিথ্যা মামলায় জাল নথি তৈরি করে সরকারের নির্দেশে নিম্ন আদালতে সাজা দেয়া হয়েছে বেগম খালেদা জিয়াকে। রায়ের পর পরই বেগম খালেদা জিয়াকে আদালতের পাশে নাজিমউদ্দিন রোডের লালদালান–খ্যাত ২২৮ বছরের পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৬ সালের ২৯ জুন থেকে ৬ হাজার ৪০০ বন্দিকে কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ার রাজেন্দ্রপুরের নতুন কারাগারে স্থানান্তর করে পুরনো কারাগার বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দুই বছর ৪ মাস ১০ দিন পর স্যাঁতসেঁতে জরাজীর্ণ এই পরিত্যক্ত কারাগারেই ৪ মাস পার করছেন বেগম খালেদা জিয়া। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ৫৮ দিন পর কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। : এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের জামিন নিয়ে বারবার টালবাহানা করা হয়। উচ্চ আদালতে জামিন পেতে পদে পদে বাধা দেয়া হচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত তাকে পছন্দ অনুযায়ী হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা বারবার বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ার পর তিনদিন ধরে ডিভিশন দেয়া হয়নি। তাঁকে সাধারণ কয়েদি হিসেবে রাখা হয়েছিল। ১১ ফেব্রুয়ারি ডিভিশন (প্রথম শ্রেণির বন্দি হিসেবে বিশেষ সুবিধা) পাওয়ার পর সেখান থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দিদের সন্তান রাখার স্থান ডে–কেয়ার সেন্টারে নেয়া হয়। এখন সেখানেই আছেন। ১০ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নির্জন কারাগারে রাখা হয়েছে, যা আইন ও সংবিধান পরিপন্থী। তিনি বলেন, কারা কোড অনুযায়ী তিনি ডিভিশন পাওয়ার যোগ্য, তিনটি যোগ্যতায় তিনি ডিভিশন পান। কিন্তু বাইরে প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে তাঁকে ডিভিশন দেয়া হয়েছে, কাজের মেয়েকে দেয়া হয়েছে। কাজের মেয়েকে দেয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছিল। কোর্ট আদেশও দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন এই গৃহপরিচারিকার সহযোগিতা নিয়ে চলছেন। তার ওষুধপত্র সেবনসহ দৈনন্দিন কাজে তার সহযোগিতা নিয়ে চলেন। অথচ তাকে ডিভিশন না দিয়ে নির্জন কারাগারে রাখা হয়েছে। ভাঙা পরিত্যক্ত বাড়িতে সুযোগ–সুবিধা ছাড়া জনমানবহীন রাখা হয়েছে, যা একেবারে সংবিধান পরিপন্থী। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়ের ‘সার্টিফাইড’ কপি নিয়ে সরকার ‘ছলচাতুরি’ করছে বলে অভিযোগ করেন মওদুদ আহমদ। বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী মো. সানাউল্লাহ মিয়া রায়ের সার্টিফাইড কপি পেয়ে সাংবাদিকদেরকে বলেন, রায় প্রস্তুত হওয়ার আগেই রায় দেয়ার কারণে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের সার্টিফাইড কপি পেতে দেরি হয়েছে। সার্টিফাইড কপি করতে ১২ দিন দেরি হলো। রায় ৬৩২ পৃষ্ঠার হলেও এর সার্টিফাইড কপি ১১৭৪ পৃষ্ঠা হয়েছে। আমরা কপি পেয়েছি। রায়ের কপি পাওয়ার পর মওদুদ আহমদ বলেন ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় পড়ে আশ্চর্যান্বিত হয়েছেন। রায়ের পর্যবেণে অনেক ভুল–ভ্রান্তি এবং অনেক উদ্দেশ্যমূলক বক্তব্য রয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ২২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজার রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল করেন তাঁর আইনজীবীরা। এ সময় আদালত আপিল গ্রহণ করে জরিমানার বিষয়টিও স্থগিত করেন। এরপর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও : বিচারপতি সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চে আপিলের শুনানি হয়। বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আপিলের বিরোধিতা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। শুনানিতে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, দুদকের মামলায় অতীতে ৭ বছরের কারাদন্ডের আসামিকেও জামিন দেয়া হয়েছে। নি¤œ আদালত বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদন্ড দিয়েছেন। দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম বিরোধিতা করেন। তবে আদালত বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড হয়েছে এবং সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী একজন বয়স্ক নারী, সেই বিবেচনায় তাঁকে জামিন দেয়া যেতে পারে। নিম্ন আদালতের নথি ১৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে তলব করেন। ১১ মার্চ ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৫–এর ঘোষিত রায়ের নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। এদিন পাঁচ হাজার ৩৭৩ পৃষ্ঠার নথি পুলিশ পাহারায় হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেয়া হয়। এরপর ১২ মার্চ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ। জামিনের পরপরই বেগম খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত চেয়ে আবেদন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপ। ১৩ মার্চ শুনানি শেষে ওই আবেদন আপিল বিভাগের নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠিয়ে দেন চেম্বার জজ আদালত। রাষ্ট্র, দুদক ও বিবাদী পরে শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর চেম্বার জজ আদালত এ আদেশ দেন। ১৪ মার্চ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন স্থগিত করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ। ১৭ ও ১৮ মার্চ শুনানি শেষে বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন আপিল বিভাগ ৮ মে পর্যন্ত স্থগিত করেন। ৮ ও ৯ মে ফের শুনানি শেষে ১৪ মে আদেশের দিন ধার্য করেন প্রধান বিচারপতি। কিন্তু এদিন সকালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মাননীয় আদালত আমার আরো বলার আছে। আদালত তাকে অনুমতি দেয়। এবং পরের দিন অর্থাৎ ১৬ মে ফের আদেশের দিন ধার্য করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। : ১৬ মে বেগম খালেদা জিয়াকে দেয়া হাইকোর্টের জামিন বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। আদালত একই সঙ্গে আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। কিন্তু জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় জামিন আদেশ বহাল রাখার পর সংপ্তি আদেশের কপি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী। জবাবে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, আদেশের পর সংপ্তি আদেশের অনুলিপি দেয়ার বিধান নেই। আমরা একসঙ্গে পুরো আদেশের কপি দেবো। : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্টের দেয়া জামিন আদেশ আপিল বিভাগ সর্বসম্মত হয়ে বহাল রাখার সাথে সাথে আরো ছয়টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি পাননি। ২৮ মে কুমিল্লার ২টি নাশকতার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ছয় মাসের জামিন দিয়েছেন বিচারপতি মো. আসাদুজ্জামান ও জে বি এম হাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ। তবে একই দিন আদেশের জন্য রাখা নড়াইলের মানহানির মামলাটির জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২৯ মে কুমিল্লার নাশকতার ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া ছয় মাসের জামিন স্থগিত করে চেম্বার আদালত। : এদিকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা ও শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্যের অভিযোগে নড়াইলে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মানহানি মামলায় তাঁর জামিন বাতিল করেছে আদালত। ৫ জুন জামিন শুনানি শেষে নড়াইল জেলা ও দায়রা জজ শেখ আব্দুল আহাদ এ আদেশ দেন। বিটিভি দেখে, পত্রিকা পড়ে এবং নামাজ রোজা ইবাদত–বন্দেগি করে কারাগারে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সময় কাটে। রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। : এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার কুমিল্লায় নাশকতার অভিযোগে দায়ের করা বিশেষ মতা আইনের মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আপিল শুনানি শেষে তাঁর আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, বিচারিক আদালত সুপ্রিম কোর্টের অধীনে কাজ না করে সরকারের অধীনে কাজ করছে। তাদের জবাবদিহিতা এখন সুপ্রিম কোর্টের কাছে নেই, আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে চলে গেছে। কুমিল্লার মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন বিচারিক আদালতে শুনানির জন্য আগামী ৮ আগস্ট রাখা হয়েছে। যাতে করে এ সময়ের মধ্যে তাকে (খালেদা জিয়াকে) জেলে রাখা যায়। এর আগে দুপুর ১২টায় অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বেগম খালেদা জিয়ার পে জামিন আবেদনের শুনানি করেন। অপরদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানির জন্য সময় চান। এরপর শুনানি আগামী রবিবার (১০ জুন) পর্যন্ত মুলতবি করেন আদালত। : বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দিনকালকে বলেন, আগামী নির্বাচন একতরফা করতে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় মিথ্যা ও জালনথি তৈরি করে সাজানো মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করে রাখা হয়েছে। সরকারপ্রধানের প্রতিহিংসায় শিকার তিনি। বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হলেও তাঁর চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না যা অমানবিক ও মানবাধিকারের পরিপন্থী।দিনকাল
Share this:
- Click to share on Facebook (Opens in new window)
- Click to share on Twitter (Opens in new window)
- Click to share on LinkedIn (Opens in new window)
- Click to share on Tumblr (Opens in new window)
- Click to share on Pinterest (Opens in new window)
- Click to share on Pocket (Opens in new window)
- Click to share on Reddit (Opens in new window)
- Click to share on Telegram (Opens in new window)
- Click to share on WhatsApp (Opens in new window)
- Click to print (Opens in new window)
