স্টাফ রিপোর্টার : বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ–বেবিচকে চতুর্ভুজ চক্রাকারে থেমে গেছে হেড কোয়ার্টারের দুই দুইবারের স্ট্যান্ডরিলিজ। এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর বার বার হস্তক্ষেপে মর্তুজা হোসেন কক্সবাজারেই ৫ বছর ধরে বহাল। তাকে কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে সরায় এমন সাধ্য কার? উপরন্তু তাকে ম্যানেজার থেকে ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্বও দেয়া হয়েছে। মতৃুজার বাড়ি নাটোরে, বিয়ে করেছেন পাবনায়। আর প্রভাবশালী ওই মন্ত্রীর বাড়ি কক্সবাজারে। এখানে লোকালিটিও কাভার করে না। তাহলে মন্ত্রী কেন বার বার তার স্ট্যান্ডরিলিজ সুপারিশ করছেন?
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২০ আগস্ট/২৬ কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মর্তুজা হোসেনকে বিমানবন্দর থেকে স্ট্যান্ডরিলিজ করে সদর দপ্তরের আনা হয়। আর এটিএম পরিচালক সাবেরাকে কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়। সাবেরা কক্সবাজার বিমানবন্দরে অলরেডি যোগদানও করেন। কিন্ত ২ দিন পরই আবার তিনি কর্তৃপক্ষের অর্ডার ওভারটেক করে কক্সবাজার ছেড়ে চলে আসেন।
কিন্ত স্ট্যান্ডরিলিজকৃত ভারপ্রাপ্ত পরিচালক কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে রিলিজ না হয়ে উচ্চ পর্যায়ে তার অধীন্থ পেয়ারের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারি দিয়ে প্রভাবশালী একমন্ত্রীর দরবারে পাঠান, মন্ত্রীর তদবিরে ঠেকে যায় আপাতত স্ট্যান্ডরিলিজ। হাফ ছেড়ে বাচেন মর্তুজা।
সূত্র জানায় এ ঘটনার পর দ্বিতীয়বার হেড কোয়ার্টার থেকে আরেকটা স্ট্যান্ডরিলিজ লেটার ইস্যু করা হয়। ওই অর্ডারে আবার মর্তুজাকে হেড কোয়ার্টারের চেয়ারম্যান দপ্তরে ওএসডির অর্ডার করা হয়, আবারও সাবেরাকে কক্সবাজারে বদলি করা হয়। আর রাজশাহীর ম্যানেজার দিলারাকে ঢাকায় এবং এটিএম-এর উপপরিচালক যোগেশ চন্দ্র ঘোষকে রাজশাহী বিমানবন্দরে বদলি করা হয়।
আবারও কক্সবাজার বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা মন্ত্রী কাছে তদবির নিয়ে যান, এবার মন্ত্রী প্রশ্ন তুলেন– তোমরা কি নিজেরো স্ব ইচ্ছায় পরিচালককে রাখার জন্য এসেছো নাকি পরিচালক তোমাদের পাঠিয়েছে। এ প্রশ্নে কর্মচারিরা ‘থ” মেরে যান
এবারও হেড কোয়ার্টার থেকে ইস্যু করা সেকেন্ডবারের স্ট্যান্ডরিলিজ লেটারও ভেস্তে গেছে।
এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত পরিচালক সাবেরা চেয়ারম্যান দপ্তরে ওএসডি।
বিষয়টি বেবিচকের মান-ইজ্জতের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারিরা প্রশ্ন তুলছেন বেবিচকে কে বড় –চেয়ারম্যান না ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মতৃুজা?
মর্তুজা কক্সবাজারে ৫ বছরে মধু পেয়ে বসেছেন, মধু ছেড়ে আসতে তার কষ্ট হচ্ছে বৈ কি।
মর্তুজার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির কথা কাগজে ওঠে এসেছে। বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউন্ঞ বিক্রি করাসহ ভিআইপিদের থেকে খাবার টাকা আদায় করার কথাও শোনা যায়।
আর এ দিকে সাবেরাও এটিএম-এর পরিচালক হিসেবে মধূ পেয়ে বসেছেন, কন্ট্র্রোলারদের কন্ট্রোল করে মজা পাচ্ছেন, ছড়ি ঘুরাচ্ছেন, এটা ছেড়ে কি কক্সবাজারে তার কি ভাল লাগবে? এ প্রশ্ন বেবিচকে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আর দিলারা ১০ বছরে রাজশাহী বিমানবন্দরে, তাকে রাজশাহী থেকে সরায় এমন সাধ্য কার? তার জামাই রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক, বাড়ি গোপালগনজে, আওয়ামী আমলে দিলারার চাকরি, সে সূত্রে দিলারা গোপালি বধূু।অনেকে তাকে আওয়ামী দোসর হিসেইে জানে বা চিনে। তাকে নিয়ে ‘একুশে বার্তা’সহ একাধিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও দিলারাকে আগলে রাখে বেবিচক প্রশাসন। এবার যখন চেয়ারম্যানের নির্দেশে বদলি করা হলো-তাও আবার বাধ সাধছে প্রভাবশালী মহল।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের ওএসডিকৃত ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মর্তুজাকে নিয়ে সহযোগি গণমাধ্যমে গত ২২ আগস্ট ‘কক্সবাজার বিমানবন্দরে কি এত মধ’ু! শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত রিপোর্টে মর্তুজার দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে। প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে—
কক্সবাজার বিমানবন্দরে কী এত মধু!
বদলির আদেশের পরও কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. গোলাম মোর্তজা হোসেন কর্মস্থল ছাড়েননি। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরের আদেশ অনুযায়ী বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) করার কথা থাকলেও শুক্রবার রাত পর্যন্ত তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তথ্যটি প্রচার পাওয়ার পর কক্সবাজারের সচেতন মহল ও বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের মাঝে প্রশ্ন উঠেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরে কি এমন মধু রয়েছে- যার টানে তিনি এখান থেকে যেতে চাচ্ছেন না? কারণ এর আগেও একাধিকবার বদলির আদেশ পেয়ে তদবিরে তা বাতিল করিয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে।
বেবিচক সদর দপ্তর, কুর্মিটোলা, ঢাকা থেকে গত ৯ আগস্ট জারি করা অফিস আদেশে (স্মারক নম্বর ৩০.৩১.০০০০.০০০.২১১.১৬.০০০২.২৬.৬৫২) গোলাম মোর্তজা হোসেনকে বেবিচকের এটিএম বিভাগে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই আদেশে চেয়ারম্যান সচিবালয়ের পরিচালক সাবেরা রহমানকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
বেবিচকের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. তিরান হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখ অপরাহ্ণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, স্ট্যান্ড রিলিজের সময়সীমা পার হওয়ার পরও গোলাম মোর্তজা হোসেন কক্সবাজার বিমানবন্দর ছাড়েননি। একই সঙ্গে বদলির আদেশ পুনর্বিবেচনা বা ঠেকাতে বিভিন্ন মহলে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে। এর আগেও তার বদলির উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রভাবশালী মহলে তদবিরে তা ঠেকানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কক্সবাজার বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায় পাঁচ বছর তিনি একই কর্মস্থলে রয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থাপক পদটি পরিচালক পদে উন্নীত হলে তিনি ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে একজন কর্মকর্তার অবস্থান এবং তার মূল পদ ও বর্তমান দায়িত্বের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিষয়টি বেবিচকের প্রশাসনিক নীতিমালা অনুযায়ী যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যেই গত ১৬ জুলাই বেবিচক চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগে গোলাম মোর্তজা হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ তোলা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া, ওভারটাইম বণ্টনে অনিয়ম, পছন্দের ব্যক্তিদের অতিরিক্ত ওভারটাইম দেওয়া, ঠিকাদারদের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়, জেনারেটরের সরকারি জ্বালানি ব্যবহারে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ পরিচালনা নিয়েও অনিয়ম হয়েছে। সেখানে মাসিক দুই লাখ টাকা উৎকোচ নেওয়া এবং নিয়মিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবর্তে পছন্দের ব্যক্তিকে লাউঞ্জ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া ভিআইপি যাত্রীদের নাস্তা বাবদ টাকা আদায়, বিমানবন্দরে বিভিন্ন সরকারি মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুসরণ না করে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়।
অভিযোগে বিমানবন্দর এলাকার খতিয়ানভুক্ত জমিতে গত দুই-তিন বছরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভবন নির্মাণের বিষয়টি তুলে ধরে এসব স্থাপনা নির্মাণে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিমানবন্দরের জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন দখলে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে বিভিন্ন হোটেল-রিসোর্ট মালিক ও এনজিও কর্মকর্তাদের বিমানবন্দরে ভিআইপি সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এর আগে গোলাম মোর্তজা হোসেনের বদলির উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদবির করে তা ঠেকানো হয়েছিল। এমনকি দুই স্থানীয় বিএনপি নেতাকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার মাধ্যমে একজন মন্ত্রীর কাছে তদবির করার অভিযোগও আনা হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি, লেনদেনের প্রমাণ বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের তথ্য অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়েও প্রশাসনিক তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
বেবিচকের সর্বশেষ অফিস আদেশ অনুযায়ী ২০ আগস্ট বিকেলে গোলাম মোর্তজা হোসেনের কক্সবাজার বিমানবন্দরের দায়িত্ব থেকে অবমুক্ত হওয়ার কথা। তার স্থলে পরিচালক সাবেরা রহমানকে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্তও হয়েছে।
কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তিনি কর্মস্থলে থাকায় বেবিচকের লিখিত আদেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, শুধু বদলি নয়, গোলাম মোর্তজা হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে গোলাম মোর্তজা হোসেনের সরকারি মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে বক্তব্যের বিষয়সমূহ উল্লেখ করে শুক্রবার রাতে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
স্ট্যান্ড রিলিজের (অবমুক্তি) বিষয়টি জানতে বেবিচক সদস্য (এটিএম) এয়ার কমডোর মো. নূর-ই-আলমের মুঠোফোনেও যোগাযোগ করা হয়। তিনিও ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্যের বিষয় সমূহ উল্লেখ করে শুক্রবার রাতে খুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো তার উত্তর পাওয়া যায়নি।
