ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও :মানবজাতিকে সুপথ প্রদর্শন করার জন্য, সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার জন্য এবং সৃষ্টিকর্তার মহিমা ও ভালোবাসা প্রচারের জন্যই ঈশ্বরপুত্র যিশুখ্রিস্ট পরিত্রাণকর্তা হিসেবে এ ধরাধামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
সাধু যোহনের ভাষায়- ‘ঈশ্বর জগৎকে এত ভালোবাসলেন যে, নিজের একমাত্র পুত্রকে দান করলেন’ (যোহন : ১৬)। আর যিশু মানবদেহ ধারণ করে মর্ত্যরে সঙ্গে স্বর্গের এবং মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের ভালোবাসার অপূর্ব মিলন সাধন করলেন।
ঈশ্বর যে আমাদের নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন, তিনি যে সবসময় আমাদের সঙ্গে আছেন এবং আমাদের সবসময় ক্ষমা করেন- সেই সত্যটিই যিশু তার সমগ্র জীবন ও কর্ম দিয়ে আমাদের কাছে প্রচার করেছেন। তার অপর একটি নামও হল ‘ইম্মানুয়েল’, যার অর্থ- ‘ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে’।
ঈশ্বরপুত্র হয়েও যিশু নিজে যন্ত্রণাময় ক্রুশীয় মৃত্যু ধারণ করে সমগ্র মানবজাতিকে মুক্তির আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন। পৃথিবীতে এ মুক্তিদাতার আবির্ভাব ঘটেছিল শান্তি, একতা, মিলন ও ভালোবাসার রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে। তাই এ মহান পরিত্রাণকর্তার জন্মক্ষণ তথা বড়দিন উপলক্ষে সমগ্র বিশ্বের খ্রিস্টবিশ্বাসী মুক্তি আর মিলনের আনন্দে মেতে ওঠে।
অনেক সময় আমরা আনন্দ ও সুখ শব্দ দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করি। কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থে আনন্দ শব্দটি একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ সুখের সঙ্গে জাগতিক অর্থ-সম্পদের বিষয়টি জড়িত থাকে, অর্থাৎ জাগতিক অর্থ-সম্পদ দিয়েই আমরা সুখের মাপকাঠি নির্ধারণ করি।
কিন্তু আনন্দ শব্দটি একেবারেই ঐশ্বরিক। আমরা যখন ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করি, তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা উপলব্ধি করি, তখনই আনন্দিত হই। আর যিশুখ্রিস্টই বিশ্বের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব মানুষের মধ্যে এ আনন্দের বার্তা নিয়ে এসেছিলেন।
তিনিই আমাদের ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের পথপ্রদর্শন করেছেন এবং ঈশ্বরের ভালোবাসা আমাদের কাছে প্রকাশ করেছেন। এ জন্যই বড়দিনে আমরা ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আশায় আনন্দে মেতে উঠি।
বড়দিন আমাদের প্রেমের শিক্ষা দেয়। যোহন ৩:১৬ পদের আলোকে- মানুষের কোনো ধর্ম-কর্মের ফল নয়, প্রার্থনার বা কোনো যাজ্ঞার ফল নয়। ঈশ্বর স্বেচ্ছায় আমাদের পরিত্রাণের জন্য নিজ প্রিয়পুত্রকে দান করলেন। মানুষের উচিত ঈশ্বরের প্রেমের প্রতি সাড়া দেয়া। প্রকৃত প্রেম স্বর্গ থেকে আসে (১ করিন্থীয়, ১৩ অধ্যায়)।
ঈশ্বর আমাদের কাছে যিশুখ্রিস্টকে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন। তাই বড়দিনের মধ্য দিয়ে আমরা একে অন্যের জীবনে উপহার হয়ে উঠি। একে অন্যের শান্তির কারণ হয়ে উঠি। বড়দিন আমাদের শান্তি ও আনন্দ দান করে। ইলিশাবেৎ যখন মরিয়মের কাছ থেকে যিশুর আগমন বার্তা শুনেছিল তখন তার গর্ভের সন্তান যোহন বাপ্তাইজক আনন্দে নেচে উঠেছিল।
শিমিয়ন জেরুজালেম মন্দিরে শিশু যিশুকে কোলে তুলে নিয়ে আনন্দে বলে উঠেছিল, ‘আমার নয়ন যুগল পরিত্রাণ দেখিতে পাইল’ (লূক ২:১০)। তাই যখনই আমরা পাপের জীবন ত্যাগ করে খ্রিস্টকে মুক্তিদাতা ত্রাণকর্তা বলে গ্রহণ করি, তখনই আমরা পরিত্রাণের আনন্দ উপলব্ধি করি।
বড়দিন আমাদের পরিত্রাণের নিশ্চয়তা দেয়। প্রেরিত ৪:১২ পদে আছে- ‘আকাশের নিচে, মনুষ্যদের মাঝে আর কোনো নাম নেই, যে নামে পরিত্রাণ পাইতে পারি।’ কিন্তু মানুষ যখন পাপের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছিল, মুক্তি লাভের সব পথ যখন রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন যিশুর জন্মের মধ্য দিয়ে মানুষ পরিত্রাণের পথ খুঁজে পেল।
যিশু আমাদের পাপের শাস্তি নিজের স্কন্ধে নিয়ে ক্রুশীয় মৃত্যুকে বরণ করলেন। কবরপ্রাপ্ত হলেন, তিন দিন পর মৃত্যুকে জয় করে কবর থেকে পুনরুত্থিত হয়ে প্রায়শ্চিত্ত সাধনের মধ্য দিয়ে আমাদের জন্য পরিত্রাণের সুযোগ করে দিলেন। যেন আমরা পাপ থেকে পরিত্রাণ লাভ করি।
যোহন ১:২৯ পদে আছে- ‘ওই দেখ ঈশ্বরের মেষশাবক, যিনি জগতের পাপভার লইয়া যান।’ এ জগতে অনেক ধর্ম প্রবর্তক, অনেক ভাববাদী কিংবা মহাপুরুষ এসেছেন, যারা মানুষের কাছে মুক্তির বাণী প্রচার করেছেন; কিন্তু কেউ বলতে পারেননি- আমার কাছে এসো, আমি তোমাদের মুক্তি দেব, পাপ সব ক্ষমা করে পরিত্রাণ দেব। কেবল প্রভু যিশুই মানুষের পাপ ক্ষমা করেছেন এবং পরিত্রাণ দিতে চেয়েছেন। তাই আমরা বড়দিনে পরিত্রাণের আশায় আনন্দে মেতে উঠি।
বড়দিন আমাদের বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। ঈশ্বর ঈশ্বর হয়েও মানুষের ভাষায় কথা বলেছেন। আর ঈশ্বরের ভাষা ভালোবাসার ভাষা, তা যিশু তার সমগ্র জীবনে প্রচার করেছেন। যারা যিশুর এই ভালোবাসার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঈশ্বরের ভালোবাসায় সিক্ত হন, তারা পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ হন- তাই তারা পরস্পরের ভাইবোন হয়ে ওঠেন।
কেননা ঈশ্বর হলেন আমাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি আমাদের পিতাস্বরূপ। যখন আমরা ঈশ্বরকে পিতা বলে সম্বোধন করি, তখন সমগ্র বিশ্ব একটা মানব পরিবার হয়ে ওঠে আর আমরা সেই পরিবারে একে অপরের ভাইবোন হয়ে উঠি।
এই বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ আমাদের সব ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ, জুলুম-নির্যাতন, সংঘাত, হানাহানি পরিহার করে শান্তি, সম্প্রীতি ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে পরস্পর মিলেমিশে বাস করার অনুপ্রেরণা জোগায়।
ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও, সিএসসি : অধ্যক্ষ, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা। যুগান্তর
