একুশে বার্তা ডেক্স : : আগামী দিনে আর প্রতিবাদ নয়, এখন থেকে জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব। তিনি বলেন, আর কালো ব্যাজ ধারণ নয়, এখন থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে। একই অনুষ্ঠানে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, প্রশাসনকে ব্যবহার করে সরকার ক্ষমতা ধরে রাখলেও দেশে রাজনৈতিক সংকট রয়ে গেছে। : গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসকাবের সামনে ‘ভুয়া’ ভোটের প্রতিবাদে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কালো ব্যাজ ধারণ কর্মসূচিতে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে গত ৩০ জানুয়ারি একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের দিন সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত জাতীয় প্রেসকাবের সামনে এক ঘন্টার মানববন্ধন করে এই ভোট বাতিলের দাবিতে। আওয়ামী লীগ ও তাদের রাজনৈতিক মিত্র দলগুলো থেকে নির্বাচিতরা শপথ নিয়ে বিকালে অধিবেশনে যোগ দিতে চললেও বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফন্টের বিজয়ী সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একাদশ নির্বাচনে ভুয়া ভোটের প্রতিবাদে বিকাল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত এই মানববন্ধন কর্মসূচি হয়। নেতাকর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ লাগিয়ে শতাধিক এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মানববন্ধন উপলে প্রেসকাবের বাইরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। : একাদশ সংসদ নির্বাচনে ১১৭ ভাগ ভোট ডাকাতি হয়েছে বলে অভিযোগ করে আ স ম আবদুর রব বলেন, ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন হয় নাই, নির্বাচনের নামে নাটক হয়েছে। ৩০ তারিখ ভোট হওয়ার কথা, ২৯ তারিখে ভোটের ডাকাতি হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে সূচক হলো এক শ। বাংলাদেশে ভোট ডাকাতি হয়েছে এক শ ১৭ পয়েন্ট তিন পারসেন্ট। এর মধ্যে ৯৭ দশমিক ৩ পারসেন্ট হলো ব্যালেটে ডাকাতি, ৫ পারসেন্ট যারা নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত ছিল ভোট দিতে পারে নাই, ৫ পারসেন্ট হলো যারা মারা গিয়েছে, বিদেশে আছেন, ১০ পারসেন্ট হলো গার্মেন্ট শ্রমিকসহ যারা ভোট দিতে পারে নাই। মোট হচ্ছে ১১৭ দশমিক ৩। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ধরনের জালিয়াতি, এক শ উপরে ১১৭। ঠকের ওপরে বাটপার, বাটপারের ওপরে বাটপারিÑ এটা বিশ্বের আর কোথাও হয়েছে বলে শুনিও নাই, বই-পুস্তকে পড়ি নাই, দেখিও নাই। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের চেতনাকে, মানুষের বিবেককে হত্যা করে ৩০ তারিখে ভোটের ফলাফলের নামে নাটক করে, আইনশৃঙ্খলা রাবাহিনীর কিছু লোক, প্রশাসনের একটি অংশ মিলে যে ডাকাতি করেছে সেই ডাকাতিতে শকুনরা আজকে উৎসব করছে। শকুনদের মেলা বসেছে। ৩০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রের ভিত্তি, মতার বিভাজন, সংবিধানের নির্দেশনা সব ধ্বংস করেছে। পৃথিবীর কোথাও এই ধরনের নিষ্ঠুর-নির্মম কান্ড ঘটে নাই। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সকল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে দলের অধীনে নেয়া হয়েছে। এখন পুরস্কার দেয়া হচ্ছে, যারা ভোট ডাকাতি করেছে। ঘুষ দেয়া হয়েছে ইউনিয়ন পর্যন্ত শিকদের। যারা নিতে চায়নি তাদের বলেছেন যে, না নিতে চাইলে দান করে দেবেন কিন্তু নিতে হবে। হাজার হাজার কোটি টাকার ঘুষ দেয়া হয়েছে সারা বাংলাদেশে প্রশাসন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী এবং নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার, পোলিং অফিসার সবাইকে ঘুষ দেয়া হয়েছে। যে রাষ্ট্রের সকল প্রশাসন দুর্নীতি ও ঘুষ খাইয়া ভোট ডাকাতি করে সে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকে না। আ স ম রব হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আজকে কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রতিবাদ করছি। আমরা অপো করে আছি আগামীতে জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে। আগামী ২৪ তারিখে কী কী অপকর্ম করেছেন, কী কী ডাকাতি করেছেন সমস্ত কিছু উলঙ্গ করে দেয়া হবে। আমি বলতে চাই, রাষ্ট্রকে রায় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কর্মজীবী-পেশাজীবীসহ জনগণকে সাথে নিয়ে ঐক্য গড়তে হবে। শুধু ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, আন্দোলন করতে প্রস্তুতি নিতে হবে। বক্তব্যের শুরুতে রব বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে ৫-৬ জন লোক জীবিত আছেন তাদের মধ্যে একজন ড. কামাল হোসেন। উনার ডান পায়ে অস্ত্রোপচার হয়েছে, বাম পায়ে অস্ত্রোচারের জন্য কমপে ৩-৪ সপ্তাহ দেশের বাইরে থাকা দরকার। দেশের রাজনীতির কারণে উনি ৫-৭ দিনের বেশি দেশের বাইরে থাকেন না। আজকে উনার পায়ের ব্যথা অত্যধিক বেড়েছে। সে জন্য কালোব্যাজ ধারণ মানবন্ধনের এই কর্মসূচিতে ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন উপস্থিত হতে পারেননি। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না এই তিন জনই চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেছেন। একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের কারণে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এই কর্মসূচি আসতে পারেননি। আমরা দৃঢ়তার সাথে বলছি, ঐক্যফ্রন্ট ছিল, ঐক্যফ্রন্ট আছে, ঐক্যফ্রন্ট থাকবে। বিএনপির কারাবন্দি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির মুক্তির দাবিও জানান রব। এ সময় বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে নেতাকর্মীরা সোগান দিতে থাকে। : প্রধান বক্তার বক্তব্যে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ২৯ ডিসেম্বর রাতেই নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। আমরা নির্বাচন বাতিল চেয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে দাবি করেছি। ইতিহাসের পেছনে ফিরে গেলে দেখবেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটবিহীন নির্বাচন হয়েছে। মিডিয়ার কল্যাণে আমরা দেখেছি সেদিন ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়েছে কুকুর ও বেড়াল, কোনো ভোটার ভোট দেয় নাই। কিন্তু দেশের মানুষ কখনোই কারো অন্যায় মেনে নেয়নি। আবারো মানবে না। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন হয়নি, প্রহসন হয়েছে। দেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া জানে দেশে কীভাবে প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে। এবারের নির্বাচনে প্রমাণ হয়েছে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নিরপে নির্বাচন হতে পারে না। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই, মতা দখল করে দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা অবসান হবে না। এই সরকারের অন্যায় শাসন বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে না। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বন্দি করে বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। মানুষের ভোটাধিকারকে ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের পুলিশ, বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। মেগা উন্নয়নের নামে তারা মেগা দুর্নীতি করছে। এই হলো বর্তমান সরকারের উন্নয়নের নমুনা! এটাই একটা স্বৈরাচারী সরকারের চরিত্র। ভোট দখলের পর সরকার দেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরো দীর্ঘায়িত করেছে। এভাবে তো গণতান্ত্রিক অধিকারের সংকট নিরসন হবে না। অথচ এজন্য কিন্তু দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেনি। সরকারকে একদিন জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ইনশাআল্লাহ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনব। : গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি শেখ হাসিনা গণতন্ত্রকে লাইফ সাপোর্টে পাঠিয়েছে। আর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ডেড (মৃত) করে দিয়েছে, গণতন্ত্রকে এখন আমাদের দেশে লাশ বানিয়েছে। সেই লাশের ওপর দাঁড়িয়ে আওয়ামী নেতারা নৃত্য-কীর্তন করছে। আহা কী বিজয়! অন্তরে তো অনেক জ্বালা। মুখে শুধু হাসি দেখা যায়Ñ এটার নাম হচ্ছে কাষ্ট হাসি। যে সরকার সবকিছু ধ্বংস করে দেয় তার কাছে গণতন্ত্র অর্থহীন, সংবিধান অর্থহীন, বিচার বিভাগ অর্থহীন। আজকে জনগণের মধ্যে যে আহাজারি হচ্ছে, সেই আহাজারিতে একদিন এই সরকার ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘নির্লজ্জ সরকার! বিশ্বের কোথাও এ ধরনের সরকার আর নেই। ফ্যাসিবাদী, স্বৈরাচারকে ছাড়িয়ে গেছে। ৫ জানুয়ারি এক কান কাটা গিয়েছিল। এবার তার পূর্ণতা পেয়েছে। তারা নোবেল পাক!’ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সরকার ব্যর্থ হওয়ায় তার কঠোর সমালোচনা করেন ঐক্যফ্রন্টের এই নেতা। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ডেকে আনল কিন্তু তাদের ফেরত পাঠানোর মুরদ নেই সরকারের। : গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ২৯ ডিসেম্বর রাতে বাংলাদেশে জনগণের অধিকার লুন্ঠন হয়েছে। বিনা জানাজায় ৩০ ডিসেম্বর তাকে কবর দেয়া হয়েছে। এই কবর যারা দিয়েছে আমলাদের সাথে পুলিশ বাহিনী তাদের পুরস্কার দেয়া শুরু হয়েছে। আপনারা দেখেছেন গত দুদিন যাবত পুলিশরা একের পর এক তাদের পুরস্কার গ্রহণ করছেন। তারা (পুলিশ বাহিনী) দুটা পুরস্কারের কথা বলতে ভুলে গেছেন। একটা তাদের কতজনকে অ্যাম্বেসেডর বানাতে হবে সেই দাবিটা করেন নাই। আরেকটা তাদের কতজনকে মন্ত্রী বানাতে হবেÑ সেই দাবি করেন নাই। অপোয় থাকেন, সামনে দেখবেন প্রশাসন ও পুলিশের রঙ্গলীলা। : বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালামের সভাপতিত্বে ও গণফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক মোশতাক আহমেদ ও বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদের পরিচালনায় কালোব্যাজ ধারণ ও মানববন্ধনে আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আউয়াল খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, জেএসডির আবদুল মালেক রতন, গণফোরামের জগলুল হায়দার আফ্রিক, রফিকুল ইসলাম পথিক, নাগরিক ঐক্যের শহীদুল্লাহ কায়সার, মমিনুল ইসলাম, জনদলের এটিএম গোলাম মওলা চৌধুরী প্রমুখ। : এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অধ্যাপিকা সাহিদা রফিক, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম হাবিব, স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা, সহ-জলবায়ুবিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, সহ-প্রচার সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম, নির্বাহী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন ভূঁইয়া শিশির, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইসতিয়াক আজিজ উলফাত, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা নবীউল্লাহ নবী, স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আলী, স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন, সাধারণ সম্পাদক গাজী রেজওয়ানুল হোসেন রিয়াজ, ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল দক্ষিণের সভাপতি এস এম জিলানী, সহ-সভাপতি মো. রফিক হাওলাদার, গণফোরামের আ ম সা আমিন, ছাত্রদলের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রাজিব আহসান পাপ্পু, শাহবাগ থানা কৃষক দলের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম, বিকল্পধারার শাহ আহমেদ বাদলসহ হাজার হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। : :
