একুশে বার্তা ডেক্স : আজ মহান মে দিবস। এ দিবসে এলেই নারী শ্রমিকদের নিয়ে আমরা সোচ্চার হই, কিন্ত প্রতিনিয়তই নারী শ্রমিকরা বন্ঞিত। পোশাক কারখানার প্রায় ৯০ শতাংশ নারী। কারুশিল্পে নারীর সংখ্যা ৩০ লাখ। অথচ তাদের কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই। দেশের অর্থনীতিতে তাদের শ্রমের কোনো মূল্যায়ন নেই।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক জরিপ অনুযায়ী, নারীর মোট গৃহস্থালি শ্রম যোগ করলে তা অনেক দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের অর্ধেকের মতো হয়। তাদের অনেক কাজই অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে। তবে মে দিবস এলেই নারীর অধিকার নিয়ে সবাই সোচ্চার হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী ও পুরুষ শ্রমিক সবাই আইনের দৃষ্টিতে সমান। অথচ পরিবার-কর্মস্থল-সমাজ-রাষ্ট্র সর্বত্রই তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এ বৈষম্য নারীর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে।
নারীর শ্রমের মর্যাদা নিয়ে এমন প্রশ্নের মুখে প্রতিবছরের মতো এবারও সারা দেশে মহান মে দিবস পালিত হতে যাচ্ছে।
মে দিবসের এ বছর বাংলাদেশে প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে- ‘শ্রমিক মালিক ভাই ভাই, সোনার বাংলা গড়তে চাই।’
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। সরকারিভাবে দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- মে দিবসের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সেমিনার।
সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম জানান, নারী-পুরুষের শ্রমমূল্যে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। আমাদের দেশের চাকরিদাতারা সব সময় চায় কত কম মজুরি দিয়ে শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানো যায়। সমাজের দুর্বল অংশ নারীকে তারা বেশি বঞ্চিত করার সুযোগ পায়।
নারী শ্রমিকের নিচে আর কোনো সস্তা শ্রমিক পাওয়া যায় না। এমন বৈষম্য রুখতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার হতে হবে জানিয়ে সেলিম আরও বলেন, শ্রমজীবী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে গৃহশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি। তাদের অনেকে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। পাঁচ থেকে ১৭ বছরের বেশি গৃহশ্রমিক নামমাত্র বেতন এবং দুই বেলা খাবারের বিনিময়ে প্রায় ২০-২১ ঘণ্টা শ্রম দিয়ে যাচ্ছে।
তাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই, নেই কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা। তারা সাপ্তাহিক ছুটিও পায় না। শিক্ষার অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত।
বিলস সূত্র জানায়, ২০১৫-২০১৬ সালে ১৯০ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছে গৃহকর্মীদের ৭০ শতাংশের বেশি শিশু। বিদেশে যেসব বাঙালি নারী শ্রমিক গৃহশ্রমে কাজ করে, সেখানেও তাদের প্রতারণা ও বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। অনেকে শারীরিক অত্যাচার, নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে আসছেন।
তৈরি পোশাক শিল্প খাতে চীনের পর বাংলাদেশের অবস্থান। এ খাতে আনুমানিক চার কোটি শ্রমিক কাজ করেন। তাদের বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। বাংলাদেশে রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে তৈরি পোশাক শিল্প। এখানে মজুরিবৈষম্য ব্যাপক।
সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার যুগান্তরকে জানান, ন্যূনতম বেতন ১৬ হাজার টাকা করার দাবিতে তারা মাঠে আছেন। চরম ঝুঁকির মধ্যে নারীরা কাজ করছেন। নারী নেত্রী নাজমা আরও বলেন, বেশির ভাগ নারী শ্রমিকই চুক্তিভিত্তিক কাজ করছেন। তাদের নিরাপত্তাও নেই।
তিনি বলেন, বর্তমানে একজন নারী শ্রমিকের যে ন্যূনতম মজুরি রয়েছে, তা দিয়ে তার সংসার কোনোক্রমেই চলে না। বাসাভাড়া দিতে গিয়েই নারী শ্রমিকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সমান কাজ করেও বেশির ভাগ নারী সমান মজুরি পান না। অধিকাংশ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার না থাকায় পোশাক শিল্পের নারীরা যখন-তখন ছাঁটাইয়ের শিকার হন।
সোমবার তীব্র রোদের মধ্যে রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছিলেন ৫-৭ জন নারী। শ্রমিক আফসানা বেগম জানান, ভোর থেকে তারা কাজ শুরু করেন। রাত পর্যন্ত কাজ করেন।
একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা মজুরি পান আর নারীরা পান ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা। তিনি আরও বলেন, তাদের যোগ্যতা থাকলেও মিস্ত্রি হিসেবে তাদের নেয়া হয় না।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নামমাত্র মজুরি দিয়ে তাদের সহযোগী হিসেবে নেয়া হয়। অনেক নারীকে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা দেয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুরুষ শ্রমিক জানান, বিষয়টি তাদের কাছেও খারাপ লাগে। কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারেন না। কারণ তারা সবাই সরদার ধরে কাজে আসেন। সরদারের বাইরে কোনো কথা বলা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে নারী শ্রমিকরা বেশি কাজ করেন বলেও তিনি স্বীকার করেন।
রাজধানীতে নারী নির্মাণ শ্রমিকের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু বৈষম্য কমছে না। কর্মক্ষেত্রে প্রায় সব স্তরেই নারী তীব্র মজুরিবৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কৃষি খাতে নারীর সবচেয়ে বেশি অবদান থাকলেও স্বীকৃতি দেয়া হয় না। কৃষিকাজের ২১টি ধাপের মধ্যে নারীরা ১৭টি ধাপের কাজ করেন। এরপরও নারী কৃষক বা কৃষান হতে পারেননি।
কৃষি খাতের ৪৫ দশমিক ছয় শতাংশ কাজই নারীরা বিনামূল্যে করেন। কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ। বর্তমানে কৃষি খাতে পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে সাড়ে তিন শতাংশ। এ
রপরও কৃষিতে নারীর কাজের স্বীকৃতি নেই। ২০১১ সালের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে নারীর মজুরিবৈষম্য দূর করতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের জাতীয় কৃষি নীতিতেও ‘কৃষিতে নারী’ নামে একটি ধারা যুক্ত করা হয়।
এতে কৃষি উপকরণ, কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড, সার, বীজ, ঋণ সুবিধাসহ নারী-পুরুষের সমান সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কৃষিতে নারীর স্বীকৃতি আলোর মুখ দেখেনি।
এ বিষয়ে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম যুগান্তরকে জানান, কৃষিতে নারীর শ্রমের মূল্য একেবারেই মূল্যায়ন করা হয়নি। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছি, কৃষিতে নিয়োজিত নারীর যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দেয়া হোক। জমিতে বীজ বপন করা থেকে শুরু করে বাজারে শস্য বিক্রি করা পর্যন্ত নারীরা শ্রম দিয়ে আসছেন।
কৃষিতে নারীর শ্রমের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দিয়ে তা জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সবক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। ন্যায্য মজুরি দেয়া হয় না।
গৃহশ্রমের স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ২৩নং ধারায় উল্লেখ আছে- কোনোরূপ বৈষম্য ছাড়া সব কাজের জন্য সমান বেতন পাওয়ার অধিকার আছে প্রত্যেকের। নারীরা কাজও করেন, রোজগারও করেন। তবু তারা অদৃশ্য, তাদের কোনো স্বীকৃতি নেই।
মে দিবসের কর্মসূচি : সকাল ৭টায় শ্রম ভবনের সামনে থেকে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হকের নেতৃত্বে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে। শোভাযাত্রাটি দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে বায়তুল মোকাররম উত্তর দিক দিয়ে পল্টন মোড় অতিক্রম করে জাতীয় প্রেস ক্লাবে গিয়ে শেষ হবে। এছাড়া বিকাল ৪টায় বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে শ্রমিক দিবসের মূল আলোচনা অনুষ্ঠান হবে। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভাপতিত্ব করবেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মজিবুল হক।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশ অফিসের প্রধান গগন রাজভান্ডারি, শ্রমিক লীগের সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া বিভিন্ন শ্রমিক ও সাংস্কৃতিক এবং পেশাজীবী সংগঠন আলোচনা, শোভাযাত্রা, সমাবেশ ও নাট্যাংশ প্রদর্শনীর মাধ্যমে দিবসটি পালন করবে।
Share this:
- Click to share on Facebook (Opens in new window)
- Click to share on Twitter (Opens in new window)
- Click to share on LinkedIn (Opens in new window)
- Click to share on Tumblr (Opens in new window)
- Click to share on Pinterest (Opens in new window)
- Click to share on Pocket (Opens in new window)
- Click to share on Reddit (Opens in new window)
- Click to share on Telegram (Opens in new window)
- Click to share on WhatsApp (Opens in new window)
- Click to print (Opens in new window)
