সাংবাদিক-এমপি- কর্মচারির নামে-বেনামে দোকানের উচ্ছিস্ট ময়লা –আর্বজনা আর রানওয়ের বদ্ধ জলাশয়ে মশকের জন্ম বিস্তার : শাহজালাল বিমানবন্দরে মশার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে ধূপ থেরাপি : ভেজষ থেরাপি আসছে

একুশে বার্তা প্রতিবেদন :  শাহজালাল বিমানবন্দরে  দেশি-বিদেশি যাত্রী, দর্শনার্থীসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মশা-মাছি আর ইঁদুর-বিড়ালের উৎপাতে  অতিষ্ঠ। কর্তৃপক্ষ ক্রাশ প্রোগ্রাম চালিয়েও মশার জন্ম ঠেকাতে পারছে না।

মশার  উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতে শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আধুনিক কোনো অবলম্বনের পরিবর্তে ফিরে গেছেন সনাতন পদ্ধতিতে। কোনোভাবেই মশা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় টোটকা হিসেবে তারা বেছে নিয়েছেন ধূপ থেরাপি। গত শনিবার সন্ধ্যায় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ দুটি টার্মিনাল, রানওয়েসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় মশা তাড়াতে ৫০টি মাটির হাঁড়ি বসিয়েছে যেগুলোতে ধূপ জ্বালানো হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় হাঁড়িগুলোতে নারকেলের ছোবড়া দিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে ধোঁয়া সৃষ্টি করে মশা নিধনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু সনাতন এই থেরাপিকে মশককুল থোড়াই কেয়ার করছে। মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই তো মেলেইনি উল্টো ধূপের ধোঁয়ায় গোটা কনকর্স হল ধোঁয়াময় হয়ে উঠছে। ধূপ ব্যবহার করে মশা তাড়াতে গিয়ে ধূপের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে বিমানবন্দর। এতে বহিঃবিশ্বে এ দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই। দেশি-বিদেশি যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এমন মন্তব্য পাওয়া গেছে।

এদিকে বিমানবন্দরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ধূপ থেরাপিতে কাজ না হলে মশা নিধনে নিমপাতা, নিশিন্দা, হলুদ, পাতিলেবু, কর্পূরসহ বেশ কিছু ভেষজ পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডেপুটি ডাইরেক্টর মোশাররফ হোসেন জানান , টার্মিনালের গেটগুলোয় শুধু সন্ধ্যাবেলায় কিছু সময়ের জন্য পাইলট প্রকল্প হিসেবে ধূপ জ্বালানো হয়। মশা তাড়াতে শুধু ধূপ জ্বালানোই নয়, আধুনিক পদ্ধতির ইউএলবি স্প্রে, মসকুইটো টেপ, এয়ারকার্টার ব্যবহার করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ মশক নিধনে যৌথভাবে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে জানান তিনি।

গত ২২ জানুয়ারি সকালে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ দোলনচাঁপায় ইঁদুরের কামড়ে এক নারী অতিথি আহত হওয়ার ঘটনায় হুলুস্থূল বেধে যায়। পায়ের ক্ষতস্থানে ভ্যাকসিন পর্যন্ত নিতে হয়েছে তাকে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে মশার উৎপাতের কারণে আলফা-২ বে এরিয়া থেকে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের এমএইচ ১৯৭ ফ্লাইটটি ছাড়তে নির্দিষ্ট সময় থেকে দুই ঘণ্টা বিলম্ব হয়। বিমানের ভেতরে যাত্রীরা মশার উৎপাতে বসে থাকতে পারছিলেন না। তাই উড়োজাহাজটি রানওয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরও ফিরে আসতে বাধ্য হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা কেবিন ক্রুরা ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিধনের পর ফের ফ্লাইটটি উড্ডয়ন করে। এ ঘটনার পর মশা তাড়াতে কয়েক দফায় বৈঠক করে সিভিল এভিয়েশন ও শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। পরামর্শ চাওয়া হয় ডিএনসিসির কাছে। এর পর রানওয়ে ও টার্মিনালগুলোর জলাশয় ও ঝোপঝাড় ছেঁটে ফেলার উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ।

ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের (আইকাও) রুলস অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানের প্রতিটি বিমানবন্দরে মশা-মাছি নিধনে আলাদা ইউনিট থাকার কথা থাকলেও শাহজালাল বিমানবন্দরে তা নেই। মশার যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ পেতে ১৯৮১ একর বিস্তৃত বিশাল এই এলাকায় বিমানবন্দরের ওয়েলফেয়ার শাখা মশক নিধনের কাজ করছে ধার করা লোকবল দিয়ে। ক্লিনিং সেকশন থেকে আনা ৪ জনকে দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। শুধু শাহজালাল বিমানবন্দরই নয়, দেশের কোনো বিমানবন্দরেই মশা-মাছি নিধনে আইকাও রুলস মানা হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনোটিরই নেই মশা নিধনের জন্য পৃথক ইউনিট।

সম্প্রতি মশা-মাছি আর ইঁদুর-বিড়াল দমনে উঠেপড়ে লাগে কর্তৃপক্ষ। মশা তাড়াতে ডিএনসিসি ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে দশ দিনের ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ও গ্রহণ করে। এতে কিছুটা পরিত্রাণ মিললেও বর্তমানে থমকে আছে এই কর্মসূচিও।

সরেজমিনে বিমানবন্দরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, টার্মিনাল ভবনের সামনে পরিবহন কাউন্টারগুলোকে সাংবাদিক ও এমপির নামে দোকানপাট বরাদ্দ দেয়ায় উচ্ছিস্ট নোংরা ময়লা আবর্জনাময় ও ঘিঞ্জি পরিবেশে চারদিকে মশার উপদ্রব। কী দিন, কী রাত মশার কামড়ে অতিষ্ঠ কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাই। শান্তি উবে গেছে যাত্রীদের। শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ একাধিক যাত্রী জানান, বিমানবন্দরের ভেতরে ভিআইপি ওয়েটিং রুমসহ সর্বত্রই মশার উৎপাত। বিমানে ওঠার আগে বিশ্রামের স্থানে বসতে গিয়ে পোহাতে হয় মশার কামড়ের জ্বালা-যন্ত্রণা। বোর্ডিং পাস কাউন্টার, ইমিগ্রেশন, বিশ্রামাগার, টয়লেটসহ সর্বত্রই মশার উপদ্রব। যেসব যাত্রী শেষরাতের দিকে বন্দরে অবতরণ করেন, তাদের অবস্থা হয়ে যায় শোচনীয়। ভোর পর্যন্ত বিমানবন্দরে বসে অপেক্ষা করার সময় মশার কামড়ে ভীষণ ভোগান্তি পোহাতে হয় তাদের। বাধ্য হয়ে মশা-মাছির উৎপাত সহ্য করছেন বন্দরে দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওয়েলফেয়ার শাখার কর্মকর্তা মোহম্মদ সেলিম মিয়া জানান , জনবলের অভাবে মশা-মাছি তাড়ানোর কাজে অনেকটাই বেগ পেতে হচ্ছে। মাত্র চারজন জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমে মশকনিধনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সিভিল এভিয়েশনের অরগানোগ্রামে এ পদে পোস্ট সংযুক্ত করে জনবল বাড়ানো হলে মশামাছি তাড়ানোর কাজে গতি আসবে বলে মনে করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিমানবন্দর পরিস্কারকরন কাজের ইজারাদার একে ট্রেডার্স এবং সাংবাদিক- এমপি- সিএএবির কর্মচারি অদুদের আত্মীয়ের নামে ভবনের সামনে ও ভিতরের দোকানপাটের উচ্ছিস্ট ময়লা, নিয়মিত বিমানবন্দর পরিস্কার না করা এবং রানওয়ের জলাশয়ে মমকের জন্ম হচ্ছে। তাছাড়া দোকানের উচ্ছিস্ট খাবারের সন্ধ্যানে পাখি আসায় বিমান চলাচলও ঝুকিপূর্ন হয়ে ওঠছে।