একুশে বার্তা রিপোর্ট : মার্চ থেকে জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মূল্যের দুটি বড় স্বর্ণের চালান জব্দ করা হয়েছে। এর সাথে বিমানসহ চোরাচালান সিন্ডিকেড জড়িত তদন্ত সংস্থা সন্দেহ করছে, বিমানের ৭ জনকে সন্দেহজনকভাবে ডেকে জিঙ্ঘাসাবাদ করা হয়েছে, বাকিরা নজরদারিতে। বিমানের জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, ব্যক্তির দায় নেবে না বিমান কর্তৃপক্ষ।
জানা যায, ৩ মাসের ব্যবধানে দুটি সোনার চালানই এসেছে দুবাই থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পৃথক দুটি ফ্লাইটে। চোরচালানি সিন্ডকেড একই রুট, একই এয়ারলাইন্স এবং প্রায় একই পরিমাণ স্বর্ণ চোরাচালানি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে-যা জব্দের ঘটনা একটি সংঘবদ্ধ চোরাচালান সিন্ডিকেডের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
এ দুটি ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় পৃথক মামলা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ৭ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ফ্লাইট দুটিতে দায়িত্ব পালনকারী প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ডিউটি রোস্টার, দায়িত্ব বণ্টনের নথি ও অন্যান্য তথ্য তদন্তের জন্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বিমান দুটি জব্দ করা হয়নি।
মামলার এজাহারে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ নেই। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা ধরে টান দিচ্ছে পুলিশ।
যেসব স্থান থেকে স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে, সেগুলো সীমিত প্রবেশাধিকারসম্পন্ন এলাকা। সেখানে কারা দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কারা প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন, এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৮ মার্চ দিবাগত রাতে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টসংলগ্ন টয়লেটের প্যানেলের ভেতর সাদা কাপড়ে মোড়ানো ১৫৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এসব বারের মোট ওজন ছিল ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম। ২৪ ক্যারেটের এ স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা।
ওই ঘটনার পর তদন্তের স্বার্থে বিমানের সাতজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কয়েকজনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা যাচাই-বাছাই করছেন তদন্তকারীরা। তবে তদন্ত চলায় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সূত্র আরও জানায়, প্রথম ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে নজরদারিতে থাকা ব্যক্তিদের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কেউ দেশত্যাগ বা আত্মগোপন করার সুযোগ না পান।
এদিকে গত ২ জুলাই দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আরেকটি ফ্লাইট থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ। উদ্ধার হওয়া এ চালানের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এ ঘটনাতেও বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়েছে। দ্বিতীয় মামলাতেও এখন পর্যন্ত কারও নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়নি।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, দুটি ঘটনার মধ্যে বেশকিছু মিল রয়েছে। স্বর্ণ আনার কৌশল, ব্যবহৃত রুট এবং এয়ারলাইন্সের মিল তদন্তকে একই চক্রের দিকে ইঙ্গিত করছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ চলছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম বলেন, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান বহন করবে না। দুটি ঘটনাই তদন্তাধীন। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে পরপর দুটি বড় চালান উদ্ধারের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমিত প্রবেশাধিকারযুক্ত এলাকায় কীভাবে স্বর্ণ পৌঁছাল, কারা এ সুযোগ করে দিল এবং এর পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্ক রয়েছে কিনা, এসব বিষয়ই এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা গেলে শুধু একটি অপরাধচক্র ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জন-আস্থাও সুদৃঢ় হবে।
