ডেস্ক রিপোর্ট: দুর্নীতির কালো টাকায় স্ত্রী-কন্যাদের বেপরোয়া ও বিলাসী জীবন নিশ্চিত করেও ক্ষান্ত হননি তিনি; এবার সরকারি অফিসের চেয়ারম্যানের পদ বাগিয়ে নিতে দালালের সাথে সরাসরি লিখিত চুক্তি করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন সিভিল এভিয়েশনের ক্ষমতাধর কর্মকর্তা এস এম লাবলুর রহমান।
এই শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা ও দালালের মধ্যে হওয়া ৩০০ টাকার জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পের একটি কপি এসেছে দ্য নিউজের হাতে। সেই দলিলের শর্তে বলা হয়, সেই শীর্ষ আমলাকে চেয়াম্যানের চেয়ারে বসিয়ে দিলে কোটি টাকার ক্যাশ এবং সেই দপ্তরের টেন্ডারসহ সকল ব্যবসার অবাধ সুযোগ পাবে দালাল সিন্ডিকেট।
শুধু এই লিখিত চুক্তিই নয়, সেই পদের চেয়ারে বসতে উন্মুখ হয়ে থাকা লাবলুর রহমান নিজের সই করা একটি আলাদা সম্মতিপত্রও জমা দিয়েছেন দালালের হাতে। সই হওয়া সেই সম্মতিপত্রে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, সরকার তাঁকে চেয়ারম্যান বানালে তাঁর কোনো আপত্তি থাকবে না। একদিকে পদ বাগানোর এই লিখিত সম্মতিপত্র, আর অন্যদিকে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পের চুক্তি—দুইয়ে মিলিয়ে পদের এই নজিরবিহীন কেনাবেচায় রীতিমতো নড়েচড়ে বসেছে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
অনুসন্ধানে বলছে, এই জালিয়াতির চুক্তিতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মেম্বার অ্যাডমিন এস এম লাবলুর রহমান এবং ফাহাদ হোসেন সাগর নামের এক দালালের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর পরিষ্কার উল্লেখ আছে, যা বেবিচকের কর্মকর্তারাও সত্য বলে নিশ্চিত করেছেন।
গত ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দুর্নীতিবাজ হিসেবে এই কর্মকর্তার অপসারণের দাবিতে তুমুল আন্দোলন হলেও, এক অদৃশ্য খুঁটির জোরে তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। তার মেজো বোন পঞ্চগড় জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হওয়ায় এবং বিগত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ আশীর্বাদপুষ্ট থাকায় এই সিন্ডিকেট দীর্ঘ সময় ধরে ছিল সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে। ১৯৯৫ সালে আনসার ক্যাডারে থাকাকালীন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা এই কর্মকর্তা পরে ২০১৩ সালে বিসিএস প্রশাসনে ঢুকেও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে করেছেন দেদারসে নিয়োগ বাণিজ্য।
তবে লাবলুর রহমানের দুর্নীতির আসল খেলা শুরু হয় সেতু বিভাগে থাকার সময়। বিশেষ করে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ডিপিডি থাকাকালীন তিনি একাই শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন। এই অপরাধে দুদকের মামলা ও মন্ত্রণালয়ের জিজ্ঞাসাবাদ সত্ত্বেও অলৌকিক ক্ষমতার জোরে সব ধামাচাপা দিয়ে ২০২৪ সালে তিনি সিভিল এভিয়েশনে মেম্বার ফাইন্যান্স হিসেবে বদলি হন। সেখানে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে সরকারি ফাণ্ডের এফডিআর রাখার বিনিময়ে সরাসরি ১ শতাংশ করে ব্যক্তিগত ক্যাশ কমিশন নিতে শুরু করেন তিনি। অথচ তার অতীত ঘাটলে দেখা যায়, ১৯৮৯ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও চুরির দায়ে ১৯৯১ সালেই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
দুর্নীতির এই বিশাল অংকের কালো টাকা দিয়ে এস এম লাবলুর রহমানের স্ত্রী ও প্রিয় সন্তানরা কাটাচ্ছেন এক বেসামাল, বেপরোয়া ও বিলাসী জীবন। তার বড় মেয়ে মালয়েশিয়ায় পড়াশোনার নামে প্রতি মাসে ওড়ান ২০ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা, যা লাবলুর রহমান নিয়মিত হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেন। ছোট মেয়ে পড়ে উত্তরার লাখ টাকা বেতনের স্কুল এসটিএস-এ।
তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত বিমানের বিজনেস ক্লাসে যাতায়াত করেন এবং রাজধানীর বিভিন্ন দামি ক্লাব ও অভিজাত হোটেলে গভীর রাত পর্যন্ত লাখ লাখ টাকা উড়িয়ে মদ্যপান ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। এখানেই শেষ নয়, গুলশানে ফ্ল্যাট ও গাড়ি উপহার দিয়ে অন্য এক নারীর সাথে লিভ-টুগেদার করার মতো অনৈতিক জীবনযাপনের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে ঢাকার উত্তরা, বসুন্ধরা, গুলশান ও বনানী মিলিয়ে মোট ৮টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং ৩টি দামি গাড়ির মালিক এই মেম্বার অ্যাডমিন।
এই ভয়ংকর দুর্নীতির বিষয়ে জানতে লাবলুর রহমানের মুখোমুখি হওয়া হলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান। তবে টিআইবি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন চুক্তি করা চরম নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে অনতিবিলম্বে পদ থেকে সরিয়ে এই বিপুল অর্থের উৎস খতিয়ে দেখা উচিত।
