আওয়ামীলীগের বর্ধিত সভায় শেখ হাসিনা : নৌকাতে এৗক্যবদ্ধ থাকার আহবান

একুশে বার্তা ডেক্স :  আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ উল্লেখ করে দলের সংসদ সদস্য ও আগামী নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণসহ তৃণমূল নেতাদের প্রতি বেশকিছু সুস্পষ্ট বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের উন্নয়ন-সফলতা প্রচারের বদলে যারা দলের বদনাম করে তারা আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, যাকে প্রার্থী করা হবে তার পক্ষেই কাজ করতে হবে। প্রার্থী পছন্দ হোক আর না হোক সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও ত্যাগের মনোভাব নিয়ে নৌকার পক্ষে কাজ করতে হবে। যেন এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারও জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে পারে।

শনিবার দুপুরে গণভবনে আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় সভাপতি হিসেবে সূচনা ও সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। আগামী নির্বাচনেও বিজয়ের ব্যাপার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জন্য আমরা যা করেছি, জনগণ আগামী নির্বাচনে অবশ্যই আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে। মাত্র ৯ বছরেই আমরা সমুদ্র তলদেশ থেকে মহাকাশে চলে গেছি। দিনরাত পরিশ্রম করে আমরা দেশের এত উন্নয়ন করলাম, তবে জনগণ কেন নির্বাচনে অন্য দলকে ভোট দেবে?

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, দেশের এত উন্নয়ন কবে হয়েছে, কোন সরকার করতে পেরেছেÑ তবে কেন অন্য দল ভোট পাবে? যারা সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ, দুর্নীতি, বিদেশে অর্থপাচার, এতিমের টাকা চুরি করে খেয়েছে জনগণ তাদের (বিএনপি) কেন ভোট দেবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমি পাই না। এত উন্নয়নের পরও জনগণ ভোট না দেয় তাহলে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দায়ী থাকবেন। এটা আমার কথা। আপনারা সঠিকভাবে মানুষের কাছে যেতে পারেননি, বলতে পারেননি, সেবা করতে পারেননি। নইলে ভোট না দেয়ার তো কোন কারণ নেই। তিনি বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। জনগণের মন জয় করে তাদের ভোট নিয়েই সরকারের উন্নয়ন কাজের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ক্ষমতায় আসতে হবে। যাকে নৌকা মার্কা দেব, তার পক্ষেই সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যে মর্যাদা লাভ আমরা করেছি, সেখান থেকে কোনমতেই পিছনে ফিরে যেন না যাই। যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ওই জামায়াত ক্ষমতায় আসে, ওই যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা এই দেশকে আবার ধ্বংস করবে। কারণ তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাই বিশ^াস করে না। বাংলাদেশের অস্তিত্বই বিশ^াস করে না। যে উন্নয়ন আমরা করেছি তা সব শেষ করে লুটপাট করে খেয়ে যাবে। কাজেই সেদিক মাথায় রেখেই সবাইকে কাজ করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি; এই বাংলাদেশে কোন জঙ্গীবাদের স্থান হবে না, সঙ্গে সঙ্গে এই মাদকেরও কোন স্থান হবে না। এই মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে।

তৃণমূল নেতাদের উদ্দেশে করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের কাছে যেতে হবে তাদের মন জয় করে তাদের ভোটে বিজয়ী হতে হবে। সরকারের উন্নয়ন-সফলতা ও অর্জনগুলো ভোটারদের কাছে তুলে ধরতে হবে। আর জনগণকে বোঝাতে হবে বিএনপি-জামায়াত স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় আসা মানেই জনগণের দুর্ভোগ। তারা ক্ষমতায় এলে দেশকে আবার ধ্বংস করে দেবে, সরকারের সব উন্নয়নগুলোও ধ্বংস করে দেবে। জনগণের কাছে কথাগুলো পৌঁছে দিতে হবে। তৃণমূল নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যে কাজগুলো করেছি সেগুলো বলতে হবে। কারণ ভোটের রাজনীতি করতে গেলে মানুষকে তো বলতে হবে। আপনার জন্য আমি এই কাজ করেছি। এই কাজগুলো অব্যাহত রাখতে হবে। আমরা সারাদেশকে শুধু রাজধানী বা শহরকেন্দ্রিক নয় সমগ্র বাংলাদেশকে উন্নত করতে চাই।

শনিবার দুপুরে গণভবনে আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় সভাপতি হিসেবে সূচনা ও সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে সকল ভেদাভেদ ভুলে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকাকে বিজয়ী করতে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান। সারাদেশ থেকে আগত তৃণমূলের প্রায় চার সহ¯্রাধিক নেতার উপস্থিতিতে বেলা সোয়া ১১টায় বিশেষ বর্ধিত সভা শুরু হয়। শুরুতেই শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন দলের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। প্রয়াতের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর স্বাগত বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এরপর ৮ বিভাগের ৮ নেতা বক্তব্য রাখেন। তাঁরা হলেন- চট্টগ্রাম বিভাগের পক্ষে চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আজম নাছির উদ্দিন, রংপুরের পক্ষে গাইবান্ধার আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক, খুলনার পক্ষে জেলা সভাপতি হারুনুর রশীদ, রাজশাহীর পক্ষে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, বরিশালের পক্ষে বরগুনা জেলা সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, ময়মনসিংহের পক্ষে জামালপুর জেলা সভাপতি বাকী বিল্লাহ, সিলেটের পক্ষে মৌলভীবাজার জেলা সভাপতি নেসার আহমেদ ও ঢাকার পক্ষে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজির আহমেদ।

সভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, জেলা, উপজেলা, মহানগর ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক, জেলা, উপজেলা ও পৌরসভার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সভাপতি-সম্পাদকরা বিশেষ বর্ধিত সভায় উপস্থিত ছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে সারাদেশ থেকে আগত তৃণমূল নেতাদের সরব উপস্থিতিতে গণভবনে রীতিমতো দলটির মিলনমেলায় রূপ নেয়।

আগামী নির্বাচনও মহাজোটগতভাবে ॥ বর্ধিত সভায় আগামী নির্বাচনও আওয়ামী লীগ জোটগতভাবেই অংশ নেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী নির্বাচন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কী পেলাম বা কী পেলাম না এই হিসাব না করে দেশকে কি দিতে পারলাম, দেশের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, আগামীতে কতটুকু করতে পারব, আগামীতে কি দিতে পারব, সে কথাটি মাথায় রেখে ত্যাগের মনোভাব নিয়ে নির্বাচনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারও জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে পারে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মহাজোট করেছি। এটা নির্বাচনের স্বার্থে করতে হয়েছে। আগামীতেও আমরা করব। আমরা বন্ধু হারাব না। সবাইকে নিয়েই চলতে চাই। ওইটুকু আত্মত্যাগ আমাদের করতে হবে। আমরা সেটা করব। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের দায়িত্বটা কিন্তু অনেক বেশি। কারণ আওয়ামী লীগ এই দেশের সবচেয়ে বড় দল। জনসমর্থন সব থেকে বেশি।

তিনি বলেন, নির্বাচনে যাকে আমরা নৌকায় দেব, যাকে আমরা নির্বাচনে প্রার্থী করবÑ এটা মাথায় রেখেই তার পক্ষে সকলকে কাজ করতে হবে। আপনাদের এখন থেকে জনগণের কাছে যেতে হবে নৌকায় ভোট চাওয়ার জন্য। কে প্রার্থী বা কে প্রার্থী না সেটা বড় কথা নয়। নৌকায় ভোট চাওয়ার জন্যই জনগণের ঘরে ঘরে সবাইকে যেতে হবে। কারণ নৌকা মার্কা বিজয়ী হলেই দেশের মানুষ সব পায়। নৌকায় ভোট দিয়ে জনগণ ভাষা ও ভাতের অধিকার পেয়েছে, স্বাধীনতা পেয়েছে। আজকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাচ্ছে, শিক্ষার আলো পাচ্ছে, বিজলী বাতি পাচ্ছে। আমরা সারাদেশের উন্নয়ন করছি। আর্থ-সামাজিকভাবে আজকে বাংলাদেশ বিশ্ব স্বীকৃতি পেয়েছে।

সরকারের উন্নয়ন জনগণের সামনে তুলে ধরুন ॥ জনগণের কাছে সরকারের উন্নয়ন-সফলতাগুলো তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে সরকার প্রধান বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা যা ঘোষণা দিয়েছিলাম, আমরা তার থেকে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছি। আমরা ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহার, সেখান থেকেও এগিয়ে গিয়েছি। অনেক কাজে আমরা আরও বেশি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। কাজেই আওয়ামী লীগ যে কথা দেয়, আওয়ামী লীগ সেই কথা রাখে। সেই কথাটাই মনে রাখতে হবে। আর সেই কথাটাই ভোটারদের বলতে হবে। আমাদের সামনে নির্বাচন। সবসময় মাথায় রাখতে হবে নির্বাচন মানেই চ্যালেঞ্জ। কাজেই এই নির্বাচন, এটা কিন্তু আমাদের একটানা তৃতীয় বার। তাই তৃতীয়বারের নির্বাচনে সকলকেই কিন্তু এক হয়ে কাজ করতে হবে।

প্রতিটি আসনে দলের একাধিক নৌকার আগ্রহী প্রার্থীদের প্রতি ইঙ্গিত করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করছি। ইতোমধ্যে দেখা যায়, স্বপ্রণোদিত হয়ে অনেকে প্রার্থী হয়ে গেছে। আর প্রার্থী হয়ে তারা তাদের বক্তব্যে বিএনপি-জামায়াতের দুর্নীতি, লুটপাট, ষড়যন্ত্র সে নিয়ে কোন কথা বলে না। তারা প্রার্থী হয়ে বিএনপি-জামায়াত যে সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করেছে তা বলে না। তাদের বক্তব্যে এসে যায় আমার আওয়ামী লীগ এমপির বিরুদ্ধে, সংগঠনের বিরুদ্ধে।

এদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি এখানে একটা ঘোষণা দিতে চাই। আমরা দলের জন্য এত কাজ করেছি। দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে দিন রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। আপনারাই বলেন। আমার কি আছে? আমি কোন বিয়ে-শাদিতে যাই না। কোন উৎসবে যাই না। আমার কিছু নেই। আমি সারা দিনরাত দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। সেগুলো না বলে, সেগুলো ভুলে গিয়ে কোথায় কার বিরুদ্ধে কি দোষ আছে, সেটা খুঁজে জনগণের কাছে যারা বলবেন, তারা কখনও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন না। এটা পরিষ্কার কথা। এ বিষয়ে তিনি আরও বলেন, যারা আমার দলের বিরুদ্ধে কথা বলবে, দলের বিরুদ্ধে বদনাম করবে, সেকি এটা বোঝে না, তার ভোটও নষ্ট হবে। সে তাহলে কোন মুখে ভোট চাইতে যাবে। দলের বিরুদ্ধে বদনাম করে জনগণ তো তাকেও ভোট দেবে না। সেই কথাটা তাকে মনে রাখতে হবে।

প্রার্থী হওয়ার অধিকার সকলের আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রার্থী হতে গিয়ে আমার দলকে বদনামে ফেলবে এটা কিন্তু কোন মতেই আমি মেনে নেব না। এটা সবাইকে মাথায় রাখতে হবে। আর আমাদের যারা সংসদ সদস্য তাদেরও আমি বলি, একটা কথা মনে রাখেন জনগণ কিন্তু খুব হিসাবী। কেউ দুর্নীতি করলে জনগণ কিন্তু সেটা ঠিকই মাথায় রাখে। সেটা কিন্তু ভুলে যায় না। কোন কাজ করতে গিয়ে টাকা নিলে এরপর ভোট চাইতে গেলে বলবে, টাকা দিয়ে কাজ নিছি ভোট দেব কেন? এটা কিন্তু তারা বলবে। জনগণের এখন কিন্তু চোখ খুলে গেছে। এখন ডিজিটাল যুগ। তারাও এখন বিশ^কে জানতে পারে। কাজেই যারা সংসদ সদস্য আছেন, সময় কিন্তু খুব বেশি নেই। কেউ নমিনেশন পাবেন কি পাবেন না, সেটা নির্ভর করে এলাকায় আপনারা কে কতটুকু জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছেন। আর আমাদের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীকে কতটুকু মূল্যায়ন করেছেন, সেটাও কিন্তু আমি বিবেচনা করব।

কারণ এটা আমি মনে করি, এই আওয়ামী লীগের ওপর অনেক ঝড়-ঝাপটা গেছে। এটা আমি আমার ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছি। আমার বাবা জেলের বাইরে থাকলে কি চেহারা আর জেলের ভিতরে থাকলে কি চেহারা হয় আমি তো দেখেছি। দুঃসময়ের দলের হাল ধরে যারা রাখে। কথায় বলে সুসময়ে অনেকে বন্ধু বটে হায়, দুঃসময়ে হায় হায় কেউ কারো নয়। আমি নিজেইও সেটা দেখেছি। ওই দুঃসময়ের কর্মীরা তারা যেন অবহেলিত না হয়। কারণ এখন তো অনেকে আসবে। যেহেতু আমরা ক্ষমতায়।

অনুপ্রবেশকারীদের সম্পর্কে সজাগ থাকুন ॥ তৃণমূল নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা অন্য দলের লোকজনকে দলে ভেড়াচ্ছেন তারা মনে রাখবেন, যাদের দলে ভেড়াচ্ছেন তারা আপনার আপন লোক নয়। বিভিন্ন দল থেকে ছুটে এসে অনেকে দলে আসবে। আর গ্রুপ করার জন্য কোন বাছ-বিচার নেই, যাকে পাচ্ছে তাকে নিয়ে নিজের শক্তি দেখাতে চায়। এরা আসে মধু খেতে। এরা আপনার সঙ্গে থাকতে আসে না। এরা আপনার জন্য কাজ করতে আসে না। যারা ওই আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে, সন্ত্রাস করেছে। আমার নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করেছে। ঘর বাড়ি ভেঙ্গেছে। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তারা ভাবে যে এখানে আসলে মামলা থেকে বাঁচতে পারবে। আর আসে কারা? যারা মনে করে ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে পারলেই তো পয়সা বানাতে পারব তারা।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, একটা সার্ভে আমরা সারাদেশে করেছি, কাদের কাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, কারা আমার দলের। সেই তালিকা কিন্তু আমার কাছে আছে। কাজেই আমি বলব, কেউ যদি তাদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, এখনই তাদের বিদায় করেন। কারণ তারা দুঃসময়ে থাকবে না। অনেকেই আসবে আপনাদের মধ্যে কোন্দল করে তারাই খুন করবে। নাম হবে দল দলকে খুন করেছে। এই দুরভিসন্ধি নিয়েও কিন্তু অনেকে আসে। কাজেই এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের যথেষ্ট সজাগ থাকতে হবে। যথেষ্ট সহনশীল হতে হবে। আপনি (এমপি) এটা মনে করবেন না, দলের লোক আপন না। ওই বাইরের একজন আপনার আপন হয়ে গেছে। সে কিন্তু আপন হবে না। আপনারে নিজের যারা তাদের চিনতে হবে। কাজেই এটা মাথায় রেখেই আপনাদের চলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সম্পদ গড়ার জন্য নয়, বিলাস-ব্যাসনে জীবন যাপন করার জন্য না। আওয়ামী লীগের নীতি ও আদর্শই হচ্ছে জনগণের সেবা করা। জনগণের কাজ করা। জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করা। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীনতা পেয়েছি, এটা মাথায় রাখতে হবে। কাজেই লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা যেন আবার ধ্বংসের মুখে না যায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কোন ভিক্ষুক থাকবে না। আমরা ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ব। জাতির পিতা বলেছিলেন ভিক্ষুক জাতির কোন সম্মান থাকে না। তিনি বলেন, ৯ বছরে আমরা সমুদ্র তলদেশ থেকে মহাকাশে চলে গেছি। বাংলদেশ এখন স্যাটেলাইট ক্লাবের সদস্য। এটা আমাদের জন্য গৌরবের বিষয়।

মানুষের মন জয় করেই বিজয়ী হতে হবে ॥ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জনগণের মন জয় করেই নির্বাচনে জেতার প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি করে কেউ জিততে পারবে না। আওয়ামী লীগ এ বদনাম নেবে না। দলের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার পাশাপাশি ত্যাগের মনোভাব নিয়ে নেতাকর্মীদের কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনে জনগণ ভোট দেবে। ওই ভোট চুরি, ভোট ডাকাতি যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি; সেভাবে কেউ জিততে পারবেন না। জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে আপনাকে আপনার কাজে খুশি হয়ে ভোট দেবে।

তিনি বলেন, আমরা এই বদনাম নিতে চাই না। জনগণের মন জয় করেই নির্বাচনে জিততে হবে, ক্ষমতায় আসতে হবে। ক্ষমতায় আসতে হবে এজন্য আমরা যেন জনগণকে ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত করে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার কাজ করছি সে লক্ষ্য পূরণ করতে। তিনি বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে কেউ কিন্তু ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। আমরা নির্বাচনের স্বচ্ছতার জন্য স্বচ্ছ ব্যালটবাক্স, ছবিসহ ভোটার তালিকাÑ যা করেছি আমরাই, আমাদের প্রস্তাবেই হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচন যেন স্বচ্ছ হয়, নির্বাচন নিয়ে যেন কেউ কোন কথা বলতে না পারে। ১৯৯৬ সালে বিএনপি ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রহসনের একতরফা নির্বাচন করেছে, ওই নির্বাচনে জনগণ ভোট দেয়নি। যার কারণে আন্দোলনের মুখে ৩০ মার্চে খালেদা জিয়া পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। ভোট চুরির অপরাধে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল দেশের জনগণ।

তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের পরিকল্পনা ॥ প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদেশে রাজনীতিটা হয়ে গিয়েছিল শো-অফ করার জন্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আমরা একদম প্রান্তিক মানুষ পর্যন্ত চলে গিয়েছি। একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা চিন্তা করে আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। তিনি বলেন, আমরা যারা রাজনীতি করি, এটা নিজেদের ভোগ বিলাসের জন্য না। আমরা দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করি। মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, সে চিন্তা করাটাই একজন রাজনীতিকের জীবনের বড় সম্পদ। রাজনীতি দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য, দেশ গড়ার জন্য।

এ সময় বিএনপির সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, আগে যারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিল, যারা ক্ষমতার আশপাশে ছিল শুধু তাদেরই ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করেছি। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে মানুষ খুন করেছে। দুর্নীতি করেছে। অত্যাচার করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ মানুষের ঘরে ঘরে উন্নয়ন পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছে। আমরা মানুষের জন্য কাজ করেছি। যার কারণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।

১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেয়ার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৭৫ সালে বাবা-মা, ভাইসহ পরিবারের সবাইকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরেছিলাম। কিন্তু পরিবার হারিয়ে আমি আওয়ামী লীগের কাছেই বাবার ভালবাসা পেয়েছি, মায়ের ভালবাসা পেয়েছি, ভাইয়ের ভালবাসা পেয়েছি। আওয়ামী লীগের মধ্যেই আমি আমার পরিবারকে পেয়েছি। আওয়ামী লীগই আমার আত্মার আত্মীয়।

সরকারের উন্নয়ন কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যই ক্ষমতায় আসতে হবে দাবি করে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বাংলাদেশকে আমরা ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়তে পারি, সেটা মাথায় রেখেই আমাদের কাজ করতে হবে। তৃণমূল নেতাদের উদ্দেশে আরও বলেন, আপনারা গণভবনে এসেছেন। আমার গনভবনের মাটি ধন্য হয়েছে। আমি চাই, আপনারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাবেন এবং আমাদের উন্নয়নের কথাগুলো জনগণের কাছে তুলে ধরে জনগণ যেন আওয়ামী লীগের ওপর বিশ^াস আস্থা রেখে ভোট দিয়ে আবার আমাদের নির্বাচিত করে দেশ সেবার সুযোগ দেয় সেই দিকে লক্ষ্য রেখে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবেন, সেটাই আমি চাই। আর বাঙালী যা কিছু অর্জন করেছে, আওয়ামী লীগের সময়েই তা এসেছে। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা। ২০২১ সালের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ আমরা নির্মাণ করবই ইনশাল্লাহ।

স্বাগত বক্তব্য রাখতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রার্থিতা নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বিরত থাকার জন্য তৃণমূল নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রার্থী হওয়ার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু প্রার্থিতার নামে অসুস্থ প্রতিযোগিতা করে দয়া করে দলের বদনাম ও ভাবমূর্তি নষ্ট করবেন না। সবার এসিআর প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা আছে। অসুস্থ প্রতিযোগিতা করে কেউ দলের মনোনয়ন পাবেন না। তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরে ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হবে। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগের বিজয় ঠেকানোর কোন শক্তি অন্য কোন দলের নেই। ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী ডিসেম্বর বিজয়ের মাঝে আমরা আরেকটি বিজয় ছিনিয়ে আনব।